
ঢাকার ব্যস্ততম এলাকায় গুলিতে নিহত দেশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী নাইম আহমেদ টিটনের দাফন যশোরে সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার রাতে যশোর কারবালা কবরস্থানে পিতা ও বড়ভাইয়ের কবরের পাশে শেষ শয্যা নেন টিটন। এর আগে রাত ৮টার দিকে তার মরদেহ খড়কি এলাকার বাড়িতে আনা হয়। এসময় স্বজন ও স্থানীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে।
এর আগে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাতে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার পাশে প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত হন টিটন। ঘটনাটি ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে, যেখানে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা খুব কাছ থেকে তাকে এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করে।
টিটনের পৈত্রিক বাড়ি যশোর শহরের খড়কি এলাকায়, স্থানীয়ভাবে ‘আপন মোড়’ নামে পরিচিত স্থানে। সাত ভাই ও পাঁচ বোনের বড় পরিবারে জন্ম নেওয়া টিটন অল্প বয়সেই অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়েন। তার ভাই টুটুলও একই পথে হাঁটেন। স্থানীয়দের দাবি, তাদের অপরাধজগতে প্রবেশের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল ইসলাম ইমনের, যিনি টিটনের ভগ্নিপতি। মৃত্যুর পর বুধবার রাতে তার মরদেহ ঢাকা থেকে যশোরে নিয়ে আসা হয়। মরদেহ প্রথমে খড়কির বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর কারবালা মসজিদে এশার নামাজের পর জানাজা এবং পরে কারবালা কবরস্থানে পিতা ও বড়ভাইয়ের কবরের পাশে দাফন সম্পন্ন করা হয়।
এদিকে, নিহতের বড় ভাই সাঈদ আক্তার সুনির্দিষ্ট করে কাউকে আসামি না করলেও এজাহারে সন্দেহভাজন হিসেবে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল, শাহজাহান, রনি ওরফে ড্যাগারি রনির নাম উল্লেখ করেছেন। তাদের সঙ্গে বছিলায় কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে টিটনের বিরোধ চলছিল বলে বাদী জানিয়েছেন। প্রতিপক্ষ দুুর্বৃত্তদের অতর্কিত গুলিতে নিহত এই টিটন ২০০১ সালের পর থেকে বেশির ভাগ সময় বিভিন্ন মামলায় জেলখানায় আটক ছিলেন। টিটন ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার পর টিটন আবার আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয় হন। নিউ মার্কেট ও হাজারীবাগ এলাকায় চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হন। টিটন যশোর শহরের কারবালা এলাকার কেএম ফকর উদ্দিনের ছেলে।
তথ্য মিলেছে, ২৮ এপ্রিল রাতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশের দেয়া প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী যশোরের খড়কীর ক্যাপ্টেন সানজিদুল ইসলাম ইমন তার ভগ্নিপতি। ঢাকার ঘটনাস্থল এলাকার প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে তথ্য মিলেছে, ঘটনার সময় টিটন নীলক্ষেত সংলগ্ন বটতলা এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় একটি মোটরসাইকেলে আসা দুই জন দুবৃর্ৃৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, টিটনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি গুলি লেগেছে। এর মধ্যে মাথায় তিনটি, হাতের বাহুতে একটি এবং বগলের নিচে একটি গুলি লাগে। ঘটনার পর স্থানীয় জনতা ঘাতকদের ধাওয়া করার চেষ্টা করলেও তারা ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে আতঙ্ক তৈরি করে এলাকা ত্যাগ করে। হামলাকারীদের মাথায় ক্যাপ এবং মুখে মাস্ক থাকায় তাদের শনাক্ত করা যায়নি।
নিহত খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে বন্দী ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরবর্তী সময়ে জেলখানা থেকে মুক্তি পাওয়া বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীর মধ্যে তিনিও একজন ছিলেন। তবে কারামুক্ত হওয়ার পর তিনি নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেননি। আদালতে হাজিরা না দেয়ায় তার বিরুদ্ধে আটকাদেশ জারি ছিল। তার বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন সহিংস অপরাধের অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। জনবহুল এই এলাকায় এমন দুঃসাহসিক হত্যাকান্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং ঘাতকদের আটকে অভিযান চালাচ্ছে।
২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার রাজধানীর ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নামের যে তালিকা প্রকাশ করে, ওই তালিকায় টিটনের নাম ২ নম্বরে ছিল। পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ২০০৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকার একটি বাসা থেকে পিস্তলসহ তাকে আটক করে। এছাড়া অ্যাডভোকেট বাবর এলাহী হত্যা মামলায় টিটনকে মৃত্যুদন্ড দেয় আদালত।
পুলিশ জানিয়েছে, টিটন ১৯৯০ এর দশকের শুরুর দিকে সন্ত্রাসী জগতে প্রবেশ করেন। তিনি প্রথমে যশোরের স্থানীয় অপরাধী চক্রের সদস্য ছিলেন। এরপর ধীরে ধীরে অপরাধ জগতে নিজের পরিচিতি বাড়াতে একাধিক হত্যাকান্ডে নেতৃত্ব দেন। টিটন অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তার নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা ছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা। টিটনের ভগ্নীপতি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন। তারা দু’জনই মোহাম্মদপুরের 'সন্ত্রাসী চক্র' হারিছ-জোসেফ গ্রুপে যুক্ত ছিল। ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায় তাদের তৎপরতা ছিল। ৫ আগস্টের পর জেল থেকে মুক্তি পেয়ে ইমন ব্যাংককে পাড়ি জমান।
পুলিশ আরো বলছে, টিটনের মুল বাড়ি যশোরে হলেও তিনি ঢাকা হাজারীবাগ জিগাতলা এলাকায় ২৩০/১ (সুলতানগঞ্জ) নং বাসায় পরিবারের সাথে থাকতেন। এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের সামনে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় পুলিশের এক সময়ের তালিকাভুক্ত 'শীর্ষ সন্ত্রাসী' তারিক সাঈফ মামুনকে। তদন্তে উঠে আসে এই হত্যার নেপথ্যে ছিলেন নাঈম আহমেদ টিটনের ভগ্নিপতি শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন। পুলিশ জানিয়েছে, অপরাধ জগতের পুরোনো শত্রুতা ছাড়াও এই খুনের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, তাও খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। এদিকে টিটন হত্যাকান্ডের খবর যশোরে ছড়িয়ে পড়লে নানামুখি বক্তব্য আসছে বিভিন্ন মহল থেকে।
অপরাধ জগতর বিভিন্ন মহল থেকেও তথ্য আসছে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সন্ত্রাসী বলয় গঠন ও মাঠ দখলের প্রতিযোগিতা চলছে সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটে। আর নিজেদের শক্তি জানান দিতে প্রতিপক্ষরা এই হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটাতে পারে। তবে এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদ আলম জানিয়েছেন, 'নিহত ব্যক্তি শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ তথ্য জানা যায়। মাস্ক পরিহিত দুজন মোটরসাইকেল আরোহী এসে তাকে গুলি করে হত্যা করেছে।
শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ডের এক দিন পর থানায় মামলা হয়েছে। এতে আসামির তালিকা ফাঁকা রাখা হলেও সন্দেহভাজন হিসেবে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ কয়েকজনের নাম এসেছে। নাঈম আহমেদ টিটনের ভাই সাঈদ আক্তার রিপন বুধবার ঢাকার নিউমার্কেট থানায় মামলাটি করেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নিউমার্কেট অঞ্চলের সহকারী কমিশনার মো. নাসিম সাংবাদিকদের বলেন, অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার কাজ চলমান। বাদী সাঈদ আক্তার সুনির্দিষ্ট করে কাউকে আসামি না করলেও এজাহারে সন্দেহভাজন হিসেবে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল (পিচ্চি হেলাল), বাদল ওরফে কিলার বাদল, শাহজাহান, রনি ওরফে ড্যাগারি রনির নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁদের সঙ্গে বছিলায় কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে টিটনের বিরোধ চলছিল বলে বাদী জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার রাত পৌনে আটটার দিকে রাজধানীর নিউমার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে টিটনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে অন্তঃকোন্দল টিটন হত্যাকাণ্ডের কারণ বলে সন্দেহ করছিলেন পুলিশ কর্মকর্তারা। মামলার এজাহারের বর্ণনাও সেদিক ইঙ্গিত করে। এজাহারে সাঈদ আক্তার বলেন, ২৬ এপ্রিল তাঁকে ফোন দিয়ে টিটন বলেছিলেন, ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল ওরফে কাইলা বাদল, শাহজাহান, রনি ওরফে ড্যাগারি রনিদের সঙ্গে বছিলা গরুর হাটের ইজারা নিয়ে ঝামেলা চলছে। পরদিন টিটন বলেন, ‘আমাকে ডাকছে উভয়ের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে কাজ করার জন্য।’
ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশু বেচা-কেনার জন্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী পশুর হাট বসায়। এগুলো ইজারার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবার বছিলাসহ ১২টি হাট ইজারা দিতে দর প্রস্তাব আহ্বান করে। মোহাম্মদপুরের বছিলায় ১ কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার টাকা ইজারার ভিত্তি দর ধরে দরপত্র আহ্বান করলেও কোনো দর প্রস্তাব জমা পড়েনি। ফলে সেখানে আবার দরপত্র আহ্বান করা হবে।
পুলিশ জানায়, টিটন ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে অপরাধজগতে প্রবেশ করেন। তিনি প্রথমে স্থানীয় অপরাধী চক্রের সদস্য ছিলেন। ধীরে ধীরে অপরাধজগতে নিজের পরিচিতি বাড়াতে থাকেন। তিনি একাধিক হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্বও দেন। অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে অস্ত্রের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা ছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা।
২০০৪ সালে টিটনকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট জামিনে মুক্তির পর তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে।
মন্তব্য করুন