
দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী, দক্ষতাভিত্তিক এবং কর্মসংস্থানমুখী করতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা নতুন খসড়া মডেল অনুযায়ী, প্রচলিত কয়েকটি অনার্স বিষয় পর্যায়ক্রমে বাতিল করে সেগুলোকে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হবে।
সরকারের নতুন পরিকল্পনায় শিক্ষার্থীদের চাকরির বাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এজন্য পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার সিকিউরিটি, আউটসোর্সিং, ডিজিটাল দক্ষতা এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়।
এছাড়া কলেজ পর্যায়েই চালু হবে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় সহায়তা দিতে প্রতিষ্ঠা করা হবে বিশেষ ক্যারিয়ার সেন্টার। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে সাতটি বিদেশি ভাষা শিক্ষার সুযোগও রাখা হবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ বছরে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় আট গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে দেশের প্রচলিত সনদনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে।
নতুন খসড়া প্রস্তাবে বাংলা, ইতিহাস, দর্শনসহ মোট ছয়টি বিষয়ে অনার্স কোর্স বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে সনদনির্ভর শিক্ষার বদলে দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দেন। এর প্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রী জানান, সরকার শুধু ডিগ্রিধারী নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে কাজ করছে। শিক্ষাবিদরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, দেশের ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থানই অপ্রাতিষ্ঠানিক হওয়ায় প্রচলিত তত্ত্বীয় শিক্ষার চেয়ে কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্ব এখন সবচেয়ে বেশি।
এদিকে পাবলিক পরীক্ষার দীর্ঘ সময়সূচির কারণে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমানো এবং স্কুল-কলেজগুলোতে স্বাভাবিক পাঠদান সচল রাখতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের সবচেয়ে বড় দুটি পাবলিক পরীক্ষা এসএসসি ও এইচএসসির বিষয় সংখ্যা এবং পরীক্ষা গ্রহণের কর্মদিবস উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এরই মধ্যে এ-সংক্রান্ত একটি প্রাথমিক ধারণাপত্র ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছে। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করতে ২৫ থেকে ৩০ কর্মদিবস এবং এইচএসসিতে ৩০ থেকে ৩৫ কর্মদিবস বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহূত হওয়ায় হাজার হাজার স্কুলে স্বাভাবিক পাঠদান বন্ধ থাকে। এতে অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিখন ঘণ্টা (লার্নিং আওয়ার্স) মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘ পরীক্ষার কারণে পরীক্ষার্থীরাও অসহনীয় মানসিক চাপে ভোগে। এই জটলা ও চাপ কাটানোই সরকারের নতুন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।
সরকার ২০২৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে যে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তাতে নতুন চারটি বিষয় যুক্ত করার কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এরমধ্যে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি নিয়ে দুটি বিষয় পড়তে হবে চতুর্থ শ্রেণি থেকে। আর ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে যুক্ত হবে ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা’ এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’। এছাড়া নতুন শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজি ছাড়াও তৃতীয় ভাষা শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে কোনো একটি বিষয়ের সঙ্গে ‘বড় অধ্যায়’ যুক্ত হতে পারে। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এসে নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, বিদ্যমান শিক্ষাক্রমকে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৭ সালে সংশোধিত আকারে চালু করা হবে। তবে শিক্ষাব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ রূপান্তর এবং নতুন কাঠামো বাস্তবায়ন হবে ২০২৮ সালে।
তার ভাষায়, নতুন কারিকুলামে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পাশাপাশি চারটি নতুন বিষয় সংযোজন করা হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও জীবনমুখী শিক্ষা অর্জনে সহায়তা করবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও সনদনির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের প্রচলিত শিক্ষাধারা থেকে সরে এসে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, প্রযুক্তিজ্ঞান এবং কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তুলতে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন