
গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে গণহত্যা, ভূমি দখল এবং অবৈধ বসতি স্থাপনের অভিযোগ উঠলেও এবার নতুন করে ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর ব্যাপক যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় এসেছে।
পুলিৎজার বিজয়ী কলামিস্ট নিকোলাস ক্রিস্টফ প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অন্তত ১৪ জন ফিলিস্তিনি নারী ও পুরুষের সাক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে তারা আটক অবস্থায় ভয়াবহ যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।
ক্রিস্টফ তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষ বা সেনা নেতৃত্ব সরাসরি ধর্ষণের নির্দেশ দিয়েছে—এমন প্রমাণ না থাকলেও একটি “নিরাপত্তা কাঠামো” তৈরি হয়েছে, যার ফলে যৌন সহিংসতা অনেক ক্ষেত্রে “স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর”-এর অংশে পরিণত হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে একজন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক সামি আল-সাই জানান, আটক থাকার সময় তাকে মারধর, বিবস্ত্র করা এবং শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তিনি বলেন, নির্যাতনের সময় তিনি মৃত্যুর জন্য প্রার্থনা করেছিলেন।
আরেকজন ফিলিস্তিনি কৃষক অভিযোগ করেন, নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলার চেষ্টা করলে তাকে লাঠি দিয়ে মারধর করা হয় এবং নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তারা তাকে চুপ থাকতে হুমকি দেন।
২০২৩ সালের পর আটক হওয়া এক ফিলিস্তিনি নারী অভিযোগ করেন, তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয় এবং আটক অবস্থায় একাধিকবার শারীরিক ও যৌন হেনস্তার শিকার হতে হয়।
অন্যদিকে, গাজার এক সাংবাদিক জানান, আটক অবস্থায় কেউই যৌন নির্যাতন থেকে নিরাপদ ছিলেন না।
ক্রিস্টফ কয়েক জন ফিলিস্তিনি কিশোরের সাক্ষাৎকারও নিয়েছেন। কিশোররা জানায়, আটক অবস্থায় ধর্ষণের হুমকি ছিল নিয়মিত ঘটনা। ১৫ বছর বয়সি এক কিশোরের ভাষ্য অনুযায়ী, কারারক্ষীরা বলেছিল, এটা করো (যৌনতার ইঙ্গিত), না হলে এই লাঠি তোমার শরীরে ঢুকিয়ে দেব। ক্রিস্টফ তার প্রতিবেদনে জাতিসংঘ, বি’তসেলেম, সেইভ দ্য চিলড্রেন, ইউরো মেইড হিউম্যান রাইটস মনিটর এবং কমিটি টু প্রটেক্ট জারনালিস্ট থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য সংযুক্ত করেছেন।
ইউরো-মেডের এক প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনী যৌন সহিংসতাকে ‘পদ্ধতিগত' এবং 'রাষ্ট্রসমর্থিত সংগঠিত নীতি'র অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। গুরুতর যৌন সহিংসতার ধারা নথিভুক্ত করেছে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন বিতসেলেম। অন্যদিকে সেভ দ্য চিলড্রেন জানায়, ইসরায়েলের হাতে আটক ফিলিস্তিনি শিশুদের মধ্যে জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকেরও বেশি বলেছে তারা যৌন সহিংসতা প্রত্যক্ষ করেছে বা নিজেরা এর শিকার হয়েছে।
তবে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েলের কারা কর্তৃপক্ষ। নিউ ইয়র্ক টাইমসের বরাতে এক মুখপাত্র বলেন, তারাসুস্পষ্টভাবে অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এসব অভিযোগকে 'ভিত্তিহীন' বলে অভিহিত করেছেন। ক্রিস্টফের মতে, দায়মুক্তির সংস্কৃতি এসব নির্যাতন চালিয়ে যেতে সহায়তা করছে। ইসরায়েলে নির্যাতনবিরোধী পাবলিক কমিটির নির্বাহী পরিচালক সারি বাশিই বলেন, ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক যৌন নির্যাতন বাস্তব ঘটনা। কারাগারে এসব স্বাভাবিক করা হয়েছে।
রিজার্ভ সেনাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ প্রত্যাহারের পর কড়া মন্তব্য করেন বাশিই। বাশিইয়ের ভাষায়, অভিযোগ প্রত্যাহার করা মানে ধর্ষণের অনুমতি দেওয়া। প্রতিবেদনের শেষে কলামিস্ট ক্রিস্টফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু আর্থিক ও সামরিকভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, তাই এসব অভিযোগ মোকাবিলার দায় ওয়াশিংটনেরও রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের আমেরিকান করের অর্থ ইসরায়েলের নিরাপত্তা কাঠামোকে সহায়তা করছে। ফলে এমন যৌন সহিংসতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও জড়িত।
এদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের ওপর কয়েক দফা রকেট ছুড়েছে হিজবুল্লাহ। এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি বাহিনী জানায়, কয়েক ঘণ্টায় ইসরায়েলি সেনাদের ওপর কয়েক দফা রকেট ছোড়া হয়। তবে এসব হামলায় কেউ হতাহত হয়নি বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। একটি পৃথক ঘটনায় ইসরায়েল জানিয়েছে যে, কিছুক্ষণ আগে লেবাননের একটি এলাকায় তাদের বিমান বাহিনী আকাশে একটি 'সন্দেহজনক লক্ষ্যবস্তু' আটকে দিয়েছে। সেখানে অভিযান চালাচ্ছিল ইসরায়েলি সৈন্যরা। এদিকে লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি হামলায় ১৩ জন নিহত হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় এক সেনাসদস্য, এক শিশু এবং দুই জন উদ্ধারকর্মীসহ ১৩ জন নিহত হয়েছেন।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নাবাতিয়া শহরে এক হামলায় পাঁচ জন নিহত হন। এদের মধ্যে দুই জন বেসামরিক প্রতিরক্ষা উদ্ধারকর্মীও রয়েছেন। এছাড়া জেবচিতের কাছে আরেকটি হামলায় এক সেনা ও এক সিরীয় নাগরিকসহ চার জন নিহত এবং বিন্ট জেবাইলে তৃতীয় হামলায় এক শিশু ও এক নারীসহ চার বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
সূত্র : দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, আলজাজিরা
মন্তব্য করুন