
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে ভারত সরকার স্বাগত জানালেও এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো উল্লেখ না করায় নতুন করে কূটনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিতে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলা হয়, এটি পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হতে পারে। তবে আলোচনার পেছনে ইসলামাবাদের সম্ভাব্য ভূমিকা বা কোনো মধ্যস্থতার প্রসঙ্গ সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সংযোগকারী ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে ইসলামাবাদে সম্ভাব্য আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনে বার্তা আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে ভারতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নীরব অবস্থান রাজনৈতিক মহলে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই নীরবতা ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করে তুলতে পারে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর পূর্বে মন্তব্য করেছিলেন যে ভারত কোনো “মিডলম্যান” বা মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র হতে চায় না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সক্রিয় ভূমিকা এবং ভারতের নীরবতা নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক মহল সরকারের কূটনৈতিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
কংগ্রেস নেতা রশিদ আলভি এবং সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা মেনন রাও পাকিস্তানের এই ভূমিকার ওপর বিশেষ আলোকপাত করেছেন। রশিদ আলভি প্রশ্ন তুলেছেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি যখন ইসরায়েলকে ‘পিতৃভূমি’ হিসেবে গণ্য করেন, তখন তিনি শান্তি স্থাপনকারীর ভূমিকা পালন করবেন কীভাবে।
অন্যদিকে নিরুপমা মেনন রাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, পাকিস্তান এখানে একটি সংকীর্ণ কিন্তু কার্যকর কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে যার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আদান-প্রদান সম্ভব হয়েছে। তার মতে, ভারত এই মুহূর্তে নীরব থেকে নিজের অবস্থানকে দুর্বল করছে এবং দিল্লির উচিত নির্দিষ্ট কোনো পক্ষের সঙ্গে একাত্ম না হয়ে পরিমিত কণ্ঠস্বরে শান্তি ও নৌ-নিরাপত্তার কথা বলা।
বিশ্লেষক অশোক সোয়াইন এই পরিস্থিতিকে ভারতের জন্য একটি বড় পরাজয় হিসেবে দেখছেন। তার মতে, মোদি পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিলেন কিন্তু উল্টো ভারতকেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, পাকিস্তান বর্তমানে একমাত্র রাষ্ট্র যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং ইরান—সব পরাশক্তির সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
সাংবাদিক অঞ্জনা শঙ্কর এবং আরও অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে শেহবাজ শরিফ সরকার যে মধ্যস্থতা করতে সফল হয়েছে, তা বিশ্ব রাজনীতিতে পাকিস্তানের গুরুত্ব পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। এর ফলে দীর্ঘ সাত বছর পর ইরানের তেল ভারতে আসার সুযোগ তৈরি হলেও এর কৃতিত্বের দাবিদার হিসেবে ভারতের পরিবর্তে পাকিস্তানের নামই সামনে আসছে।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির এই কূটনৈতিক অগ্রগতি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তানের ভূমিকা যেখানে প্রশংসা ও সমালোচনার মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাচ্ছে, সেখানে ভারতের নীরবতা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
মন্তব্য করুন