
গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ফিলিস্তিনি শিশুদের নিখোঁজ হওয়া, আটক এবং নির্যাতনের অভিযোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ থেমে থাকলেও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি, বরং নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে।
মানবাধিকার সংস্থা ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল ফিলিস্তিন জানিয়েছে, ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী গাজা থেকে শিশুদের কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ত্রাণ শিবিরের আশপাশ থেকেও শিশুদের তুলে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একটি প্রতিবেদনে ১৬ বছর বয়সী ওমর নিজার মাহমুদ আসফুরকে ত্রাণ শিবিরের কাছ থেকে আটক করে সামরিক কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া, শিশুদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, শিশুদের এভাবে আটক বা গুম করা গুরুতর অপরাধ। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে আইডিএফকে শিশু সুরক্ষায় ব্যর্থতার জন্য অভিযুক্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনারা গাজার শিশুদের আটক ও স্থানান্তর করছে। সম্প্রতি ১০ বছরের একটি ফুটফুটে শিশুকে বিনা কারণে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনারা অপহরণ করে নিয়ে যায়।
তাকে পরে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে পাশ করা বিতর্কিত মৃত্যুদণ্ডাদেশের মাধ্যমে ফাঁসি দেওয়া হয়। ইসরায়েলের এই পদ্ধতিগত গণহত্যার বিরুদ্ধে কোনও প্রতিবাদ না করে আরবরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে।
মানবাধিকার সংস্থা ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল-প্যালেস্টাইন (ডিসিআইপি)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনী গাজা থেকে শিশুদের আটক করে কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাচ্ছে।
সেভ দ্য চিলড্রেন-এর তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে গাজায় প্রায় ২১ হাজার শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে, গণকবরে সমাহিত হয়েছে অথবা ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক হয়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধের কারণে ১৭ হাজারেরও বেশি শিশু তাদের অভিভাবক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে অথবা এতিম হয়েছে। সামরিক অভিযানের সময় আটক বা নিখোঁজ হওয়ার ফলে পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের কোনো খোঁজ পাচ্ছে না।
এ বছরের মার্চ মাসের শেষের দিকে ইসরায়েলের নেসেট ফিলিস্তিনি বন্দিদের ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের একটি বিতর্কিত আইন পাস করেছে।
এই আইনটি পাসের মাধ্যমে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে থেকে ধরে আনা বন্দিদের ইসরায়েলিদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে দখলদার দেশটির আদালত।
মূলত, আটক ফিলিস্তিনিদের নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুকে বৈধতা দিতেই এই বিতর্কিত ও মানবতাবিরোধী আইনটি পাস করা হয়েছে।
এই আইনের অধীনে, ইসরায়েলি কারা পরিষেবা কর্তৃক নিযুক্ত কারারক্ষীদের দ্বারা ফাঁসি কার্যকর করা হবে এবং এতে জড়িতদের পরিচয় গোপন রাখা হবে ও আইনি সুরক্ষা দেওয়া হবে।
এই আইনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের বিশেষ আটক কেন্দ্রে স্থানান্তর এবং শুধুমাত্র অনুমোদিত পক্ষের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেতে পারে, যেখানে তারা কেবল তাদের আইনজীবীদের সঙ্গে ভিডিও কলের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারবে।
এই আইন আদালতকে প্রসিকিউটরদের তথ্য দেওয়া ছাড়াই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমতি দেয় এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয় না।
এই আইনটি ফিলিস্তিনিদের সম্পর্কিত মামলা পরিচালনাকারী সামরিক আদালতগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বিশ্বের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ এই গণবিরোধী কালাকানুনকে ঘৃণা করে।
মন্তব্য করুন