
বাংলা পপ সঙ্গীতের ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন যিনি, তিনি হলেন আজম খান। গিটার হাতে মঞ্চ কাঁপানো এই কিংবদন্তি শিল্পীর ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১১ সালের ৫ জুন তিনি কোটি ভক্তকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে না-ফেরার দেশে চলে যান।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সঙ্গীতে নতুন এক জাগরণ তৈরি করেছিলেন আজম খান। তাঁর গানগুলো শুধু বিনোদন ছিল না—ছিল সমাজ, জীবন ও মানুষের অনুভূতির প্রতিচ্ছবি।
তাঁর গাওয়া ‘রেললাইনের ঐ বস্তিতে’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘পাপড়ি কেন বোঝে না’ গানগুলো বাংলা সঙ্গীতজগতে এক একটি ইতিহাস। এক যুগেরও বেশি সময় আগে গানের জনক চলে গেছেন দুনিয়া ছেড়ে। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি করা গানগুলো এখনও সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে দোল দেয়। তাঁর গানের কথায় সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ যেভাবে পপ আর রকের আবহে তুলে ধরেছিলেন, তা আগে কেউ ভাবেনি।
ক্যারিয়ারে ১৭টির বেশি অ্যালবাম রয়েছে এই রক আইকনের। অ্যালবামগুলো দারুণভাবে ব্যবসাসফল ছিল। কিংবদন্তি এই রক গায়কের জনপ্রিয়তা শুধু নিজের দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পশ্চিমবঙ্গেও রকস্টার হিসেবে তিনি বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। আজকের কলকাতার ব্যান্ডশিল্পীদের অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার নাম ছিলেন তিনি। নতুন প্রজন্মের সঙ্গীতশিল্পীদের কাছেও অনুপ্রেরণার আর এক নাম আজম খান।
বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই গায়ক গানের পাশাপাশি অভিনয় করেও বেশ প্রশংসা পেয়েছেন। ১৯৮৬ সালে তিনি ‘কালা বাউল’ নামের একটি নাটকে অভিনয় করেছিলেন। পরে ২০০৩ সালে ‘গডফাদার’ নামক একটি চলচ্চিত্রে খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ একজীবনে আজম খান পেয়েছেন বেশ কিছু পুরস্কার। এর মধ্যে বেস্ট পপ সিঙ্গার অ্যাওয়ার্ড, টেলিভিশন দর্শক পুরস্কার, কোকা-কোলা গোল্ড বটল পুরস্কার উল্লেখযোগ্য। মৃত্যুর পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে।
শুধু গান নয়, একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্ত্র হাতে শত্রুর সঙ্গে লড়াই করেছিলেন তিনি। রণাঙ্গনে তিনি ছিলেন অকুতোভয় এক যোদ্ধা। সেসময় আজম খান ছিলেন দুই নম্বর সেক্টরের একটি সেকশনের ইনচার্জ। সেকশন কমান্ডার হিসেবে ঢাকা ও এর আশপাশে কয়েকটি গেরিলা আক্রমণে অংশ নেন তিনি। তাঁর প্রবল বিক্রমে রণাঙ্গনে দিশেহারা হয়ে পড়ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।
আজ তাঁর প্রয়াণের ১৫ বছর পূর্ণ হলেও তিনি বেঁচে আছেন তাঁর গানে, শ্রোতাদের হৃদয়ে এবং বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে।
দেশজুড়ে ভক্ত, শিল্পী ও সংগীতপ্রেমীরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছেন এই মহান শিল্পীকে। তাঁর শূন্যতা কখনও পূরণ হওয়ার নয়—বাংলা পপ ও রক সঙ্গীতের ইতিহাসে তিনি চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।
মন্তব্য করুন