
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একসময় যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ভবিষ্যতের হুমকি হিসেবে দেখা হতো, তা এখন বাস্তবতার কঠিন রূপ ধারণ করেছে। প্রতি বছরই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। এমনকি শীতপ্রধান দেশগুলোও তীব্র গরম ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হচ্ছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক গড় তাপমাত্রার ভিত্তিতে বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ ১০টি দেশের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকার বেশিরভাগ দেশই আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অবস্থিত।
১. বুর্কিনা ফাসো পশ্চিম আফ্রিকার ভূবেষ্টিত দেশ বুর্কিনা ফাসো বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম উষ্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত। বছরের অধিকাংশ সময় দেশটির ওপর দিয়ে শুষ্ক ও ধুলাবালিযুক্ত বাতাস প্রবাহিত হয়। গ্রীষ্মকালে অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি রেকর্ড করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে।
২. মালি সাহারা মরুভূমির বিশাল অংশজুড়ে বিস্তৃত মালি আফ্রিকার অন্যতম উষ্ণ দেশ। বছরের প্রায় আট মাসই দেশটির তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকে। খরা, মরুকরণ এবং ধুলোঝড়ের কারণে অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
৩. সেনেগাল আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী দেশ হলেও সেনেগালের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি। সাহারা মরুভূমির প্রভাবের কারণে দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম বিরাজ করে। গ্রীষ্মকালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানো এখন সাধারণ ঘটনা।
৪. মৌরিতানিয়া উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা মরুভূমি দ্বারা আচ্ছাদিত। সাহারার তীব্র তাপ ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে মৌরিতানিয়ার তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। গ্রীষ্মে অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে।
৫. জিবুতি পূর্ব আফ্রিকার ছোট দেশ জিবুতিকে বিশ্বের অন্যতম উষ্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সমুদ্র উপকূলবর্তী হওয়ায় এখানে তীব্র গরমের পাশাপাশি আর্দ্রতাও বেশি। সারা বছর ভ্যাপসা গরম অনুভূত হয় এবং বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ২৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকে।
৬. ওমান মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমান বিশ্বের সবচেয়ে গরম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বছরের প্রায় ছয় মাস তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি অবস্থান করে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে দেশটির গ্রীষ্মকাল আরও দীর্ঘ ও তীব্র হয়ে উঠছে।
৭. সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সংযুক্ত আরব আমিরাত-এ জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তীব্র গরম অনুভূত হয়। দুবাই ও আবুধাবির মতো শহরগুলোতে নগরায়ণ ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে তাপমাত্রা আগের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। গ্রীষ্মে অনেক সময় তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করে।
৮. সুদান আফ্রিকার এই দেশটিতে প্রায় সারা বছরই উষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করে। গড় তাপমাত্রা ২৭ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকে এবং গ্রীষ্মের চরম সময়ে ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। কম বৃষ্টিপাতের কারণে আবহাওয়া অত্যন্ত শুষ্ক।
৯. ভারত ভারত-এর রাজস্থান, দিল্লি, উত্তর প্রদেশ এবং পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কয়েকটি রাজ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভয়াবহ দাবদাহ দেখা গেছে। মে ও জুন মাসে তাপমাত্রা নিয়মিত ৪৮ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের হিটওয়েভে একাধিক তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে।
১০. সৌদি আরব সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম উষ্ণ দেশ। বিশেষ করে রুব আল খালি মরুভূমি সংলগ্ন এলাকাগুলোতে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৫০ থেকে ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়। বৃষ্টিপাতের অভাব এবং শুষ্ক পরিবেশের কারণে এখানকার গরম আরও কষ্টকর হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বর্তমান হারে চলতে থাকলে আগামী দশকগুলোতে বিশ্বের আরও অনেক দেশ চরম তাপমাত্রার ঝুঁকিতে পড়বে। তাপপ্রবাহ, খরা, পানির সংকট এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মতো সমস্যাও আরও তীব্র হতে পারে। তাই কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
মন্তব্য করুন