
চীনের পারমাণবিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এক প্রত্যন্ত মরুভূমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে বিশাল ও জটিল সামরিক অবকাঠামো। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবকাঠামোর মূল লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য প্রথম আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক হামলা থেকে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার রক্ষা করা এবং পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা নিশ্চিত করা।
রয়টার্সের বিশ্লেষিত স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, পূর্ব সিনচিয়াংয়ের হামি অঞ্চলের পারমাণবিক সাইলো এলাকাকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত একটি সামরিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে। এই এলাকায় তিনটি বিশাল অষ্টভুজাকৃতির স্থাপনা বিশেষভাবে নজর কাড়ছে, যা চীনের কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী উত্তরের অষ্টভুজে রয়েছে সেনা আবাসন, সামরিক যান এবং ছদ্মবেশী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, আশপাশে বাঙ্কার, বিমানঘাঁটি ও রেল সংযোগ—যা সরাসরি মূল পারমাণবিক সাইলোর সঙ্গে যুক্ত, দক্ষিণের অষ্টভুজে জ্বালানি সংরক্ষণাগার ও শক্তিশালী বাঙ্কার স্থাপন করা হয়েছে। তৃতীয় অষ্টভুজটি লপ নুর পারমাণবিক পরীক্ষাকেন্দ্রের কাছে, যেখানে সম্ভাব্য সামরিক মহড়া ও নকল যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হচ্ছে।
মরুভূমির পাথুরে পাহাড় ও শুকনো খালের আড়ালে ৮০টিরও বেশি মোবাইল উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম শনাক্ত করা হয়েছে। এগুলো মূলত আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য তৈরি করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুরো এলাকায় মাটির নিচ দিয়ে বিস্তৃত ফাইবার অপটিক কেবল স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি স্যাটেলাইট ডিশ ও বিশাল টাওয়ার ব্যবহার করে শক্তিশালী কমান্ড ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। এই কাঠামোকে একটি সমন্বিত ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের আনুষ্ঠানিক নীতি অনুযায়ী, দেশটি প্রথমে পারমাণবিক হামলা চালায় না। তবে আক্রান্ত হলে পূর্ণ শক্তিতে পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবকাঠামো সেই “দ্বিতীয় আঘাত সক্ষমতা” নিশ্চিত করার কৌশল। সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই আধুনিকায়ন মূলত Taiwan সংকটকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সতর্কবার্তাও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, তাইওয়ান ইস্যুতে বাইরের হস্তক্ষেপ ঠেকাতে চীন এই পারমাণবিক সক্ষমতাকে কৌশলগত প্রতিরোধ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, চীন বর্তমানে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের পারমাণবিক ওয়ারহেড সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
চীন তাদের আধুনিক ‘হুয়োইয়ান-১’ ব্যবহার করে মাত্র ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করতে সক্ষম। এর ফলে পাল্টা আঘাত দেওয়ার সময়গত সুবিধা পাচ্ছে দেশটি।
হ্যান্স ক্রিস্টেনসেন বলেন, এত প্রতিকূল মরুভূমিতে এত বিশাল ও জটিল সামরিক অবকাঠামো তিনি আগে কখনো দেখেননি। তাঁর মতে, এটি চীনের একটি “অভূতপূর্ব ও বিস্ময়কর কৌশলগত প্রচেষ্টা”।
মন্তব্য করুন