মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নতুন মৌসুমে নতুন স্বপ্ন গদখালির ফুল চাষীদের

পাঁচ দিবসে টার্গেট শত কোটি

মিলন রহমান
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:৫১ এএম
নতুন মৌসুমে নতুন স্বপ্ন গদখালির ফুল চাষীদের  ¦ ছবি: গ্রামের কাগজ

যশোরের নিভৃত জনপদ ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালি এখন সারাদেশে ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচিত। গদখালির বাহারি সব ফুলের সৌন্দর্য্য ও সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও। গদখালিসহ যশোরাঞ্চলে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে নানা জাতের ফুলের চাষ হচ্ছে। এই অঞ্চলের চাষিদের উৎপাদিত প্রায় চারশ’ কোটি টাকার ফুল চাষী-ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে পৌঁছে যায় সৌন্দর্য্যপিপাসুদের হাতে। উৎসব আয়োজনে অনুষ্ঠানে সেই ফুলের সুবাস সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হন সৌন্দর্য্য পিপাসুরা। এখন এই ফুলের অর্থনৈতিক বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি পর্যটনকে ঘিরেও নতুনমাত্রা যোগ হয়েছে।

এবার নতুন মৌসুমে ফুলের রাজধানীখ্যাত যশোরের গদখালিতে নতুন স্বপ্ন বুনছেন ফুলচাষীরা। প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তায় ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে নতুন এই মৌসুমের বেচাকেনা। বাজার ধরতে শ্রমে-ঘামে ফুটিয়ে তোলা ফুল বাজারেও তুলতে শুরু করেছেন ফুলচাষীরা। ব্যবসায়ীরাও সেই ফুল নিয়ে ছুটছেন দেশ-দেশান্তরে। গদখালি ফুলের বাজার থেকে এই মৌসুমের পাঁচ দিবসকে ঘিরেই শত কোটি টাকার ফুল বিক্রির প্রত্যাশা চাষী ও বিক্রেতাদের। পাশাপাশি গদখালি এখন চারশ’ কোটি টাকার ফুলের বাজারে পরিণত হয়েছে।

ঝিকরগাছা কৃষি অফিস ও ফুলচাষী-ব্যবসায়ীরা জানান, যশোরের শুধু গদখালি নয়, আশেপাশের আরও কয়েকটি ইউনিয়ন এবং উপজেলাতেও গ্রামে গ্রামে ফুল চাষের বিপ্লব ঘটেছে। এই অঞ্চলে ছয় হাজারের বেশি চাষি দেড় হাজার হেক্টর জমিতে ফুল চাষ করছেন। এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রথম ফুল চাষ শুরু করেছিলেন পানিসারা গ্রামের কৃষক শের আলী সরদার। তিনি ১৯৮২ সালে এক বিঘা জমিতে রজনীগন্ধা ফুল চাষ করেছিলেন। তার সফলতা দেখে পরবর্তীতে ধান, পাট কিংবা প্রচলিত শস্য চাষ ছেড়ে এলাকার চাষিরা ঝুঁকে পড়েন ফুল চাষে।

চার দশকের বেশি সময় ধরে সম্প্রসারিত হওয়া ফুল চাষ গদখালিকে এনে দিয়েছে ফুলের রাজধানীর খ্যাতি। এখন এই অঞ্চলের কৃষকেরা নিত্য নতুন জাতের ফুল চাষে নজির স্থাপন করে চলেছেন। গদখালীর যেদিকেই চোখ যায়, চোখে পড়ে একটার পর একটা ফুলের বাগান। বিশেষ করে গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা, অর্কিড, পাতাবাহারসহ অসংখ্য বাগান। এর বাইরেও চোখে পড়ে পলি হাউজ বা ফুল চাষের বিশেষ ঘর। এসব ঘরে চাষ হচ্ছে জারবার ফুলের; বাজারে যার চাহিদা এখন অনেক বেশি।

যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের পাশে গদখালি বাজারে প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে বসে ফুলের মোকাম। এলাকার চাষিরা তাদের ক্ষেত থেকে উৎপাদিত ফুল নিয়ে হাজির হন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন। দর কষাকষির মাধ্যমে ফুল কিনে পৌঁছে দেন দেশ-দেশান্তরে। হেমন্ত থেকে শুরু করে শীতের মৌসুম এবং বসন্ত অবধি ফুলের বাজার জমজমাট থাকে। দেশের অন্যতম বৃহত্তম ফুলের মোকাম গদখালিতে বছরে ৪শ’ কোটি টাকার বেশি ফুল হাতবদল হয়। দেশের চাহিদার সিংহভাগ ফুল সরবরাহ করেন এই এলাকার চাষিরা।

গদখালি মোকামে ফুল বিক্রি করতে আসা চাষি সাইফুল ইসলাম বলেন, শীতকালে ফুলের উৎপাদন ও বিক্রি বাড়ে। এবছরও আমরা ফুল বিক্রির প্রস্তুতি নিয়েছি। বাজারে এখন গোলাপ ফুল বিক্রি হচ্ছে তিন থেকে ছয় টাকা পিস। বর্তমানে বাজারে গোলাপ ও গাঁদা ফুলে দাম সবচেয়ে কম। বাকি সব ফুলের দাম উর্ধ্বমূখী। আশা করছি বিজয় দিবস উপলক্ষে সবধরণের ফুলের দাম বাড়বে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করছে ফুলের বাজার। দেশের পরিবেশ স্থিতিশীল থাকলে ফুলের বাজার চাঙা হবে।

সোহেল রানা নামে আরেক চাষি বলেন, গত বছরের তুলনায় বাজার পরিস্থিতি এখনো ভাল আছে। আশা করছি কিছুদিন পর বাজারে ফুলের দাম আরও বাড়বে। এভাবে বাজার স্থিতিশীল থাকলে চাষিদের খরচ পুষিয়ে যাবে, লাভবান হতে পারবো।

অনলাইন ফুল সরবারহ উদ্যোক্তা মো. আল আমিন বলেন, বিগত বছরের মত এবারও ব্যাপক ফুল সরবরাহের প্রস্তুতি নিয়েছেন চাষিরা। বাজারে ফুলের সরবরাহ বেড়েছে। বিজয় দিবসের আগে ফুলের বাজার আরও জমজমাট হবে। গদখালি মোকামের ফুলের চাহিদা সারাদেশেই আছে। এখান থেকে ফুল কিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। সাধারণত নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ফুল বিক্রির ধুম পড়ে। এবারও মৌসুম জুড়ে ফুলের বাজার চাঙা হবে বলে আশাবাদী চাষী ও ব্যবসায়ীরা।

ফুলচাষী ও ব্যবসায়ীরা জানান, আসন্ন পাঁচটি দিবস মহান বিজয় দিবস, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও বসন্তবরণ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও বাংলা নববর্ষবরণসহ ইংরেজি নববর্ষেও ফুলের বেচাকেনা বেড়ে যায়। এই দিবসগুলো ঘিরে বাজার ধরতে ব্যস্ততা বেড়েছে ফুলচাষিদের। রজনীগন্ধা, গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা, গ্লাডিওলাস, জিপসি, চন্দ্রমল্লিকাসহ নানা প্রজাতির ফুলচাষিরা ক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। এবার বর্ষায় অনেক রজনীগন্ধা ফুলগাছ মারা গেছে। উৎপাদন কম হওয়ায় মৌসুমের শুরুতে রজনীগন্ধা ফুলের দাম সবচেয়ে বেশি। বিজয় দিবসের আগে সব ধরণের ফুলের দাম বাড়বে বলেও আশায় বুক বেঁধেছেন চাষিরা।

গদখালির ফুলচাষি ইসমাইল হোসেন বলেন, প্রতি বছর আমরা শীতের মৌসুমের বিশেষ দিবসগুলো ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে থাকি। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের জন্য চাষিরা কয়েক মাস আগে থেকেই ক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এবার আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে ফুলের দামে ধস নেমেছে। বিশেষ দিবসগুলোতে ফুলের দাম বাড়বে কিনা সংশয় রয়েছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করছে ফুলের বাজার। তবুও আশা করছি বাজার ভাল হবে।

ঝিকরগাছার কুলিয়া গ্রামের চাষি আরিজুল ইসলাম বলেন, এক বিঘা জমিতে রাজনীগন্ধা ফুলের চাষ করেছি। প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় দুই লাখ টাকার ফুল বিক্রি করেছি। আশা করছি আরও প্রায় তিন লাখ টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবো। মৌসুমের শুরুতেই রজনীগন্ধা ফুলের দাম ভাল পাচ্ছি। বর্তমানে ১০-১২ টাকা পিস বিক্রি করলেও এ মৌসুমে সর্বোচ্চ ২১টাকা পিস রজনীগন্ধা বিক্রি করেছি। যা রেকর্ড দামে বিক্রি হয়েছে।

পটুয়াপাড়া গ্রামের চাষি তৈয়ব আলী বলেন, এক বিঘা জমিতে গোপাল চাষে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গোলাপ ফুলের উৎপাদন বেশি। বাজারে গোলাপের সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমেছে। গাঁদা ফুলের দামেও ধস নেমেছে। আশা করছি বিজয় দিবসের আগে আবার ফুলের দাম বাড়বে। এই মৌসুমে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লাভবান হতে পারবো।’

গদখালী ফুলচাষী ও ফুল ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আবু জাফর জানান, এই অঞ্চলে ফুলের বাজার চারশ’ কোটি টাকার। শীতের শুরু থেকেই ফুলের বাজার জমতে শুরু করেছে। চাষীরা তাদের শ্রমের ফসল ফুল বাজাতে তুলতে শুরু করেছেন। ফুলের বাজারও ভাল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ভালো দাম পাবেন বলেও আশা করছেন চাষীরা। সবমিলিয়ে তাদের আশা মৌসুমের পাঁচটি দিবসকে ঘিরে তারা শত কোটি টাকার ফুল বেচাকেনা করতে পারবেন।

গদখালির ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুর রহিম বলেন, বাণিজ্যিক ফুলচাষের যাত্রা শুরু হয়েছিল ঝিকরগাছার পানিসারা গ্রাম থেকেই। চার দশকেরও বেশি সময়ের এই যাত্রায় গদখালি এলাকার চাষিদের ফুলের বাজার বছরে ৪শ’ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। গদখালি মোকামে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার ফুল বেচাকেনা হয়। তিনি আরও বলেন, ১৯৯৬ সালে গদখালিতে ফুলের পাইকারী মোকাম চালু হয়। এরপর তিনিসহ স্থানীয় চাষী-ব্যবসায়ীদের প্রচেষ্টায় এবং গণমাধ্যমের কল্যাণে এই বাজারের প্রচার ও প্রসার হয়েছে। নতুন নতুন জাত ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মধ্যদিয়ে ফুল চাষে বিপ্লব হয়েছে।’

ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নূরুল ইসলাম বলেন, মৌসুমের শুরু থেকেই ফুলের বাজার ধরতে ফুল চাষীরা সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছেন। ফুল চাষের ক্ষেত্রে ছত্রাকসহ যে ধরণের রোগবালাইয়ের সমস্যা দেখা দেয়, তার জন্য সবসময়ই তারা কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছেন। বাজার পরিস্থিতিও ভাল। আশা করা হচ্ছে, গদখালির চাষীরা এই মৌসুমে যথেষ্ট লাভবান হতে পারবেন।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও তারুণ্য ধরে রাখবে কাঁকরোল

মণিরামপুরে ইমামুল হত্যাকাণ্ডে আটক হুসাইনের স্বীকারোক্তি

ঋণের প্রলোভনে টাকা আত্মসাত, মাহমুদাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা

পাওনা টাকা চাওয়ায় ভাতিজার মারধরে বৃদ্ধ নিহত

সেবা নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা সাধারণ মানুষের

মণিরামপুর পৌরসভার উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণা

এস আলমের প্রভাবমুক্ত ইসলামী ব্যাংকের দাবিতে রাজশাহীতে মানববন্ধন

কেশবপুরে ভূমি সহকারীর বাড়িতে অজ্ঞান পার্টির হানা

একনেক সভায় ১০ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন

জামায়াতের ৮.৩৯ লাখ কোটি টাকার ছায়া বাজেট প্রস্তাব

পুরুষ বন্ধুদের কাছ থেকে উপহার পেতে আনুশকার অস্বস্তি!

মণিরামপুরে নাতনীকে উত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা, আটক-১

তথ্য উপদেষ্টা / স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয়, থাকবে না দলীয় প্রতীক

যশোরসহ ২০ অঞ্চলে ঝড়ের সম্ভাবনা

উত্তাল বঙ্গোপসাগর, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

ঘুসের টাকা গুনে নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল, বাগমারা থানার পুলিশ পরিদর্শক প্রত্যাহার

মহম্মদপুরে মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশকে নতুন সিল

রামিসা হত্যা: সোহেল ও স্বপ্না ‘কনডেম সেলে’

কেশবপুরে শরীকানা পুকুরের মাছ লুটের অভিযোগ

রাজশাহীতে বিভাগীয় পর্যায়ে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

X