
নদ-নদী, হাওড়-বাওড়, বিল-ঝিল আর ডোবা-নালার চিরচেনা রূপসী বাংলাদেশ। এই দেশের রূপের ক্যানভাসে এক অনন্য রঙ ছড়িয়ে রাখত নানান প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, যার মধ্যে অন্যতম সেরা জলজ রানী ‘পদ্ম’। এক সময় গ্রামীণ জনপদে বর্ষা থেকে শরতের শেষ পর্যন্ত বিলের পর বিল চোখ জুড়ানো পদ্ম ফুলের মেলা বসত। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট, দখল ও দূষণের করাল গ্রাসে এখন আশঙ্কাজনক হারে কমেছে মুগ্ধতা ছড়ানো এই ফুল। আরও কিছুকাল পর হয়তো আমাদের চিরচেনা এই প্রাকৃতিক ফুলের বিস্ময়কর শোভা কেবলই রূপকথা হয়ে থাকবে। নতুন প্রজন্ম দেখতে পাবে না এই ফুলের আসল রূপ ও সৌন্ধর্য।
আমাদের দেশে সাধারণত গোলাপি ও সাদা রঙের পদ্ম বেশি দেখা যায়। এর মধ্যে গোলাপি-সাদা মিশ্রণের এই কোমল ফুলটিকে বলা হয় ‘গোলাপি পদ্ম’। বর্তমানে দেশের প্রাকৃতিক জলাভূমিগুলোতে জাতীয় ফুল শাপলার দেখা মিললেও, পদ্মফুলের দেখা মেলা দুষ্কর না হলেও খুবই কম চোখে পড়ে। আর প্রকৃতিতে শুভ্রতার প্রতীক ‘সাদা পদ্ম’ তো এখন এক প্রকারের দুর্লভ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিল-ঝিলের ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হওয়ার কারণে একেবারেই অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এই ফুল।
একটা সময় ছিল, যখন বর্ষার পানিতে থই থই বিলের বুকে; গ্রামীণ শিশুরা দল বেঁধে, নৌকায় কিংবা সাঁতরে নেমে যেত পদ্মের সন্ধানে। পদ্মফুল, ফুলের কলি কিংবা পদ্মপাপড়ি একটা একটা করে ছিঁড়ে আঁটি বাঁধার সেই আনন্দ ছিল অপার্থিব। এক শিশু অপর শিশুর সঙ্গে সহাস্যে মেতে উঠত জলকেলিতে। গ্রামীণ জনপদের সেই মুগ্ধতা ছড়ানো সোনালী অতীত আজ প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। যত্ন আর সংরক্ষণের অভাবে আজ এই পদ্ম ফুল নিজের অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।
বাঙালি সংস্কৃতি ও সাহিত্যে পদ্ম ফুলের গুরুত্ব অপরিসীম। সংস্কৃতে এর রূপের উপর ভিত্তি করে হরেক রকম নামকরণ করা হয়েছে। যেমন-কমল, পদ্ম, পঙ্কজ, পঙ্করুহ, সরসিজ, সরোজ, সরোরুহ, জলজ, নীরজ ইত্যাদি। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার গানে লিখেছেন, ‘ওই পদ্মে ছিল রে যার রাঙা পা, আমি হারায়েছি তারে, পদ্মার ঢেউ রে...।’ আবার আধুনিক বাংলা সাহিত্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতায় বরুণার জন্য ১০১টি নীলপদ্ম জোগাড় করার এক আকুল আর্তি ফুটে উঠেছে। এই চরম সংকটের মাঝেও আশার আলো হয়ে রূপের দ্যুতি ছড়াচ্ছে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার পাল্লা গ্রাম।
এখানকার বাসিন্দা হাসান জাভেদ ইকবালের একটি পুকুরে প্রতি বছরের মতো এবারও ফুটেছে চোখ জুড়ানো অসংখ্য পদ্ম ফুল। মহম্মদপুর-বাবুখালী বেড়িবাঁধ সকড়ের পাশে অবস্থিত এই পুকুরে চোখ আকটে যায়। সবুজ পাতার উপরে মাথা চাড়া দিয়ে থাকা গোলাপি-সাদা রঙের অগণিত ফুল ও কলি যে কোনো পথচারীর মন কেড়ে নেয়।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর ধরে এই পুকুরটিতে পদ্ম ফুল ফুটছে। ভরা মৌসুমে এই নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকেও প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ এখানে ছুটে আসেন।
সচতেন মহলের মতে, কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার, জলাশয় ভরাট এবং বিল-ঝিল ইজারা নিয়ে মাছ চাষের কারণে পদ্মের প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। যদি এখনই সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে প্রাকৃতিক জলাশয়, ঐতিহ্যবাহী পদ্ম পুকুর ও বিলগুলো সংরক্ষণ করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে চিরতরে হারিয়ে যাবে কবির কবিতার এই অনন্য অনুষঙ্গ। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই রূপের রানী কেবলই বইয়ের পাতার ছবি হয়ে রবে।
সচেতন মহলের অভিমত, এখনই যদি প্রাকৃতিক জলাশয়, ঐতিহ্যবাহী পদ্মপুকুর ও বিল সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম প্রকৃতির এই অপূর্ব সৌন্দর্যকে শুধু বইয়ের পাতায় কিংবা ছবিতেই দেখতে পাবে। বাংলার জলাভূমিতে পদ্মের রাজত্ব ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সমন্বিত সংরক্ষণ উদ্যোগ, পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের সচেতন অংশগ্রহণ।
আজো কোথাও কোথাও ফুটে থাকা পদ্মফুল যেন নীরবে স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রকৃতিকে বাঁচানো মানেই আমাদের শেকড়, সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যকে বাঁচিয়ে রাখা।
মহম্মদপুরের পাল্লা গ্রামের শ্রীমন্ত বসু স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘পদ্মের সঙ্গে আমার যোগ শৈশবের, কৈশোরের। ২৫ তেকে ৩০ বছর আগে আমাদের গ্রামে একটি নতুন পুকুর খনন করেন আবু হাসান যশোরী অংকেল। সেই পুকুরে তিনি পদ্মের চাষ করেন। ফুলটাই বেশি আকর্ষণ করে শৈশবের মন, অতবড় গোলপাতা-পদ্মপাতায় বসতেও তো মন চাইত তখন।
স্কুলের ফাঁকে মাঝে-মধ্যেই পুকুরে ফোটা ফুল দেখতে বন্ধুদল চলে আসতাম। প্রায় দুই যুগ আগেকার কথা। গেছে সে দিন, একেবারেই কি গেছে। এখন আর আগের মতা পদ্মফুল দেখা যায় না। তবে আমাদের গ্রামের সেই পুকুরে আজো পদ্মফুল ফোটে।’
মন্তব্য করুন