
পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরে অবস্থিত শতাধিক বছরের পুরনো গৌরীপুর জামে মসজিদকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের স্বার্থে ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদ স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই ধর্মীয় আবেগ, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি উত্তর চব্বিশ পরগনার জেলাশাসকের দপ্তরে এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক কর্মকর্তারা এবং মসজিদ কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের পর একটি বিশেষ টিম মসজিদ এলাকা পরিদর্শন করে এবং পরে বিমানবন্দর নিরাপত্তা কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, রানওয়ের খুব কাছাকাছি ধর্মীয় স্থাপনা থাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বিমান ওঠানামার সময় মানুষের চলাচল ও ভিড় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সূত্রের খবর, গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সময়ে মসজিদ স্থানান্তরের প্রসঙ্গ উঠেছিল। কিন্তু স্থানীয় মানুষের আবেগ এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে কোনো সরকারই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। বর্তমানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনের একটি অংশ মনে করছে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনার স্বার্থে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। তবে রাজ্য সরকার চাইছে পুরো বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে এবং সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সমাধান করতে।
মসজিদ স্থানান্তরের সম্ভাবনা ঘিরে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকের মতে, গৌরীপুর জামে মসজিদ শুধুমাত্র একটি নামাজের স্থান নয়, বরং এটি এলাকার ইতিহাস ও ধর্মীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতি বছর ঈদের নামাজে এখানে বিপুল মানুষের সমাগম হয়। ফলে মসজিদ সরানোর প্রসঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
মসজিদ কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা বিমানবন্দরের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার বিরোধিতা করছেন না। তবে শতবর্ষী ঐতিহ্য বহনকারী একটি ধর্মীয় স্থাপনা স্থানান্তর অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় বলে তারা মনে করেন।
তাদের দাবি, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিকল্প স্থানে আরও বড় মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু এখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।
ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯২৪ সালে কলকাতা বিমানবন্দর চালু হওয়ার আগেই গৌরীপুর জামে মসজিদের অস্তিত্ব ছিল। পরবর্তীতে বিমানবন্দর সম্প্রসারণের সময় আশপাশের বহু জমি অধিগ্রহণ করা হলেও মসজিদটি অক্ষত রাখা হয়। এমনকি যশোর রোডের পথও পরিবর্তন করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
সেই সময় থেকেই বিমানবন্দরের পাঁচিলের ভেতরে রানওয়ের পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে এই ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনাটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু বিমানবন্দরের নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় অনুভূতি, সংখ্যালঘু আবেগ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার। ফলে মসজিদ স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কোনো পক্ষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় আবেগের এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যে শেষ পর্যন্ত কোন পথে এগোয় সরকার।
মন্তব্য করুন