
ডিজিটাল বাংলাদেশের ছোঁয়া লেগেছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের হাতেও এখন স্মার্টফোন, ঘরের (বাসা-বাড়ি) কোণে পৌঁছে গেছে আধুনিক চিকিৎসা সেবা। অথচ এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও দেশের গ্রামীণ জনপদ, এমনকি শহরের ব্যস্ত ফুটপাথ বা মোড়ে মোড়ে এখনো দেখা মেলে এক চিরচেনা মধ্যযুগীয় দৃশ্যের। মাইকের আওয়াজ, নানান সুর-গান, সারবস্তাহীন-চটকদার সব কথার মাধ্যমে লোকজন জড়ো করছেন।
সামনে সাপের বাক্স কিংবা অদ্ভুত কোনো গাছ-গাছড়া, সালশা আর হালুয়ার পসরা সাজিয়ে চলছে ‘সব রোগের দাওয়াই’ বিক্রি। ভ্রাম্যমাণ হেকিম, কবিরাজ ও ক্যানভাসারদের এই চটকদার দাওয়াই বাণিজ্য বিজ্ঞান ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এখনো রমরমিয়ে চলছে। জনস্বাস্থ্যের বারোটা বাজাচ্ছে তথাকথিত এই ‘দাওয়াই’ বাণিজ্য।
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা সদর বাজারের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শহীদ রওশন মার্কেটের সামনে ঠিক এমনই এক চিরায়ত অথচ উদ্বেগজনক চিত্র চোখে পড়ে। সারি সারি কাঁচের বয়ামে সাজানো রঙ- বেরঙের শেকড়-বাকড়, ফল-ফলাদি, পাউডার, হালুয়া, সালসা, বড়ি আর অদ্ভুত সব লিকুইড। মাঝখানে মায়াজাল বোনা কথার জাদুকর ‘ক্যানভাসার’ মাইক হাতে হাঁক ছাড়ছেন। তাকে ঘিরে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে আছেন নানা বয়সী উৎসুক মানুষ।
ক্যানভাসারদের কথার ধরনটাই এমন যে, সাধারণ মানুষ খুব সহজেই তাদের ফাঁদে পা দেয়। আমাশয়, জন্ডিস, গ্যাস্ট্রিক, বাতের ব্যাথা, পেট ব্যথা, শ^াসকষ্ট, ডায়াবেটিস থেকে শুরু করে চর্ম ও গোপন যৌন রোগের মতো অতি সংবেদনশীল ও জটিল-কঠিন রোগ নিরাময়ের গ্যারান্টি দেওয়া হয় এই মজমাগুলোয়। বিজ্ঞান যেখানে ক্যানসার বা ডায়াবেটিসের স্থায়ী নিরাময় নিয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণা করছে, সেখানে এই হেকিম, ডাক্তার-কবিরাজরা নামমাত্র মূল্যে হালুয়া, সালসায় সেই রোগ চিরতরে দূর করার দাবি করছেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে, আধুনিকতার এই সোনালি সময়েও মানুষ কেন এসব কিনছে? এর পেছনে রয়েছে মূলত তিনটি কারণ-অসচেতনতা, সস্তায় চিকিৎসা পাওয়ার মানসিকতা এবং লোকলজ্জার ভয়। বিশেষ করে চর্ম ও যৌন রোগের ক্ষেত্রে গ্রামের মানুষ এখনো মূল ধারার চিকিৎসকের কাছে যেতে দ্বিধাবোধ করেন। আর এই সুযোগটিই নেয় তথাকথিত হেকিম-কবিরাজরা। তারা মানুষের মনস্তত্ত্ব ভালো বোঝেন। এমনভাবে কথা বলেন যেন মনে হয়, এই ওষুধ বা দাওয়াই না নিলে জীবনের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। উপকার হোক আর না হোক, সস্তা এবং সহজলভ্য হওয়ায় গ্রামের মানুষ হুজুগে পড়ে এগুলো কিনছেন।
চিকিৎসকদের মতে, এই অবৈজ্ঞানিক ‘দাওয়াই’ জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি ও ভয়াবহ ক্ষতিকর। অনেকটা নীরব ঘাতকের মতো। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই সমস্ত কবিরাজি হালুয়া ও সালসার কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য অনেক সময় গোপনে ক্ষতিকর স্টেরয়েড, সস্তা পেইনকিলার কিংবা ভারী ধাতু (পারদ, সিসা, ভায়াগ্রা) মেশানো হয়। সাময়িকভাবে এতে একটু স্বস্তি ও আরাম বোধ হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এগুলো মানুষের লিভার, কিডনি সম্পূর্ণ বিকল করে দিতে পারে। অনেক সময় ভুল চিকিৎসার কারণে সাধারণ রোগও পরবর্তীতে জটিল আকার ধারণ করে, যা রোগীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।
কেবল চটকদার দাওয়াই বা ওষুধই নয়, মফস্বল এলাকায় সাপুড়ে ও ওঝাসহ এক শ্রেণির সুযোগসন্ধানী লোক নানাবিধ অসুখ ভালো করার আশ্বাস দিয়ে তাবিজ-কবজ বিক্রি করছেন। আধুনিক চিকিৎসার যুগেও সাধারণ মানুষের সরলতা ও কুসংস্কারকে পুঁজি করে এই অপচিকিৎসা চালানো হচ্ছে।
গ্রাম-উপজেলা ও জেলা পর্যায় থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন শহরের বাস টার্মিনাল বা রেলস্টেশনে প্রতিনিয়ত এই অপচিকিৎসার হাট বসছে। অথচ ড্রাগ অ্যাক্ট অনুযায়ী, প্রেসক্রিপশন ছাড়া বা লাইসেন্সবিহীন এভাবে প্রকাশ্য রাস্তায় ওষুধ বা দাওয়াই বিক্রি করা সম্পূর্ণ অবৈধ। প্রশাসনের সঠিক নজরদারি ও নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান না থাকায় এই ক্যানভাসাররা পার পেয়ে যাচ্ছেন।
গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-যাত্রার মান বাড়লেও, স্বাস্থ্য সচেতনতায় আমরা এখনো অনেকটাই পিছিয়ে। এই অন্ধবিশ্বাস আর অপচিকিৎসার কবল থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করতে হলে কেবল আইনের প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা। যতক্ষণ না মানুষ বুঝতে পারবে যে অলৌকিক কোনো দাওয়াইয়ে রোগ সারে না, ততক্ষণ মাগুরার মহম্মদপুর কিংবা দেশের হাজারো হাটের এই ঝুঁকিপূর্ণ ‘দাওয়াই বাণিজ্য’ বন্ধ করা অসম্ভব।
স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত প্রশাসনিক অভিযান এবং বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি না হলে এই ‘দাওয়াই’ বাণিজ্য বন্ধ করা কঠিন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষকে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই কমবে অপচিকিৎসার ভয়াবহ ঝুঁকি।
এ বিষয়ে মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. কাজী মো. আবু আহসান বলেন, “এই তথাকথিত হালুয়া ও সালসার কার্যকারিতা তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ানোর জন্য ক্যানভাসাররা এতে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর স্টেরয়েড, সস্তা পেইনকিলার, কিংবা পারদ, সিসা ও ভায়াগ্রার মতো মারাত্মক সব উপাদান মিশিয়ে থাকে।
এসব সেবনে সাময়িকভাবে একটু স্বস্তি বা উদ্দীপনা মিললেও, দীর্ঘমেয়াদে তা মানুষের লিভার ও কিডনিতে বিরুপ প্রভাব ফেলার আশঙ্কা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ভুল ও অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার কারণে সাধারণ ব্যাধিও জটিল আকার ধারণ করে রোগীকে ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়। তাই এই নীরব ঘাতক থেকে বাঁচতে সবার আগে প্রয়োজন জনসচেতনতা ও কুসংস্কার বর্জন।”
মন্তব্য করুন