মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া : এক আপোষহীন রাজনৈতিক জীবনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস

কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:০২ এএম
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া : এক আপোষহীন রাজনৈতিক জীবনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক।

১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও স্বামী জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকটই খালেদা জিয়াকে রাজনীতির অঙ্গনে নিয়ে আসে। সাধারণ একজন গৃহবধূ হিসেবে তার জীবনে রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না।

বেগম খালেদা জিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায়। তার পিতা ইস্কান্দার মজুমদার এবং মাতা তৈয়বা মজুমদার। দেশ বিভাগের পর তার পরিবার তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে আসে। তার আদি নিবাস ফেনীতে। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানকে বিবাহ করেন।

জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হলে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিসরে সক্রিয় হন। তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার ও নেদারল্যান্ডসের রানি জুলিয়ানাসহ বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

১৯৮১ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণের পর তিনি ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি সাধারণ সদস্য হিসাবে বিএনপিতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে দলের ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পর, খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলনের সূচনা করেন। তিনি এরশাদের স্বৈরাচারের অবসান ঘটাতে ১৯৮৩ সালে গঠিত সাত দলীয় জোট গঠনের স্থপতি ছিলেন। তিনি ১৯৮৬ সালের কারচুপির নির্বাচনের বিরোধিতা করেন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন, যদিও আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মতো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা এরশাদের অবৈধ সরকারকে বৈধতা দেয়ার জন্য জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন শাসনের অধীনে নির্বাচনে যোগ দিয়েছিল। তার দৃঢ় সংকল্পের কারণে, তাকে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাতবার আটক করা হয়েছিল। তিনি বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে শক্তিশালী একটি সংগঠনে পরিণত করেন যার ফলে তারা সারা দেশে ৩২১টি ছাত্র সংসদগুলোর মধ্যে ২৭০টি জয়লাভ করে। এই ছাত্ররা এরশাদের শাসনের পতনের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৮০ দশকে এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কঠোর বিরোধিতা এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে ভূমিকা রাখার কারণে তিনি আপোষহীন নেত্রী হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বেগম জিয়া। তার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদে কিছু বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। কর্মসংস্থানের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এই সময় এবং শুধুমাত্র তৈরি পোশাকশিল্প খাতেই পাঁচ বছরে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি ছিল ২৯ শতাংশ। প্রায় দুই লাখ নারী এই সময় তৈরি পোশাকশিল্প খাতে যোগ দেন।

তিনি জাতিসংঘে গঙ্গার পানি-বণ্টনের সমস্যা উত্থাপন করেন যাতে বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য অংশ পায়। ১৯৯২ সালে তাকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো হলে সেখানে তিনি রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের সমস্যা উত্থাপন করেন এবং পরে মিয়ানমার সরকার ১৯৯০ দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের সাথে একটি চুক্তি করে।

১৯৯৬ সালে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর খালেদা জিয়া টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং পুনরায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতির কারণে, তিনি এক মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেন। যদিও বিএনপি ১৯৯৬ সালের জুনের নতুন নির্বাচনে হেরে যায়, দলটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদে সবচেয়ে বড় বিরোধী দল হিসেবে ১১৬টি আসন পায় সেই নির্বাচনে।

১৯৯৯ সালে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ঐক্যজোটের সঙ্গে চারদলীয় জোট গঠন করে এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করে। বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হন। ফোর্বস ম্যাগাজিন নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে তার ভূমিকার জন্য ২০০৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তাকে ২৯ নম্বরে স্থান দেয়।

২০০৬ সালে, তিনি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে, তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্বাসনে পাঠানোর একাধিক প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে দুর্নীতির তুচ্ছ এবং ভিত্তিহীন অভিযোগে স্বৈরাচারী সরকার গ্রেপ্তার করে।

ক্ষমতায় থাকাকালীন, খালেদা জিয়ার সরকার বাধ্যতামূলক বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, ছাত্রীদের জন্য একটি শিক্ষা উপবৃত্তি এবং শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য খাদ্য প্রবর্তন করে শিক্ষা ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি করেছিল। তার সরকার সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করে এবং শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করে।

বেগম জিয়া কোনো আসনেই পরাজিত না হওয়ার অনন্য রেকর্ডের অধিকারী। তিনি ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনগুলোতে পাঁচটি পৃথক সংসদীয় আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে, তিনি যে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন সেখানে তিনি জয়লাভ করেছিলেন।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মণিরামপুর পৌরসভার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণা

মণিরামপুর পৌরসভার উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণা

এস আলমের প্রভাবমুক্ত ইসলামী ব্যাংকের দাবিতে রাজশাহীতে মানববন্ধন

কেশবপুরে ভূমি সহকারীর বাড়িতে অজ্ঞান পার্টির হানা

একনেক সভায় ১০ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন

জামায়াতের ৮.৩৯ লাখ কোটি টাকার ছায়া বাজেট প্রস্তাব

পুরুষ বন্ধুদের কাছ থেকে উপহার পেতে আনুশকার অস্বস্তি!

মণিরামপুরে নাতনীকে উত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা, আটক-১

তথ্য উপদেষ্টা / স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয়, থাকবে না দলীয় প্রতীক

যশোরসহ ২০ অঞ্চলে ঝড়ের সম্ভাবনা

উত্তাল বঙ্গোপসাগর, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

ঘুসের টাকা গুনে নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল, বাগমারা থানার পুলিশ পরিদর্শক প্রত্যাহার

মহম্মদপুরে মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশকে নতুন সিল

রামিসা হত্যা: সোহেল ও স্বপ্না ‘কনডেম সেলে’

কেশবপুরে শরীকানা পুকুরের মাছ লুটের অভিযোগ

রাজশাহীতে বিভাগীয় পর্যায়ে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

পাবনায় হত্যা মামলার আসামিদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, নিহত ৩

রাজশাহীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ মিছিল

বিশ্ববাজারে আবারও বাড়লো স্বর্ণের দাম

ফের বাড়ল তেলের দাম

X