
ইসলামের ইতিহাস মূলত ত্যাগ, ধৈর্য, ঈমান ও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মনিবেদনের এক উজ্জ্বল ইতিহাস। যুগে যুগে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা নিজেদের জীবন, সম্পদ, পরিবার, স্বপ্ন ও প্রিয় বস্তু আল্লাহর পথে উৎসর্গ করে স্থাপন করেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত। কোরবানি সেই আত্মত্যাগেরই প্রতীক, যা মুসলমানদের তাকওয়া, আনুগত্য ও আল্লাহভীতির শিক্ষা দেয়।
হজরত আদম (আ.)-এর পুত্র হাবিলের কোরবানি থেকে শুরু করে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগ, হজরত ঈসমাইল (আ.)-এর আনুগত্য এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের জীবন—সবখানেই ফুটে উঠেছে প্রকৃত মুমিনের কোরবানির মহিমা। ইসলামের শিক্ষা হলো, ঈমান শুধু মুখের দাবি নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিজের ইচ্ছাকে বিলীন করে দেওয়ার নামই প্রকৃত আত্মসমর্পণ।
হজরত আনাস বিন মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় আগমন করেন, তখন তিনি দেখেন মদিনাবাসীরা বছরে দুটি নির্দিষ্ট দিনে খেলাধুলা ও আনন্দ-উৎসব করত। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের জিজ্ঞেস করলে তারা জানায়, জাহেলি যুগ থেকেই তারা এ দুই দিন উদযাপন করে আসছে। তখন মহানবী (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য এ দুই দিনের পরিবর্তে আরও উত্তম দুটি দিন নির্ধারণ করেছেন—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১১৩৪)
ঈদুল আজহা শুধু আনন্দের উৎসব নয়; বরং এটি আল্লাহর পথে ত্যাগ ও আত্মনিবেদনের এক মহিমান্বিত শিক্ষা।
ইসলামের দৃষ্টিতে কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি মানুষের অন্তরের তাকওয়া, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও আত্মসমর্পণের বহিঃপ্রকাশ। কোরবানির মাধ্যমে মানুষ নিজের পশুপ্রবৃত্তি দমন, লোভ-লালসা থেকে মুক্তি এবং সৃষ্টির সেবায় আত্মনিয়োগের শিক্ষা লাভ করে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন— আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। (সুরা হজ, আয়াত : ৩৭)
কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করেছিলেন। তাদের মধ্য থেকে হাবিলের কোরবানি কবুল হয়, কারণ তার অন্তরে ছিল তাকওয়া ও আন্তরিকতা। এটিই ইসলামের ইতিহাসে প্রথম কোরবানির ঘটনা হিসেবে পরিচিত।
ইসলামে কোরবানিকে বিশেষভাবে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর স্মৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়। আল্লাহর নির্দেশে নিজের প্রিয় পুত্র হজরত ঈসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে প্রস্তুত হওয়ার ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে— যে নিজেকে নির্বোধ করেছে, সে ছাড়া ইবরাহিমের ধর্মাদর্শ থেকে আর কে বিমুখ হবে! (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৩০-১৩১)
ইসলামে ঈদ উদযাপনের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা, উত্তম পোশাক পরিধান, তাকবির পাঠ, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ, বৈধ আনন্দ এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমান সমাজে ঈদের পোশাক, খাবার ও বিলাসী আয়োজন নিয়ে যে প্রতিযোগিতা দেখা যায়, তা ইসলামের মৌলিক আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার হজরত ওমর (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে একটি রেশমি জুব্বা এনে ঈদের জন্য তা ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তখন মহানবী (সা.) বলেন— এটি তো সেই ব্যক্তির পোশাক, যার পরকালে কোনো কল্যাণের অংশ নেই। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯৪৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও কোরবানির গোশত খেতেন এবং পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে তা বণ্টন করতেন। ইসলামে কোরবানির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সমাজে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করা।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানির গোশতের এক-তৃতীয়াংশ পরিবারকে, এক-তৃতীয়াংশ প্রতিবেশীদের এবং এক-তৃতীয়াংশ দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করতেন। (আল-মুগনি : ৯/৪৪৯)
এভাবেই কোরবানির মাধ্যমে মুসলমানরা নিজেদের আনন্দ অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয়।
ইসলামে আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় অবস্থানকালে প্রতিবছর কোরবানি করতেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৫০৭)
মহানবী (সা.) নিজের, পরিবার এবং সমগ্র উম্মতের পক্ষ থেকেও কোরবানি করতেন। এতে মুসলিম উম্মাহর প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায়।
কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা হলো—মানুষ যেন নিজের প্রবৃত্তি, অহংকার, লোভ ও দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। প্রকৃত সফলতা অর্জিত হয় আল্লাহর জন্য ত্যাগের বিনিময়ে।
তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত ইসলামের ইতিহাস থেকে আত্মত্যাগ, তাকওয়া ও মানবতার শিক্ষা গ্রহণ করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা অনুধাবন ও বাস্তব জীবনে তা অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমিন।
মন্তব্য করুন