মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

কলাপাড়ায় শিক্ষকের বাড়ি এখন পাখির অভয়াশ্রম, নাম ‘বিহঙ্গ বিলাস’

এইচ এম হুমায়ুন কবির, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৫১ পিএম
কলাপাড়ায় শিক্ষকের বাড়ি এখন পাখির অভয়াশ্রম, নাম ‘বিহঙ্গ বিলাস’

এক শিক্ষকের বাড়িকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় বালিয়াতলী ইউনিয়নের শিক্ষকের বাড়ি এখন পাখির অভয়াশ্রম, নাম ‘বিহঙ্গ বিলাস’ বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটার দিকে বালিয়াতলী ইউনিয়নের মুসুল্লীয়াবাদ গ্রামে শিক্ষক আখতারুজ্জামানের বাড়িতে ‘দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির কলোনী’ লেখা সাইনবোর্ড স্থাপন করে বাড়িটির নামকরণ করা হয় ‘বিহঙ্গ বিলাস’। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদেক, পায়রা বন্দর নৌ-পুলিশের ইনচার্জ নয়ন কারকুন এবং অ্যানিমেল লাভার্স অফ পটুয়াখালী-এর কলাপাড়া শাখার সদস্যরা।

স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, মধুখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আখতারুজ্জামানের বাড়িতে প্রায় চার দশক ধরে নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে বসবাস করছে হাজারো দেশীয় ও পরিযায়ী পাখি।

সকালবেলা মাত্র ঘুম থেকে উঠছেন বাড়ির লোকজন। পাখিরা সমবেত ডাকে সরগরম করে রেখেছে সারা বাড়ি। তার বাড়িতে থাকা গাছগুলোতে ৪০ বছর ধরে থাকছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। বাড়ির লোকজন এসব পাখির সঙ্গে আছেন, পাখিরা তাঁদের সঙ্গে আছে। ওই ডাককে তাঁরা আর আলাদা করতে পারেন না। পাখি, পাখির ডাক সব কিছুই এখন তাঁদের বাড়ির অংশ হয়ে গেছে, সংসারযাপনের অংশ হয়ে গেছে।

কলাপাড়ায় শিক্ষকের বাড়ি এখন পাখির অভয়াশ্রম, নাম ‘বিহঙ্গ বিলাস’

দিনশেষে পাখিরা ঘরে ফেরে। সেই ঘর তো গাছ, গাছেরই ডালপালা। তবে সব গাছই পাখির ঘর হয় না। যেখানে নিরাপদ আশ্রয় আছে, মানুষের সঙ্গ, মমতা-ভালোবাসা আছে, পাখিরা সেরকম স্থান, গাছপালাকেই ঘর করে নেয়। সেখানে রাত কাটায়, বাসা বোনে। নিরাপদ আশ্রয়, আর মমতার বন্ধনে গড়া সুখের নীড়। কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা না থাকায় আপন মনে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘর বেঁধেছে পাখিরা। যেন জনম-জনমের বাঁধনে আটকা পড়েছে পাখি আর মানুষের এক অসম প্রেমের কাহিনি। এটি কোনো গহিন অরণ্যের দৃশ্য নয়, বাস্তব চিত্রে ঠাসা এক শিক্ষানুরাগীর বাড়িতে হাজারো পাখ-পাখালি বসবাসের গল্প।

যেখানে দিনভর পাখিদের কলকাকলি আর মিষ্টি ডাকুনিতে মুখরিত হয় চারপাশ। আর প্রভৃতি পাখির আবাসস্থল গড়ে ওঠায় স্থানীয়দের কাছেও এখন বাড়িটি পরিচিতি লাভ করেছে ‘পাখিবাড়ি’ নামে।

পূর্ব মধুখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আখতার হোসেন একজন পাখিপ্রেমী মানুষ। যার বাড়ির গোটা আঙিনাসহ চারিধারে রয়েছে অসংখ্য গাছপালা। আর গ্রামীণ এ পরিবেশে কোনো হুমকি না থাকায় গড়ে উঠেছে বন্যপাখির অভয়াশ্রম।

ফলে এ বাড়িতেই বিভিন্ন প্রজাতির সাদা বকসহ পানকৌড়ি আর বাদুড় বসবাস করছে নির্ভয়ে। বাসা নির্মাণের পর তাদের প্রজন্মও বেড়ে উঠছে প্রকৃতির গতিতে। তবে ওপর থেকে দেখলে মনে হয় এ যেন পাখির এক মিলন মেলা। এখানে প্রবেশ করলেই পাখিদের খুনশুটি আর কলতানে প্রাণ জুড়িয়ে যাবে যে কারও।

তবে এখানে অসংখ্য পাখির মলত্যাগের ফলে শিক্ষক পরিবারের সব সদস্যরা কিছুটা বিরক্ত হলেও পাখিদের সঙ্গে তাদের রয়েছে এক নীরব সখ্য। অধিকাংশ সময় ডাক দিলেই পাখিরা গাছ থেকে চলে আসে তাদের হাতের নাগালে। পাখিদের বিরক্ত করা তো দূরের কথা পাখির নিরাপত্তার জন্য পরিবারের সব সদস্যই রাখেন আলাদা নজর। শুধু পরিবারের সদস্যরাই নন, পাখিদের নিরাপদ বিচরণের জন্য এলাকাবাসী রয়েছে যথেষ্ট সচেতন। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে পাখিদের বাসস্থল এ বাড়িটি এখন স্থানীয়দের কাছেও অনেক গর্বের।

এ বাড়িটি পাখির আশ্রয়স্থল হয়েছে। সন্ধ্যা হলেই ওই বাড়িতে বক, পানকৌড়িসহ ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আসে। তারা সেখানে রাত কাটায়। ভোরে আবার উড়ে চলে যায় খোলা প্রান্তরে। ওই বাড়ির লোকজনের সঙ্গে মিলেমিশে পাখিগুলো থাকছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে সন্ধ্যায় গিয়ে দেখা যায়, ওই বাড়িতে পাখির মেলা বসেছে। সাদা-কালো রেখার মতো পাখিরা উড়ে আসছে। কখনো দল বেঁধে, কখনো এক-দুইটা করে। বাড়ির চারদিক খোলা। সবদিক থেকেই পাখি উড়ে আসে। আছে সাদা বক, পানকৌড়ি। আছে শালিক, ঘুঘু, বুলবুলি, ফিঙেসহ অচেনা ছোট ছোট পাখিরাও। অন্ধকার গাঢ় না হওয়া পর্যন্ত পাখিদের এই চঞ্চলতা চলতে থাকে।

‘আমার ঘরের পাশে গাছ আছে এক/ তাতে বাসা বেঁধেছিল পাখি প্রসূতিকালে/ ডিম ফুটে ছানা হল, ছানাদের ডানা হলো/ ডানা মেলে উড়ে গেল বাসাটা ফেলে’/...গানের এই পঙ্ক্তিগুলো শিল্পী মৌসুমি ভৌমিকের। এটি গানের একটি অংশ হলেও একটি বাড়ি কিন্তু এ রকমই এখন। একটি নয়, অনেকগুলো গাছ আছে সেই বাড়িটির ঘরের পাশে। আর সেই গাছগুলোতে অনেকগুলো পাখির বাসা। খড়কুটোতে পাখিরাই তা বুনে নিয়েছে।

কলাপাড়ায় শিক্ষকের বাড়ি এখন পাখির অভয়াশ্রম, নাম ‘বিহঙ্গ বিলাস’

সেসব বাসায় তারা ডিম পেড়েছে, ডিমে তা দিয়েছে। একদিন ডিম ফুটে ছানা হয়েছে। মা সেই ছানাদের বিপদ-আপদ থেকে আগলে রাখছে। দূর মাঠ থেকে, জলাভূমি থেকে ঠোঁটে করে বয়ে নিয়ে আসছে মাছ। অপেক্ষা-কাতর ছানাদের মুখে তুলে দিচ্ছে আহার। দেখতে দেখতে ছানারা বড় হয়ে উঠছে। গাছের ডালে ডালে উড়ছে, ফিরে আসছে। পাশেই বসে থাকা মা ছানাদের এই দুষ্টুমিপনায় আহ্লাদে ডানা ঝাড়ছে।

বাড়িটিতে ঢোকার মুখে পাখি-সাম্রাজ্যের কিছুই টের পাওয়া যায় না। কখনো হয়তো এক-দুটি বক পাখি, নয়তো দু -–একটি পানকৌড়ির উড়ে যাওয়া চোখে পড়তে পারে। বাড়ির পুকুরপাড়ের বাঁশঝাড়, আমগাছ, তেঁতুলগাছসহ বুনো গাছজুড়ে শুধু সাদা সাদা বক বসে আছে। কোনোটা হঠাৎ দুই ডানা মেলে উড়াল দিচ্ছে, পুকুরের ওপর এক-দুই পাক খেয়ে আবার আগের জায়গাতেই ফিরছে। কোনোটি অনেকটা ময়ূরের মতো পালক ফুলিয়ে বাসার কাছে বসেছে। ছানারা কিচিরমিচির করছে এখানে-ওখানে।

গাছের শাখা-প্রশাাখার ভাঁজে, পাতার নিচে খড়কুটো দিয়ে তৈরি করা এই বাসাগুলোতে ছানারা কখনো সরব, কখনো নিশ্চুপ। কোনোটিতে মা বক পাখি বসে ডিমে তা দিচ্ছে। কোনো বাসায় মা ছানাদের মুখে তুলে দিচ্ছে সংগ্রহ করে নিয়ে আসা খাবার। ছানারা হাঁ করছে, মা মুখের ভেতর পুরে দিচ্ছে খাবার। একইভাবে একটি তেঁতুলগাছের একটি বাসায় একটি পানকৌড়ি কোথা থেকে উড়ে এসে দু’-তিনটি ছানার মুখে তুলে দিল আহার। এ আরেক সংসার। মানুষের কাছাকাছি ওটা শুধু পাখিরই জগৎ।

বৃষ্টি-ঝোড়ো বাতাস হলে অনেক পাখি গাছপালার নিচে নেমে আসে। বাড়ির পেছনে, এখানে-সেখানে হাঁটাহাঁটি করে। ঝড়ে অনেক ছানা নিচে পড়ে যায়। যতটা সম্ভব তাঁরা ছানাদের বাসায় ফিরিয়ে দেন। কিছু উড়ে যায়। বনের মতো পাখিপাড়ার একটা পরিবেশ এখন গ্রামের এই অংশটিতে। কে কার প্রতিবেশী, বড় কথা নয়। তারা আছে মিলেমিশে আত্মীয় যেন। মুসুলিয়াবাদ গ্রামের বাসিন্দা সায়েম হোসেন বলেন, ছোট থেকেই দেখছি, আখতার স্যারের বাড়িতে প্রচুর পাখি বসবাস করে। বাড়িটিতে প্রবেশ করলেই প্রাণ জুড়িয়ে যায়। আমরা সব সময় নজরদারি রাখি, যাতে পাখিদের কেউ সমস্যা করতে না পারে।

একই এলাকার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব ইকরামুল হোসেন বলেন, পাখিরা আসলে সব গাছ ও বাড়িতে থাকে না। শিক্ষক আখতার হোসেনের বাড়িতে প্রায় ৪০ বছর ধরে পাখিগুলো থাকছে। তারা পরিবারের সবাই পাখির খুব যত্ন করে।

শিক্ষক আখতার হোসেন বলেন, অনেক সময় অনেক আহত পাখি আমাদের বাড়িতে আসে। তাদের চিকিৎসা দেই। আবার অনেক পাখির বাচ্চা খাবার খেতে পারে না। গাছ থেকে নামিয়ে সেগুলোকে নিয়মিত খাবার খাওয়াই। পরিবারের সবাই পাখিগুলোর নিরাপত্তার জন্য সব সময় নজর রাখি। তাই আমার পরিবারের সবার সঙ্গেই পাখিদের একটা মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে।” তিনি আরো বলেন, “অসংখ্য পাখির মলত্যাগের কারণে বাড়িতে কিছুটা দুর্গন্ধ হয়। আমরা সবসময় দুর্গন্ধ নাশক ছিটিয়ে বাড়িতে থাকি। আশা করছি, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাকারী পাখি সুরক্ষায় সমাজের সবাই এগিয়ে আসবেন।

পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে বাড়িটির বিষয়টি গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। এর পরই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিয়ে বাড়িটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করে। স্থানীয়দের আশা, এ উদ্যোগের মাধ্যমে পাখির সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে ‘বিহঙ্গ বিলাস’।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদেক বলেন, উপজেলায় বালিয়াতলী ইউনিয়নের শিক্ষকের বাড়ি এখন পাখির অভয়াশ্রম, নাম ‘বিহঙ্গ বিলাস’ দেয়া হয়েছে। পাখির সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে ‘বিহঙ্গ বিলাস’।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও তারুণ্য ধরে রাখবে কাঁকরোল

মণিরামপুরে ইমামুল হত্যাকাণ্ডে আটক হুসাইনের স্বীকারোক্তি

ঋণের প্রলোভনে টাকা আত্মসাত, মাহমুদাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা

পাওনা টাকা চাওয়ায় ভাতিজার মারধরে বৃদ্ধ নিহত

সেবা নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা সাধারণ মানুষের

মণিরামপুর পৌরসভার উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণা

এস আলমের প্রভাবমুক্ত ইসলামী ব্যাংকের দাবিতে রাজশাহীতে মানববন্ধন

কেশবপুরে ভূমি সহকারীর বাড়িতে অজ্ঞান পার্টির হানা

একনেক সভায় ১০ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন

জামায়াতের ৮.৩৯ লাখ কোটি টাকার ছায়া বাজেট প্রস্তাব

পুরুষ বন্ধুদের কাছ থেকে উপহার পেতে আনুশকার অস্বস্তি!

মণিরামপুরে নাতনীকে উত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা, আটক-১

তথ্য উপদেষ্টা / স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয়, থাকবে না দলীয় প্রতীক

যশোরসহ ২০ অঞ্চলে ঝড়ের সম্ভাবনা

উত্তাল বঙ্গোপসাগর, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

ঘুসের টাকা গুনে নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল, বাগমারা থানার পুলিশ পরিদর্শক প্রত্যাহার

মহম্মদপুরে মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশকে নতুন সিল

রামিসা হত্যা: সোহেল ও স্বপ্না ‘কনডেম সেলে’

কেশবপুরে শরীকানা পুকুরের মাছ লুটের অভিযোগ

রাজশাহীতে বিভাগীয় পর্যায়ে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

X