
“সুদূর প্রবাসে আছেন স্বামী, পথ চেয়ে বসে আছেন গৃহিণী। মাসের পর মাস অপেক্ষায় দিন কাটে একটি খবরের জন্য। অবশেষে একদিন মেঠোপথ ধরে সাইকেলের ‘ক্রিং ক্রিং’ বেল বাজিয়ে (শব্দ তুলে) হাজির হলেন ডাকপিয়ন। হাতে সেই কাক্সিক্ষত হলুদ খাম। খামটি হাতে নিয়ে গৃহিণীর সে কী আনন্দ! সেই চিঠিতে লেগে ছিল প্রিয় মানুষের ঘামের গন্ধ আর হৃদয়ের স্পন্দন।” এমন দৃশ্য আজ কেবল রূপালী পর্দার দৃশ্যপট কিংবা স্মৃতির পাতায় ধূলোজমা এক অধ্যায়।
তথ্য-প্রযুক্তির দ্রুতগামী স্রোাতে ভেসে গেছে বাঙালির হাজার বছরের সেই আবেগের বাহন ‘চিঠি’। কালের বিবর্তনে বিলীন হয়েছে হাতে লেখা চিঠির ব্যবহার। এক সময় চিঠিতেই ছিল মানুষের সুখ-দুঃখ, মান-অভিমান, আবেগ-ভালোবাসা আর বার্তা পৌঁছানোর একমাত্র নির্ভরযোগ্য সেতু। কিন্তু আজ স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকা প্রজন্মের কাছে ‘চিঠি’ মানে কেবল দাপ্তরিক কোনো নথি বা নিছক এক নস্টালজিয়া।
মোবাইল ফোন আসার আগে গ্রাম থেকে শহর; সর্বত্রই ছিল চিঠির রাজত্ব। এক পোস্ট অফিস থেকে অন্য পোস্ট অফিসে চিঠির বস্তা পৌছে দিতেন রানার। সেই চিঠি বিলি করতে পোস্টম্যান ছুটে চলতেন গ্রাম-গ্রামান্তরে। মানুষ অপেক্ষা করত ডাকপিয়নের জন্য। পোস্ট অফিসের সামনে ভিড় লাগত মানি অর্ডার আর খবরের সন্ধানে। মনের মাধুরী মিশিয়ে বাহারি রঙের কাগজে প্রিয়জনের কাছে পাঠানো হতো হৃদয়ের আকুতি। শুরুতে ‘পরম শ্রদ্ধেয়’ বা ‘প্রাণের প্রিয়া-প্রিয়’ লিখে যে কথামালা সাজানো হতো, তার প্রতিটি অক্ষরে জড়ানো থাকতো অকৃত্রিম যত্ন, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও মায়া-মমতা।
‘রানার ছুটেছে তাই ঝুম ঝুম ঘন্টা বাজছে রাতে, রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে, রানার চলেছে, রানার!, রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার। দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার, কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার। রানার! রানার! জানা-অজানার, বোঝা আজ তার কাঁধে, বোঝাই জাহাজ রানার চলেছে চিঠি আর সংবাদে; রানার চলেছে, বুঝি ভোর হয় হয়, আরো জোরে, আরো জোরে হে রানার দুর্বার-দুর্জয়।’ সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’ কবিতায়ও ফুটে উঠেছে এরম মর্মার্থ।
বিজ্ঞানের জয়যাত্রা আমাদের জীবনকে করেছে গতিশীল, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষার মধুর স্বাদ। এখন আর প্রিয়জনের চিঠির উত্তরের জন্য মাসের পর মাস প্রহর গুনতে হয় না। হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক মেসেঞ্জার বা ইনস্টাগ্রামের চ্যাটবক্সে মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে মনের বার্তা। ‘চিঠি’ এখন স্থানান্তরিত হয়েছে ‘টেক্সট’ বা ‘ইমোজিতে’। চিঠির জায়গায় এখন নীল রঙের ‘সিন’ স্ট্যাটাসই বলে দেয় বার্তাটি পৌঁছালো কি না। কিন্তু যান্ত্রিক এই দ্রুততায় সেই গভীরতা ফিকে হয়ে গেছে।
চিঠি কেবল যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না, তা ছিল এক ধরনের শিল্প। অনেকে প্রতিদিন দেখা হওয়া মানুষটির জন্যও চিঠি লিখতেন। কারণ, যা মুখে বলা অসম্ভব ছিল, তা চিঠির মাধ্যমে গুছিয়ে বলা যেত খুব সহজে। সেই প্রেমিক-প্রেমিকার আকুলতা কিংবা সন্তানের জন্য মায়ের চোখের জল; সবই সিক্ত করতো চিঠির কাগজকে। আজ সোশ্যাল মিডিয়ার ভিউ আর লাইকের ভিড়ে সেই গভীর ব্যক্তিগত নিবেদনগুলো যেন অনেকটাই কৃত্রিম হয়ে পড়েছে।
তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার গত এক দশকে ৯৫ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। এখন পোস্ট অফিসগুলো টিকে আছে কেবল সরকারি চিঠিপত্র, চাকরির নিয়োগপত্র, বাণিজ্যিক পার্সেল, প্রশ্নপত্র আদান-প্রদান এবং সঞ্চয়পত্র খোলাসহ রুটিন কিছু কাজ। ডিজিটাল বাংলাদেশের এই যুগে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা সারা বিশ্বকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। ইউটিউব আর ভিডিও কলের মাধ্যমে দূরত্ব ঘুচলেও ঘোচেনি স্মৃতির হাহাকার। হলুদ খাম, পোস্টকার্ড আর শেষে সেই ‘ইতি তোমারই...’ বাক্যগুলো এখন ইতিহাসের অংশ।
সভ্যতা এগোবেই, নতুনের আগমনে পুরনোকে বিদায় নিতে হয়; এটাই জগতের নিয়ম। তবে চিঠি হারিয়ে গেলেও এর সাথে মিশে থাকা আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃৃতির শেকড়কে ভুলে যাওয়া অসম্ভব। ডাকপিয়নের সেই সাইকেলের বেল হয়তো আর কানে বাজে না, কিন্তু নিভৃতে প্রবীণরা আজও হয়তো ডাকপিয়নের সেই ফেলে আসা শব্দের প্রতিধ্বনি খুঁজে বেড়ান। বর্তমান প্রজন্মের কাছে চিঠি হয়তো এখন এক জাদুঘরের সামগ্রী, কিন্তু যারা চিঠির যুগে বাস করেছেন, তাদের কাছে এটি ছিল এক অমর ভালোবাসার দলিল। তথ্য-প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষতার যুগেও চিঠির সেই শৈল্পিক আবেদন আজন্ম অম্লান হয়ে থাকবে আমাদের স্মৃতির মণিকোঠায়।
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা পোস্ট অফিসের পোস্টম্যান (চিঠি বিলিকারী) সুধাংশু শেখর রায় বলেন, ‘১২ বছর ধরে এই চাকরিতে আছি। এখন আর আগের মতো চিঠিপত্র আদান-প্রদান হয় না।
রানার মো. অহিদুল ইসলাম বলেন, ‘রুটিন মতো প্রতিদিন সকালে ডাকবাক্স খুলি। তারপর চিঠিপত্র যা হয় তা প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে মাগুরা প্রধান শাখায় পৌছে দিয়ে আসি। মহম্মদপুর উপজেলা পোস্ট মাস্টার (অ.দা.) অনিন্দ্য চৌধুরী বলেন, “প্রথমতো সপ্তাহে দুইদিন বন্ধ থাকে। ২৪ ঘণ্টা সার্ভিস নেই। তথ্য-প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় হাতে হাতে স্মার্ট ফোন হওয়ায় ফেসবুক মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো এবং ইমেইলসহ নানা প্লাটফর্মে যোগাযোগ সহজ হওয়ায় চিঠির প্রবণতা আজ বিলুপ্তির পথে।”
মন্তব্য করুন