
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির মালভিয়া নগর এলাকায় একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৭ জনই বিদেশি নাগরিক। তাদের মধ্যে বাংলাদেশিরাও রয়েছেন বলে জানা গেছে। বুধবার (৩ জুন) সকালে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
দিল্লি ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেল থেকে অন্তত ৩৭ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত বিদেশিদের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও নাইজেরিয়া, লাইবেরিয়া ও মোজাম্বিকের নাগরিক রয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
যেভাবে আগুনের সূত্রপাত
দমকল কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৮টা ৫০ মিনিটে মালভিয়া নগরের পাঁচতলা ভবনবিশিষ্ট ‘ফ্লারিশ স্টে’ হোটেলের বেজমেন্টে থাকা রেস্তোরাঁ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই আগুন পাশের ‘মিকাসা ইন’ হোটেলেও ছড়িয়ে পড়ে।
ঘনবসতিপূর্ণ ও সংকীর্ণ গলির এ এলাকায় বহু শিক্ষার্থী ও তরুণ চাকরিজীবীর বসবাস। আগুন লাগার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ওয়াটার ইঞ্জিন, দুটি ওয়াটার বাউজার এবং কুইক রেসপন্স টিমসহ একাধিক ইউনিট। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মোট ১৭টি দমকল ইঞ্জিন কাজ করে।
প্রাণ বাঁচাতে জানালা দিয়ে লাফ
অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেলজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রাণ বাঁচাতে কয়েকজন অতিথিকে জ্বলন্ত ভবনের জানালা ও কাচ ভেঙে নিচে লাফ দিতে দেখা যায়। স্থানীয়রা তাদের রক্ষার চেষ্টা করতে নিচে তোশক ও ম্যাট্রেস বিছিয়ে দেন।
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি চার থেকে ছয়জনকে ভবন থেকে লাফ দিতে দেখেছেন। তাদের মধ্যে একজন নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন এবং তার পা ভেঙে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘুমের মধ্যেই ট্র্যাজেডি
সংকীর্ণ গলির মধ্যে অবস্থিত ২৫ কক্ষবিশিষ্ট হোটেলটির মালিক লভকেশ বাজাজ। ঘটনার সময় সেখানে ৪০ জনের বেশি অতিথি অবস্থান করছিলেন। দমকল কর্মকর্তারা জানান, সকালে আগুন লাগার সময় অধিকাংশ অতিথিই ঘুমিয়ে ছিলেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হোটেলে অবস্থানরত বিদেশিদের অনেকেই চিকিৎসার উদ্দেশ্যে দিল্লিতে এসেছিলেন। চিকিৎসা নিতে এসে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাতে হয়েছে তাদের।
অগ্নিনিরাপত্তায় চরম গাফিলতির অভিযোগ
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হোটেলটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুতর ত্রুটির বিষয়টি সামনে এসেছে। ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ফ্লারিশ স্টে’ হোটেলটি দিল্লি সরকারের কাছ থেকে ‘বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট’ ক্যাটাগরির লাইসেন্স পেয়েছিল, যেখানে মাত্র ছয়টি কক্ষ পরিচালনার অনুমতি ছিল। কিন্তু নিয়ম ভেঙে বেজমেন্টসহ মোট ২৫টি কক্ষ পরিচালনা করা হচ্ছিল।
দিল্লি ফায়ার সার্ভিসের চিফ ফায়ার অফিসার এ কে মালিক জানান, হোটেলটির কোনো বৈধ ফায়ার এনওসি (অনাপত্তিপত্র) ছিল না। ভবনে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য মাত্র একটি পথ ছিল, ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকে আটকা পড়েন।
তিনি আরও জানান, বেজমেন্টের প্রবেশপথ শাটার দিয়ে বন্ধ ছিল। দমকলকর্মীরা শাটার কেটে ভেতরে প্রবেশের পর সেখান থেকে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করেন।
পাশের ‘মিকাসা ইন’ হোটেলের শেফ কেসর সিং জানান, তিনি ইলেকট্রিক স্টোভে চা তৈরি করছিলেন। হঠাৎ একটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনে বাইরে এসে দেখেন, পুরো হোটেলে আগুন জ্বলছে। পরে তিনি কোনোমতে সেখান থেকে বের হয়ে প্রাণে রক্ষা পান।
শোক প্রকাশ করলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী
এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে নিহতদের পরিবারকে দুই লাখ রুপি এবং আহতদের ৫০ হাজার রুপি করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন