
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং দেশীয় শিল্পকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে একাধিক খাতে কর, শুল্ক ও ভ্যাট ছাড়ের প্রস্তাব আনা হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, কৃষি উপকরণ, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ইলেকট্রনিক্স, চিকিৎসাসামগ্রী এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি পণ্যে কর সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে আমদানিনির্ভর ও বিলাসী পণ্যের ওপর কর ও শুল্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এবারের বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ‘উৎপাদনমুখী করনীতি’। অর্থাৎ, যেসব প্রতিষ্ঠান দেশে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং রপ্তানি বৃদ্ধি করবে, তারা কর সুবিধা পাবে।
এর বিপরীতে, বিদেশ থেকে আমদানি করা এবং দেশীয় শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা পণ্যের ওপর করের চাপ বাড়ানো হতে পারে। এর মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদনকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার মধ্যে থাকা অর্থনীতিকে চাঙা করতে এই করনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এই সুবিধার প্রকৃত সুফল ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ব্যবসায়ীদের মূল্য নির্ধারণের আচরণের ওপর।
সাধারণ মানুষের ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের উৎসে কর ১ থেকে ৫ শতাংশের পরিবর্তে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
এতে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যয় কমে বাজারমূল্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশে উৎপাদিত টেলিভিশন, ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার (এসি) এবং ওয়াশিং মেশিনের ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৭.৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে দেশীয় ইলেকট্রনিক্স শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে এবং ভোক্তারাও তুলনামূলক কম দামে পণ্য কিনতে পারবেন।
প্রযুক্তি খাতকে উৎসাহ দিতে ৩০ ইঞ্চি পর্যন্ত কম্পিউটার মনিটরের ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা অব্যাহত রাখা হতে পারে।
এছাড়া দেশে সংযোজিত (Locally Assembled) ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার এবং স্মার্টফোনের জন্য বিদ্যমান কর সুবিধাও বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় কমাতে হাসপাতাল বেড ও বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামের স্থানীয় উৎপাদন এবং আমদানির ওপর ভ্যাট ছাড়ের মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এতে চিকিৎসা খাতের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সবুজ জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে সোলার প্যানেল, বায়োগ্যাস এবং বায়োগ্যাস মিশ্রিত সিএনজি ব্যবহারে সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে।
পাশাপাশি লিথিয়াম ও গ্রাফিন ব্যাটারি উৎপাদনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভ্যাট মওকুফের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে কর ছাড় অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে কৃষিভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণ এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে বিনিয়োগ বাড়তে পারে।
প্রস্তাবিত কর, শুল্ক ও ভ্যাট ছাড়গুলো চূড়ান্তভাবে অনুমোদন ও কার্যকর হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ইলেকট্রনিক্স, চিকিৎসাসামগ্রী এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি পণ্যের দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা কমতে পারে।
মন্তব্য করুন