
নেক আমল একজন মুমিনের পরকালীন জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন এবং আখিরাতে সফলতা লাভের জন্য কবুলযোগ্য আমলের বিকল্প নেই। তবে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এমন কিছু গুনাহ ও ভুল কাজ সংঘটিত হয়, যা মানুষের নেক আমলকে ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ইসলামী শরিয়তে এসব কাজ থেকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিচে আমল বিনষ্টকারী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হলো।
১. রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদত ইসলামে প্রতিটি আমলের মূল ভিত্তি হলো নিয়তের বিশুদ্ধতা। আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের প্রশংসা অর্জনের উদ্দেশ্যে ইবাদত করলে তা রিয়া বা লোক দেখানো আমল হিসেবে গণ্য হয়।
হাদিসে এসেছে, মাহমুদ ইবনে লাবিদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) রিয়াকে ‘শিরকে আসগর’ বা ছোট শিরক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন রিয়াকারীদের বলা হবে, তোমরা যাদের দেখানোর জন্য আমল করেছিলে, তাদের কাছেই প্রতিদান খুঁজে নাও। (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৬৩৬)
২. গোপনে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া আল্লাহ তাআলা যেসব কাজ হারাম করেছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। প্রকাশ্যে নেক আমল করলেও যদি কেউ গোপনে হারাম কাজে লিপ্ত হয়, তাহলে তার আমল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন কিছু মানুষ পাহাড়সম নেক আমল নিয়ে উপস্থিত হবে, কিন্তু গোপনে হারাম কাজে জড়িয়ে থাকার কারণে সেই আমল ধূলিকণার মতো ছড়িয়ে যাবে। (ইবনে মাজাহ: ৪২৪৫)
৩. জাদুকর ও গণকদের বিশ্বাস করা ভবিষ্যৎ জানার উদ্দেশ্যে জাদুকর, গণক বা ভাগ্যবক্তাদের কাছে যাওয়া ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ ধরনের বিশ্বাস ঈমানের জন্য ক্ষতিকর এবং আমলের গ্রহণযোগ্যতাকেও প্রভাবিত করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি গণকের কাছে গিয়ে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করবে, তার ৪০ দিনের নামাজ কবুল হবে না। (সহিহ মুসলিম: ৫৭১৪)
৪. প্রয়োজন ছাড়া কুকুর পালন শিকার, গবাদিপশু রক্ষা বা কৃষিক্ষেত পাহারার মতো শরিয়তসম্মত প্রয়োজন ছাড়া কুকুর পালন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রয়োজন ছাড়া কুকুর পালন করবে, তার প্রতিদিন দুই কিরাত পরিমাণ নেকি কমে যাবে। (তিরমিজি: ১৪৮৭)
অন্য বর্ণনায় এক কিরাতের পরিমাণ উহুদ পাহাড়ের সমান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। (মুসনাদে আহমাদ: ৪৬৫০)
৫. আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ করা আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ করা একটি মারাত্মক গুনাহ। এটি মানুষের আমলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়।
জুনদাব (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক ব্যক্তি অন্য একজন সম্পর্কে বলেছিল, ‘আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না।’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম এবং তোমার কথাকে বাতিল করে দিলাম।’ (সহিহ মুসলিম: ৬৫৭৫)
৬. বিদআতের প্রচার ও প্রসার ইসলামের মূল শিক্ষা ও শরিয়তের ভিত্তি ছাড়া নতুন ধর্মীয় প্রথা বা ইবাদত চালু করাকে বিদআত বলা হয়। ইসলামে বিদআত থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনে এমন কিছু সংযোজন করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।” (সহিহ বুখারি: ২৬৯৭)
আমল কবুল হওয়ার দুটি শর্ত উলামায়ে কেরামের মতে, কোনো আমল কবুল হওয়ার জন্য দুটি মৌলিক শর্ত রয়েছে— ১. ইখলাস বা নিয়তের বিশুদ্ধতা, ২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণ। এই দুই শর্ত পূরণ না হলে আমল কবুল হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
৭. মুরতাদ বা ঈমান ত্যাগ করা ইসলামে ঈমান গ্রহণের পর তা ত্যাগ করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, যে ব্যক্তি ঈমান থেকে ফিরে গিয়ে কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, তার দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের দ্বীন থেকে ফিরে যাবে এবং কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। — (সুরা আল-বাকারা: ২১৭)
নেক আমল মানুষের আখিরাতের সফলতার মূল পুঁজি। তাই শুধু বেশি আমল করাই যথেষ্ট নয়; বরং সেই আমলকে সংরক্ষণ করাও জরুরি। রিয়া, গোপন গুনাহ, মিথ্যা শপথ, বিদআত, জাদুকর বা গণকের প্রতি বিশ্বাস এবং ঈমান ত্যাগের মতো কাজ থেকে বেঁচে থাকলে আমলের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আমল বিনষ্টকারী কাজ থেকে হেফাজত করুন এবং কবুলযোগ্য আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মন্তব্য করুন