
দীর্ঘদিন ধরেই তিস্তা প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক ভারত। নয়াদিল্লির বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চীন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে। ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্যও সেটিই।
ভারতের মতে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্পে ঘনিষ্ঠতা নয়াদিল্লির কৌশলগত ও নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষ করে তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে চীনের সক্রিয় আগ্রহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে দেশটি।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরের সময় ভারতও তিস্তা সংরক্ষণ ও প্রকৌশল সহায়তায় এগিয়ে আসার প্রস্তাব দিয়েছিল। সে সময় হাসিনা সরকার তিস্তা মহাসেচ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব ভারতকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে পরবর্তীতে সরকারের পরিবর্তনের পর সেই পরিকল্পনা কার্যত স্থগিত হয়ে যায়।
সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র বৈঠকে তিস্তা প্রকল্প অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হিসেবে উঠে আসে। বাংলাদেশের নেওয়া নতুন পরিকল্পনার নাম ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’।
এই বৃহৎ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে প্রায় ১০২ কিলোমিটার নদী খননের মাধ্যমে তিস্তার গভীরতা বৃদ্ধি এবং নদীর দুই তীরে প্রায় ২০৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা। এর মাধ্যমে নদীভাঙন রোধ, পানি সংরক্ষণ এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নকে লক্ষ্য করা হচ্ছে।
তবে ভারত আশঙ্কা করছে, চীন যদি এই প্রকল্পে সরাসরি যুক্ত হয়, তাহলে ভূরাজনৈতিকভাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল চীনের কৌশলগত নজরদারির আওতায় চলে আসতে পারে। বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডর—যা ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একমাত্র স্থল সংযোগ—তা আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।
নয়াদিল্লির একাংশের মতে, বাংলাদেশের উচিত চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নেওয়া। কারণ, তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো বা ব্রহ্মপুত্র নদে চীনের নির্মিত বাঁধ ইতোমধ্যে ভারত ও বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের দাবি, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ওপর চীনের একতরফা নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতে বড় ধরনের জল সংকট ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হঠাৎ পানি ছেড়ে দিলে ভারতের আসাম ও অরুণাচল প্রদেশে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও মেঘনা অববাহিকার মাত্র সাত শতাংশ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থিত। ফলে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ উজানের পানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের একাংশ মনে করছে, বাংলাদেশের উচিত প্রথমে ইয়ারলুং সাংপো নদীতে চীনের বাঁধ নির্মাণ ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নেওয়া। এরপর তিস্তা প্রকল্পে চীনের সহযোগিতা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা আঞ্চলিক ভারসাম্যের জন্য বেশি কার্যকর হবে।
মন্তব্য করুন