
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধাবস্থা প্রশমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান। প্রস্তাব অনুযায়ী, চূড়ান্ত সমঝোতা হলে হরমুজ প্রণালির ওমান অংশে থাকা আন্তর্জাতিক জলসীমা দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কোনো ধরনের আক্রমণের ঝুঁকি ছাড়াই নিরাপদে চলাচল করতে পারবে।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের বরাতে জানা যায়, কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাত ও বৈশ্বিক বাণিজ্যিক অচলাবস্থা কাটাতে ইরান এই প্রস্তাব দিয়েছে, যা তাদের পক্ষ থেকে একটি বড় কৌশলগত নমনীয়তার ইঙ্গিত।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
সংঘাত শুরুর পর পারস্য উপসাগরে শত শত বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়ে এবং প্রায় ২০ হাজার নাবিক আটকা পড়ে আছেন।
৮ এপ্রিল থেকে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে এখনো উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও মূল বিতর্ক এখনো এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।
ইরানের নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, তেহরান প্রণালির সংকীর্ণ ওমান অংশে জাহাজ চলাচলে কোনো বাধা দেবে না। তবে এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের কিছু শর্ত মেনে নিতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যদিও ইরান সেখানে পেতে রাখা মাইনগুলো সরিয়ে নেবে কি না অথবা ইসরায়েলের সাথে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকেও একই সুবিধা দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। পশ্চিমা নিরাপত্তা সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এই প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে, তবে ওয়াশিংটন এখনো এর আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব দেয়নি।
মাত্র ৩৪ কিলোমিটার প্রশস্ত এই প্রণালিটি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও সারসহ বিভিন্ন জরুরি পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর প্রধান রুট। এর আগে ইরান এই আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ এবং প্রণালির ওপর একতরফা সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার হুমকি দিয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক নৌ-কনভেনশনের বিরোধী হিসেবে দেখছিল বিশ্ব সম্প্রদায়।
লন্ডন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) সভায় সদস্য দেশগুলো ইরানের শুল্ক আরোপের চেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করে একে একটি ‘বিপজ্জনক নজির’ হিসেবে আখ্যা দেয়।
ইরানের এই প্রস্তাবকে কয়েক দশকের পুরনো স্থিতাবস্থা বা ‘স্ট্যাটাস কু’ ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯৬৮ সালে জাতিসংঘ ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সম্মতিতে প্রণীত ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম অনুযায়ী, এই জলপথে ইরান ও ওমানের জলসীমা আলাদা করে জাহাজ চলাচলের করিডোর নির্ধারণ করা হয়েছিল।
গত সোমবার থেকে ইরানের তেলবাহী জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবরোধ এবং ফেব্রুয়ারি থেকে সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল থমকে থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের ওমান সীমান্ত দিয়ে জাহাজ চলাচলের প্রস্তাবটি যুদ্ধ পরবর্তী স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরাতে একটি বড় মোড় হিসেবে কাজ করতে পারে।
মন্তব্য করুন