
খুলনার বটিয়াঘাটা থেকে রাজারহাটে চামড়া নিয়ে এসেছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী স্বপন দাস। তিনি জানালেন, ৫০ পিস চমড়া নিয়ে এসেছেন। এলাকা থেকে তিনি তিনশ’ সাড়ে তিনশ’ টাকা দরে এই চামড়া কিনেছেন। কিন্তু দুপুর অবধি কোনো ব্যাপারি, আড়তদার দামই বলছে না।
স্বপন দাস বলছেন, ‘আড়তদাররা কচ্চে, চামড়ার করোনা হয়েছে। আমি তো বাপু করোনা বুজদিচিনে। কিন্তু কেউ দামও কচ্চে না।’ মাগুরার ভাঙ্গুরা থেকে চামড়া নিয়ে আসা মহানন্দ অধিকারীও একই কথা জানালেন।
মণিরামপুর উপজেলার ফকির রাস্তা এলাকা থেকে ৬০ পিস গরুর চামড়া নিয়ে হাটে এসেছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী স্বদেশ দাস। তিনি জানালেন, গড়ে তিনি চামড়াগুলো ৩শ’ থেকে সাড়ে ৩শ’ টাকায় কিনেছেন। এখন আড়তদাররা দুশ’ টাকা দাম বলছে। ‘ল্যাম্পিন (লাম্পিস্কিন), করোনা, পক্স’ এইসব বলে চামড়া বাতিল বলছে।
সেখানেই চমড়ার দরদাম করা বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিন দাবি করলেন, হাটে অনেক লাম্পিস্কিন, পক্স আক্রান্ত গরুর চামড়া উঠেছে। মৌসুমী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই চামড়া না চিনেই বেশি দামে কিনেছে। এতে তারা ধরা খেয়েছে। এ সময় তিনি চামড়ার ছোট ছোট দু’একটি স্পটও সনাক্তের চেষ্টা করেন।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চামড়ার মোকাম রাজারহাটের এবার সিন্ডিকেটের সাথে নতুন কারসাজির নাম ‘করোনা আর পক্স’! গরু লাম্পিস্কিন ডিজিজে আক্রান্ত ছিল দাবি করে ‘করোনা আর পক্স’ ট্যাগ লাগিয়ে বাতিল দেখিয়ে পানির দামে বিক্রি হচ্ছে চামড়া। ট্যানারি মালিক আর আড়তদার সিন্ডিকেটের সাথে এই নতুন কারসাজি যুক্ত হওয়ায় যশোরের রাজাহাটে চামড়া ব্যবসায় ধস নেমেছে। শনিবার (৩০ মে) কোরবানি ঈদ পরবর্তী প্রথম হাটে দাম না পেয়ে মাথায় হাত উঠেছে মৌসুমী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদ পরবর্তী প্রথম হাটে ট্যানারি মালিক বা বাইরের বড় ব্যবসায়ীরা না আসায় নামমাত্র মূল্যে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। ‘ল্যাম্পিন (লাম্পিস্কিন), করোনা, পক্স’ এইসব বলে চামড়া বাতিল দেখিয়ে পানির দামে চামড়া কিনছেন স্থানীয় আড়তদাররা। সিন্ডিকেট আর কারসাজি করে তারা চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়েছেন। তবে আড়তদের দাবি, লাম্পিস্কিন আক্রান্ত গরুর চামড়া প্রসেসিং করার সময় ফেটে যায়। ফলে ট্যানারি মালিকরা নিতে চান না। এজন্য এই চামড়ার দাম নেই। তবে ভাল চামড়া ভাল দামে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, খুলনা বিভাগের সবচেয়ে বড় ও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার বাজার যশোরের রাজারহাট। ঢাকার পরে দেশের অন্যতম বৃহত্তর চামড়ার মোকাম এটি। এই মোকামে তিন শতাধিক আড়ৎ রয়েছে। সপ্তাহে দুইদিন শনিবার ও মঙ্গলবার এখানে হাট বসে। এখানে খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ছাড়াও ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা, নাটোর এবং ঢাকার বড় বড় ব্যবসায়ীরা চামড়া বেচাকেনা করেন। এই হাট ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার ছোট বড় ব্যবসায়ী ব্যবসা করেন। প্রতিবছর কোরবানির ঈদ ঘিরে কয়েকটি হাটবারে রাজারহাটে প্রায় শত কোটি টাকার চামড়া বেচাকেনা হয়ে থাকে।
শনিবার (৩০ মে) ছিল কোরবানি ঈদপরবর্তী প্রথম হাট। তবে কোরবানি ঈদের একদিন পরেই এই হাট বসায় চামড়ার আমদানি ছিল তুলনামূলক বেশ কম। বাজারেও মন্দাভাব। এদিন রাজারহাট ঘুরে দেখা গেছে, ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা স্থানীয় পরিবহণে করে চামড়া এনে স্তুপ করে রেখেছেন। আবার স্থানীয় আড়তদাররা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্তুপ করা চামড়া উল্টে-পাল্টে দেখছেন। দাম নিয়ে চলছে দু’পক্ষের দর কষাকষি। আড়তদারদের দামে হতাশা প্রকাশ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, হাটে কোরবানির পশুর চামড়ার যে দাম, তাতে তারা পুঁজি হারাতে বসেছেন।
তাদের দাবি, আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা চামড়ার দু’একটি স্পট দেখিয়েই দাবি করছেন গরু লাম্পি স্কিন ডিজিজে (এলএসডি) আক্রান্ত ছিল। এই চামড়া করোনা, পক্স আক্রান্ত দাবি করে ২-৩শ’ টাকা দাম বলছেন। আর সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে কোরবানির পশুর চামড়া। মূলত ট্যানারি মালিক-আড়তদারদের সিন্ডিকেট এই চামড়ার দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে তারা পূঁজি নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারছেন না।
কেশবপুর থেকে চামড়া বিক্রি করতে আসা সঞ্জয় দাস জানালেন, বাজার বুঝতে ৮টি গরুর চামড়া নিয়ে হাটে এসেছিলেন। ৮টি চামড়া তিনি ১২শ’ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। তিনশ’ টাকা করে চামড়া কিনে লবণ খরচ করে অর্ধেক দামে বিক্রি করে তার মাথায় হাত উঠেছে।
যশোরের অভয়নগর উপজেলার কোটাপাড়া থেকে রাজারহাটে গরু ও ছাগলের চামড়া নিয়ে এসেছিলেন রামপদ দাস। তিনি জানালেন, গড়ে ৩শ’ টাকা দরে ২৫টি গরুর চামড়া এবং ৩৫ টাকা দরে কিনে ৪০টি ছাগলের চমড়া নিয়ে হাটে এসেছেন। ২০ টাকা দরে ছাগলের চামড়া বিক্রি করেছেন। কিন্তু গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে না। তিনি দাবি করেন, ঢাকা ও বাইরের ব্যবসায়ীরা হাটে আসেনি। স্থানীয় আড়তদাররা ‘সিন্ডিকেট’ করে দাম কমিয়ে দিয়েছেন। তাই মাঠ পর্যায় থেকে অনেক কম দামে চামড়া কিনেও তারা পুঁজি বাঁচাতে পারছেন না।
যদিও বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল মজিদ পলাশ দাবি করেন, হাটে লাম্পিস্কিন বা নষ্ট চামড়ার দাম কম। ভাল চামড়া ভাল দামে বিক্রি হচ্ছে। তিনি ঈদের দিন থেকে এ পর্যন্ত তিন হাজার চামড়া কিনেছেন। ৫শ’ থেকে ১১শ’ টাকা দামে এসব চামড়া কিনেছেন।
তবে চামড়ার ল্যাম্পিস্কিন ডিজিজের বক্তব্য মানতে নারাজ যশোর সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ফারুক হোসেন। তিনি জানান, যশোরের বিভিন্ন পশুহাট তিনি ঘুরেছেন। হাটে তিনি ল্যাম্পিস্কিন বা অন্যকোনো রোগে আক্রান্ত পশুও তেমন দেখেননি। এছাড়া পশু কেনার সময় সবাই দেখেশুনেই কেনেন। ফলে রোগাক্রান্ত পশু তো কেউ কোরবানি করবেন না। এখন হাটের সিংহভাগ চামড়া যদি বলা হয় ল্যাম্পিস্কিন, তাহলে তো তা বিশ^াসযোগ্য নয়। এটি মূলত চমড়া ব্যবসায়ীদের কারসাজি বলে তিনি মনে করেন।
বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল জানান, ঈদের দু’দিন পরে প্রথম হাট হওয়ায় এদিন রাজারহাট জমেনি। হাট বাতিল বা অসুস্থ গরুর চামড়া দেড়শ’ থেকে তিনশ’ টাকা এবং ভাল চামড়া ৭শ’ থেকে ১২শ’ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বাইরের ব্যবসায়ীরা আসলেম আগামী মঙ্গলবার বা পরবর্তী শনিবারের হাট জমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজারহাটের ইজারাদার রাজু আহমেদ জানান, শনিবারের হাটে ১০ হাজার গরুর চামড়া ও কয়েক হাজার ছাগলের চামড়ার আমদানি হয়েছে। সবমিলিয়ে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকার চামড়ার বেচাকেনা হয়েছে।
মন্তব্য করুন