
কামারশালায় বাড়ছে লোহা লক্করের শব্দ। কোলাহল ভেদ করেও তা শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। সকাল থেকে রাত এমনি শব্দ যশোর শহরের বিভিন্ন কামারশালায়। চাপট, দা, বটি, ছুরির অর্ডার দিচ্ছেন কাস্টমাররা, আর ফরমায়েশ অনুযায়ী সেসকল অর্ডার সরবরাহ করতে দিন রাত কাজ করছেন কামারেরা। এ ব্যস্ততা চলছে মাঝ রাত অবধি।
আর মাত্র কয়েকটি দিন, সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে আসতে চলেছে ঈদুল আযহা। ত্যাগের মহিমায় পশু কোরবানী মুসলিম রীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই ধর্মপ্রাণ মুসলীম ঈদুল আযহায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন কোরবানীর প্রস্তুতিতে।
এ সময়ে পশু কেনার ব্যস্ততার পাশাপাশি পশু জবাইয়ের জন্য জরুরি অনুষঙ্গ চাপট, দা, বটি, ছুরি বানিয়ে নেয়া ও কেনার ব্যস্ততা চলছে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। এসকল জরুরি পণ্যের ফরমায়েশ দিচ্ছেন কাস্টমাররা, আর তা তৈরিতে ব্যস্ততা চলছে শহরের বিভিন্ন কামারশালায়।
শহরের শংকরপুর জিরো পয়েন্ট মোড়, রেল রোড, টার্মিনাল রোড, সন্ন্যাসী দিঘীর পাড়, জামরুল তলা, ব্যাটারিপট্টিসহ গোটা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা কামারশালায় ব্যস্ততা বেড়ে চলেছে। নতুন তৈরির পাশাপাশি কোনো কোনো কাস্টমার ঘরে থাকা পুরনো দা, বটি, ছুরি, চাপটেও শান দেয়ার ফরমায়েশ দিচ্ছেন। তবে নতুন বানিয়ে নেয়ার চেয়ে পুরনো চাপট, দা, বটি ছুরিতে শান দেয়ার অর্ডার বেশি এমনটাই বলছেন কামারেরা।
সকাল সাতটা থেকে কাজ শুরু হয়ে কামারদের ব্যস্ততা চলছে রাত একটা পর্যন্ত। এ সময় আরও বাড়বে বলে জানান কামারেরা। চাঁদ রাত পর্যন্ত থাকবে এ ব্যস্ততা। কোন কোন কামারশালায় চাঁদরাতের পুরোটা সময় জুড়ে থাকবে কাজের ব্যস্ততা।
শহরের বিভিন্ন কামারশালায় ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন সাইজের চাপট। দা ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা। বটি ১০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ছুরি ১৫০ থেকে ৩০০টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পুরনো চাপট, দা, বটি, ছুরি শুধুমাত্র শান দিতে চাপটের ক্ষেত্রে মূল্য রাখা হচ্ছে ২০০ টাকা, ছুরি, দা ও বটিতে রাখা হচ্ছে ১০০ টাকা।
তবে কামারশালার সেই সোনালী দিন আর নেই বলে জানান কামারেরা। কষ্টসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কালক্রমে কামারদের পেশা পরিবর্তন, সময় বাঁচাতে রেডিমেড পণ্যে কাস্টমারদের ঝুঁকে পড়া, এসব কারণে ব্যবসায়িক মন্দা যাচ্ছে বলে আরও জানান শহরের বিভিন্ন প্রান্তের কামারেরা।
শংকরপুর জিরো পয়েন্ট মোড়ের মন্টু কর্মকার জানান, পাঁচ পুরুষ ধরে আমার পরিবার এ পেশায় রয়েছে। পারিবারিক ঐতিহ্য আর কাজের প্রতি ভালোবাসার কারণে বুড়ো বয়সেও কাজ করছি। আগে কোরবানীর ঈদ এলে রাত তিনটা চারটা পর্যন্ত কাজ করেছি। চাঁদ রাতে সারারাত জেগে কাজ করে তবে বাড়ি গিয়েছি।
আমার কোন ছেলে সন্তান নেই, তাই এ পেশা টিকিয়ে রাখার কেউ নেই। আগের মতো ব্যস্ততা না থাকায় আজকাল কামারেরা পেশা পরিবর্তন করছে। টার্মিনাল রোড এলাকার গোবিন্দ কর্মকার বলেন, কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আজকাল কেউ আর এ পেশায় আসতে চায় না।
রিক্সা বা ভ্যান চালানো, সেলুনের কাজসহ নানান ধরনের কাজ বেছে নিচ্ছে। বর্তমানে ব্যক্তি পর্যায়ে অর্ডার কম আসে। বিভিন্ন দোকান থেকে পাইকারি অর্ডার বেশি আসে, আগের মতো কাস্টমার পাই না। আশ্রম রোড এলাকার প্রশান্ত বিশ্বাস বলেন, দশ পনেরো বছর আগেও বেশ ভীড় হতো কাস্টমারদের। এমনও গেছে যে চাঁদরাতে সারারাত জেগেও কাজ করেছি। এখন আমাদের আর সেই দিন নেই। লোকে রেডিমেড পণ্য কেনে, বানিয়ে নেয় কম।
অন্যদিকে শহরের হাটখোলা রোডের বিভিন্ন দোকানে ক্রেতারা আসতে শুরু করেছেন রেডিমেড চাপট, ছুরি, দা, বটি কিনতে। এসব দোকানে চাপট বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায়। দা ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। বটি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৬০০ টাকায়। ছুরি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্য।
মন্তব্য করুন