
আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর আগাম প্রার্থী ঘোষণাকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যে মনোনয়ন ঘোষণা শুরু করেছে, যা নির্বাচন কমিশনের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে আয়োজিত রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (আরএফইডি) নবনির্বাচিত কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন সিইসি।
সিইসি নাসির উদ্দিন বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার না হওয়ায় এটি প্রকৃত অর্থে নির্দলীয় হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তার মতে, প্রার্থীরা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করলে দলীয় মালিকানা বা প্রভাব কমবে এবং সংঘাতের ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে বলেন, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সমঝোতায় পৌঁছানো উচিত, যাতে স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সংঘাত বা সহিংসতা না ঘটে। নির্বাচন কমিশন এ ক্ষেত্রে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
সিইসি জোর দিয়ে বলেন, শুধু জাতীয় নির্বাচন নয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ সব ধরনের নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হওয়া প্রয়োজন। দেশে ভালো নির্বাচনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সিইসি বলেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচন সামনে আসছে। প্রয়োজনীয় আইন-বিধি সংস্কার করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুটি রাজনৈতিক দলের নেতা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা ছাড়া কোনো নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্ভব হয় না। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের পূর্ণ সহায়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন, আমরাও দলের সহযোগিতা চাই। প্রয়োজনে আপনারা নিজেরা নিজেরা বসেন। একটা ফয়সালায় আসেন, আমরা রক্তপাত দেখতে চাই না। রক্তপাতহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচন চাই।
বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে সহিংসতার ইতিহাস তুলে ধরে নাসির উদ্দিন বলেন, অতীতে দেখা গেছে অনেক মার্ডার হয়। একই পরিবারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়, খুব স্বল্প ব্যবধানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের বর্শা নিয়ে মারামারির প্রসঙ্গ টেনে সিইসি বলেন, টেঁটা মেরে দুই পাড়ায় মারামারি হয়। এখন দুই পাড়ায় যদি প্রার্থী দাঁড়ায়, তাহলে কী হবে? কারবালা হয়ে যাবে। এ ধরনের সিচুয়েশনে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করা উচিত, স্থানীয় নির্বাচনে কোনো ধরনের ঝামেলায় যাবে না।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ভালোভাবে আয়োজনের পর স্থানীয় নির্বাচনও ‘সুন্দরভাবে’ করে নির্বাচনী সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে চান নাসির উদ্দিন।
তিনি বলেন, এক নির্বাচন ভালো হলো। এটার মানে এ নয় যে বাংলাদেশের নির্বাচন সবসময় ভালো হবে। আমরা ভালো নির্বাচনের সংস্কৃতি চালু করতে চাই। শুধু একটা নয়, সব নির্বাচন ভালো হবে। নির্বাচনের ভালো সংস্কৃতি যেন গড়তে পারি, এজন্য দলগুলো নিজেরাও বসেন। আমরা চাই, সত্যিকার অর্থে শতভাগ ভালো একটা স্থানীয় নির্বাচন।
সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা এ বছরের শেষে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন করার আভাস দিয়ে এসেছেন। এ বিষয়ে সিইসি বলেন, স্থানীয় নির্বাচন কবে হবে এখনও ফাইনাল হয়নি। নির্বাচন যেহেতু দলীয় প্রতীকে হবে না, আমাদের কিছু বিধিবিধান সংস্কার করতে হবে। এ নিয়ে কাজ শেষ করে আমরা সরকারের সঙ্গে বসব।
অনুষ্ঠানে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ভোটে অনেক দল অংশ নিলেও মোটা দাগে এ নির্বাচন পুরোপুরি সন্তোষজনক বলা যাবে না। উপরে সব ঠিকঠাক, ভেতরে সদরঘাট। ভেতরে যে কাজটা হয়েছে, আগেও বলেছি সরিষায় ভূত থাকলে ভূত তাড়াবে কে? প্রক্রিয়ার ভেতরে সে স্বচ্ছতা মেনটেইন হয়নি।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগ করে বলেন, আমি একজন প্রার্থী হিসেবে এই ইলেকশনে যেটা দেখেছি, আমি নির্বাচন কমিশনে ফোন দিয়েছিলাম। তারা মামুনুল হকের আসনে একটা নির্দেশনা দিয়েছিল যে ব্যালট পেপারে বক্সের বাইরে যদি সিল পড়ে, সেটা কাউন্ট হবে না। কিন্তু আমার আসনে নির্দেশনা দিয়েছিল যে বক্সের বাইরে যদি সিল পড়ে, সেটা কাউন্ট হবে।
তিনি বলেন, সেখানে নির্বাচনের দিন ডিজিএফআই, এনএসআই এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা থেকে শুরু করে কীভাবে ডিসি অফিসে নগ্নভাবে একটা ইলেকশনের ইঞ্জিনিয়ারিং করতে পারে, সেটা এই বাংলাদেশ দেখেছে। সে রিপোর্টগুলো আমরা বিভিন্ন জায়গায় ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটির কাছেও দিয়েছি।
নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, এ নির্বাচনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, এর বিচার বাংলার মাটিতে আমরা করব। আরেকটা গণঅভ্যুত্থান হলে প্রথমে নির্বাচন কমিশনে হাত দেব, যাতে আপাদমস্তকে পরিবর্তন করব, ফাস্ট টার্গেট হবে এটা।
এনসিপি নেতার অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, কীভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে? ভোটগ্রহণই তো সুষ্ঠু ইলেকশন নয়। সুষ্ঠু ইলেকশনের জন্য ফেয়ার রেজাল্ট ডিক্লারেশন হতে হবে। এখানে স্বচ্ছতার বিষয় রয়েছে। কোয়ালিটিটিভ কিছু ডেভেলপমেন্ট হয়েছে। কিন্তু মোটা দাগে সুষ্ঠু ইলেকশন আমরা বলতে পারছি না বলে দুঃখিত।
পরে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে সিইসি নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারীকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নাসীরউদ্দীন পাটোয়ারী যেটা অনুভব করেছেন, যেটা বিশ্বাস করেছেন, তিনি সেটা বলেছেন। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এ বক্তব্যে আহত হইনি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় সংসদের সরকার দলীয় হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার-বিজেসির চেয়ারম্যান ফাহিম আহমেদ প্রমুখ।
আরএফইডির সভাপতি কাজী এমাদ উদ্দীন জেবেল ও সাধারণ সম্পাদক ইকরাম-উদ দৌলার নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচিত কমিটি এ অনুষ্ঠানে দায়িত্ব গ্রহণ করে।
মন্তব্য করুন