
ষড়ঋতুর পরিক্রমায় ও বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী প্রকৃতিতে আজ থেকে শুরু হলো জ্যৈষ্ঠের জয়গান। আজ পয়লা জ্যৈষ্ঠ। কাঠফাটা রোদ আর ভ্যাপসা গরমের অস্বস্তি ছাপিয়ে বাঙালির ঘরে ঘরে বইবে উৎসবের আমেজ। প্রকৃতির ঝুলি থেকে টুপটুপ করে ঝরছে রসালো সব ফল। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, আশফল আর তালশাঁসের মৌ মৌ গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে উঠবে চারপাশ। এই যে ফলের সমারোহ, এই যে রসনার তৃপ্তি বিলাস; সবকিছু মিলিয়েই জ্যৈষ্ঠ আমাদের কাছে ‘মধুমাস’।
বাংলা পঞ্জিকা ও সাহিত্য বিশ্লেষণে ‘মধুমাস’ নিয়ে কিছুটা মতান্তর রয়েছে। আভিধানিক ও কাব্যিক অর্থে ফাল্গুন-চৈত্র তথা বসন্তকালকেই মূলত মধুমাস বলা হয়। বসন্তের মৃদুমন্দ হাওয়া, কোকিলের কুহুতান আর নবপল্লবের সমারোহে প্রকৃতি যখন মধুময় হয়ে ওঠে, তখন তাকেই বলা হতো মধুমাস। কিন্তু লোকজ ঐতিহ্যে জ্যৈষ্ঠের রসাল ফলের মিষ্টতা এতোটাই প্রভাবশালী যে, সাধারণ মানুষের কাছে জ্যৈষ্ঠই হয়ে উঠেছে প্রকৃত মধুমাস। জ্যৈষ্ঠ মানেই রসাল ফলের রসে রঙিন হওয়ার মহোৎসব।
পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের সেই চিরচেনা পঙক্তি-‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ, পাকা জামের মধুর রসে রঙিন করি মুখ’ আজও প্রতিটি বাঙালির শৈশবকে মনে করিয়ে দেয়। একসময় গ্রাম-বাংলায় জ্যৈষ্ঠ আসা মানেই ছিল স্কুল-কলেজে ‘আম-কাঁঠালের ছুটি’। সেই ছুটির দুপুরে দলবেঁধে আম কুড়ানো কিংবা গাছের তলায় বসে লবণের ছিটে দিয়ে কাঁচা আম খাওয়ার স্মৃতি আজও প্রবীণদের হৃদয়ে নস্টালজিয়া তৈরি করে। সকালের সূর্য ওঠার আগেই ঝড়ে পড়া আম খোঁজা, লিচুর গায়ে সিঁদুরে রঙের ছোয়া দেখা কিংবা জামের কষালো রসে জিহ্বা বেগুনি করার সেই আনন্দ আধুনিক যান্ত্রিকতায় অনেকটা ম্লান হলেও আবেদন হারায়নি।
এ সময়ে বাংলার জনপদ এক অদ্ভুত ঘ্রাণে আচ্ছন্ন থাকে। বাগানে বাগানে থোকায় থোকায় ঝুলছে হিমসাগর, ল্যাংড়া ও আম্রপালিসহ নানান জাতের আম। লিচুর ঘ্রাণে মাতাল মৌমাছির দল। কাঁঠালের কষ আর মিষ্টি গন্ধে বাড়ির উঠান মুখরিত। গ্রামের গৃহিণীরা ব্যস্ত নতুন ফসল শুকোতে, আর শিশুরা ব্যস্ত হাতের কনুই বেয়ে পড়া আমের রস সামলাতে। জ্যৈষ্ঠের তপ্ত দুপুরে গাছের ছায়ায় বসে যখন রসাল কোনো ফলের স্বাদ নেয়া হয়, তখন শরীরের ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই ধুয়ে যায়। মাটির বুকে পড়া ফলের রসের উপর পিঁপড়ের সারি যেন মনে করিয়ে দেয়; প্রকৃতি তার দান সবার জন্যই উন্মুক্ত রেখেছে।
গ্রামের মানুষ গাছ থেকে পেড়ে সতেজ ফলের স্বাদ পেলেও শহুরে মানুষের নিয়তি ভিন্ন। বাজারের থরে থরে সাজানো লিচু কিংবা আম দেখলেই মন আনচান করে ঠিকই, কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক ভয়াবহ শঙ্কা। অধিক মুনাফালোভী এ শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী চক্র অপরিপক্ব ফলকে পাকাতে এবং দীর্ঘদিন তাজা রাখতে ব্যবহার করছে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন বা ইথ্রিল-এর মতো বিষাক্ত রাসায়নিক। যে রসাল ফল হওয়ার কথা ছিল জীবনীশক্তির উৎস, তা আজ হয়ে উঠছে ‘বিষের ভান্ডার’। সাধারণ মানুষ জ্যৈষ্ঠের স্বাদ নিতে মরিয়া হয়ে চড়া দামে ফল কিনলেও মাঝেমধ্যেই তাদের ভাগ্যে জুটছে কেমিক্যালযুক্ত নিষ্প্রাণ ফল। বাঙালির এই চিরকালীন আবেগ আর অনুভূতির সাথে এমন প্রতারণা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সব বিতর্ক ও প্রতিবন্ধকতা ছাপিয়ে জ্যৈষ্ঠ বাঙালির জন্য এক প্রাণের মাস। জ্যৈষ্ঠের এই উত্তাপ আমাদের শেখায় ধৈর্যের পর কীভাবে মিষ্টি সুফল পাওয়া যায়। আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও শৈশবের স্মৃতি এই মাসকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। তবে এই ঐতিহ্যের স্বাদকে নিরাপদ রাখতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা অত্যন্ত জরুরি। বিষমুক্ত ফলের নিশ্চয়তা পেলে তবেই জ্যৈষ্ঠের নাম ‘মধুমাস’ হিসেবে পূর্ণ সার্থকতা পাবে। বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে অটুট থাকুক আম-কাঁঠালের সেই পুরনো তৃপ্তি।
মন্তব্য করুন