
গাজায় ইসরাইলের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান ও ধ্বংসযজ্ঞকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের চাপ, মানবাধিকার প্রশ্ন এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে এখন ইসরাইলের ভেতরেই নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে একটি পুরোনো ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণী—যা পরিচিত “অষ্টম দশকের অভিশাপ” নামে।
ইহুদি ধর্মীয় গ্রন্থ তালমুদের কিছু ব্যাখ্যার সঙ্গে যুক্ত এই ধারণায় বলা হয়, কোনো ইহুদি রাষ্ট্র ৮০ বছরের বেশি স্থায়ী হতে পারে না। বিশেষ করে রাষ্ট্রের ভেতরের বিভক্তি, রাজনৈতিক সংঘাত ও সামাজিক অস্থিরতাই শেষ পর্যন্ত পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমান ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালে। সেই হিসেবে ২০২৮ সালে দেশটি ৮০ বছরে পা দেবে। এখন ২০২৬—হাতে আছে মাত্র দুই বছর। আর এ কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে “অষ্টম দশকের অভিশাপ” নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।
ইসরাইলি সমাজের একাংশ মনে করছে, অতীতের বিভিন্ন ইহুদি রাষ্ট্রের পতনের ইতিহাস বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যাচ্ছে। ইতিহাসে নবী দাউদ (আ.)-এর রাজত্ব কিংবা হাসমোনিয়ান শাসনব্যবস্থার মতো ইহুদি রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘ সময় টিকতে পারেনি।
এই ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা থেকেই অনেকে আশঙ্কা করছেন, বর্তমান ইসরাইলও একই ধরনের সংকটের দিকে এগোচ্ছে। যদিও ইতিহাসবিদদের একটি বড় অংশ এই ধারণাকে ধর্মীয় ব্যাখ্যা বা রাজনৈতিক প্রতীকের অংশ হিসেবে দেখেন।
ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক এক লেখায় সতর্ক করে বলেছেন, দেশের সামাজিক বিভক্তি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট রেউভেন রিভলিন ইসরাইলি সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিভাজনের কথা তুলে ধরেন। তার মতে, সেকুলার, জায়নিস্ট, আরব এবং আল্ট্রা-অর্থোডক্স ইহুদিদের মধ্যে মতপার্থক্য এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একই জাতীয় কাঠামোর মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও একাধিকবার “অষ্টম দশকের অভিশাপ” প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেছেন, তার সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণ ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল বর্তমানে বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিচার বিভাগ সংস্কার নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সেনাবাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ, চরমপন্থী রাজনৈতিক অবস্থান এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে সহিংস অভিযান—সব মিলিয়ে দেশটির ভেতরে চাপ বাড়ছে।
তাদের মতে, ইসরাইল এখন শুধু বাইরের সংঘাত মোকাবিলা করছে না; একইসঙ্গে রাষ্ট্রের ভেতরের আদর্শিক ও রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গেও লড়ছে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, “অষ্টম দশকের অভিশাপ” বাস্তব কোনো ভবিষ্যদ্বাণী হোক বা না হোক, এটি এখন ইসরাইলি রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণে এক গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক উপাদানে পরিণত হয়েছে।
গাজা যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ বিভক্তির কারণে ইসরাইলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন বাইরের শত্রু নয়—বরং নিজেদের ভেতরের বিভাজন, অবিশ্বাস ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, “অষ্টম দশকের অভিশাপ” মূলত একটি প্রতীকী রাজনৈতিক ধারণা, যার বাস্তবতার চেয়ে এর মানসিক ও সামাজিক প্রভাবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য করুন