মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
পিতার স্বপ্নবোনা প্রথম খাল পুনঃখননে আসছেন প্রধানমন্ত্রী

আবার জাগছে পঞ্চাশ বছর আগের গৌরবগাঁথা উলশী

মিলন রহমান
\
প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৩ এএম
১৯৭৬ সালে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন জিয়াউর রহমান -ফাইল ফটো

পঞ্চাশ বছর আগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি সারাদেশে আলোড়ন তুলেছিল। আর সেই যাত্রা শুরু হয়েছিল যশোর থেকে। শার্শার উলশী যদুনাথপুর খাল ছিল প্রথম প্রকল্প। শুধু খাল খননে সীমাবদ্ধ ছিলনা সেই কর্মসূচি। একে কেন্দ্র করে নতুন স্বপ্নে জেগেছিল এলাকার মানুষ। ব্যস্ততা আর সম্ভাবনার আলো ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দেশে। এত বছর পর আবার সেই খাল পুনঃখনন করতে আসছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রথম পর্ব সাড়াজাগানো সেই প্রকল্পে কী ছিল, তা এ প্রজন্মের অজানা থাকলেও সে সময়ের মানুষের কাছে এক গৌরবগাথা। শুরুতেই যাতে ছিল এক চমক! এই চমকেই বেতনা নদীর ১৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বিকল্প উলশী খালের কারণে হয়ে গিয়েছিল মাত্র চার কিলোমিটার। ভালবেসে স্থানীয়রা এটিকে এখনো জিয়া খাল বলে থাকেন। ফিরে দেখা: সালটা ১৯৭৬। দেশের দায়িত্বভার নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন- সে যুদ্ধ ছিল সেচের জন্য পানির যোগান দিয়ে দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলা। এই উদ্দেশ্যে সামাজিক সমাবেশ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক জনগণকে সংগঠিত করে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে তিনি খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। তাঁর ১৯-দফা কর্মসূচির এটা ছিল একটা মূল লক্ষ্য। সেচের জন্য যে তিন ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে তার মধ্যে ভূউপরিস্থ পানি ব্যবহার করে সেচকার্য চালানোর একটি মাধ্যম হচ্ছে খাল। উপরিস্থ পানি ব্যবহার করেই বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ৯৬ শতাংশ সেচ ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। বাংলাদেশেও সেচের জন্য খালের ব্যবহার যুগ যুগ ধরে প্রচলিত। অথচ প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে এবং নদীগুলোর ব্যাপক পলি বহনের কারণে এসব খাল হয় মজে অথবা শুকিয়ে গেছে। তাই দেশে বিরাজমান খাদ্য সংকটের সমাধানের লক্ষ্যে সেচের প্রয়োজনীয়তা উপলদ্ধি করে জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। এ কর্মসূচির প্রথম প্রকল্প উলশী-যদুনাথপুর সংযোগ খাল। পরবর্তীতে যা ছড়িয়ে দেওয়া হয় সারাদেশে। যশোর জেলা সদর থেকে ৩৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে শার্শা উপজেলার গ্রাম উলশী। এ গ্রামের উত্তরে বেতনা নদী এবং গিলাপোল গ্রাম, দক্ষিণে যদুনাথপুর, বড়বাড়িয়া এবং সামটা, পূর্বে ঝিকরগাছা, এবং পশ্চিমে কাঠুরিয়া। খাল খননের উদ্দেশ্য ছিল বেতনা নদীর সঙ্গে উলাশী-যদুনাথপুরের সংযোগ সাধন যাতে বনমান্দার, সোনামুখী, কাগমারী এবং রাজাপুর বিলের জলাবদ্ধতা দূর করা যায়। এখানে অশ্বখুরাকৃতি বেতনা নদী ১৬ কিলোমিটার পথ ঘুরে প্রবাহিত হত। উলশীর সঙ্গে খাল কেটে যদুনাথপুরের সংযোগ সাধন করা গেলে এ দূরত্ব প্রায় ১১.৬ কিলোমিটার কমে যাবে এ প্রকল্পের আর একটি লক্ষ্য ছিল- সারথী স্বনির্ভর কর্মসূচীর বাস্তবায়ন যা এলাকার সার্বিক উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা ও বাস্তবায়িত করবে। ১৯৭৭সালের ৩০ এপ্রিল খনন শেষে প্রেসিডেন্ট জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে খাল উদ্বোধন করেন এবং ১৯৭৯ সালের জুন মাসে সারথী প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। সারথী প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল (১) পূর্ণ নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নিশ্চয়তা (২) খাদ্য উৎপাদনে উদ্বৃত্ত হওয়া (৩) সার্বিক উৎপাদন দ্বিগুণ করা (৪) জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শতকরা ২.৮ থেকে ১ ভাগে কমিয়ে আনা (৫) নিরক্ষরতা সম্পূর্ণভাবে দূর করা (৬) প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা (৭) সাধারণ রোগ-ব্যাধি নিয়ত্রনে আনা (৮) সবার জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং (৯) উৎপাদিত সম্পদের ন্যায়ানুগ বিতরণ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, ব্যবসায়ী, ভূস্বামী, অনিয়মিত স্বেচ্ছাসেবক, মুক্তিযোদ্ধা, আনসার, সেনাবাহিনী, ছাত্র এবং পুলিশ যৌথভাবে ১.৪৪ কোটি ঘনফুট মাটি কেটে ৪.৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ও গড়পড়তা ৪ মিটার গভীর খালটি খনন করে। সারথী প্রকল্পের অধীনে সংযোগ খালে নাইলোটিকার ১০ হাজার পোনা ছাড়া হয়, প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে ১১৯ টি প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়, ২০০ নগ্নপদ চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, খালের দু পাড়ে লাগানো হয় ১৫০০০ খেজুর গাছের চারা, মহিলাদের ১৯টি সমিতি গঠন করে প্রত্যেক সমিতিকে দেওয়া হয় একটি করে রেডিও, ইউনিয়ন সহকারী ও প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের প্রত্যেককে দেওয়া হয় একটি করে সাইকেল এবং যন্ত্রচালিত সেচের জন্য ২২টি গভীর নলকূপ ও ৩৩টি পাওয়ার পাম্প বসানো হয়। যশোরের শার্শা উপজেলার উলশীতে ইউনিয়ন ভূমি অফিস প্রাঙ্গণে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক স্মৃতিস্তম্ভ। খালের ধারে গাছতলায় দাঁড়িয়ে থাকা ফলকে খোদাই করা আছে, 'আমাদের হাত কোটি হাতিয়ার, অঙ্গীকার আমাদের দেশ গড়বার।' আর লেখা আছে এক ঐতিহাসিক উদ্যোগের কথা-উলশী-যদুনাথপুর বেতনা নদী সংযোগ প্রকল্প। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ফলকের অপর পাশে উল্লেখ রয়েছে, ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল প্রকল্প শেষে তিনি আবারও এখানে আসেন। ইতিহাস বলছে, ৫০ বছর আগে ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর নিজ হাতে কোদাল তুলে নিয়ে মাটি কেটে যশোরের শার্শা উপজেলার বেতনা নদীর সংযোগ উলশী-যদুনাথপুরে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার খাল খননের উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। মূলত উলাশী গ্রাম থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত বেতনা নদীটি সর্পিলাকার ও ঘোড়ার খুড়ের মতো। এর দৈর্ঘ্য ১৬ কিলোমিটার। কিন্তু আড়াআড়ি খাল খনন করা হলে সেটির দৈর্ঘ্য হবে ৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার। প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব ছিল সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। জিয়ার ডাকে হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কোদাল-ঝুড়ি নিয়ে খাল খননে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শুধু শ্রমজীবী নন, সব শ্রেণির মানুষ এ খনন কাজে অংশ নেন। খালটি কেবল পানি চলাচলের পথ ছিল না, বরং এটি ছিল প্রাকৃতিক মৎস্য ভান্ডার। স্থানীয় জেলে ও ভূমিহীন কৃষকরা এখান থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। উদ্বোধনের ৬ মাস পর ফের উলাশীতে যান রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। খাল খনন করায় বর্ষা মৌসুমে শার্শার পাঁচটি বিলের পানি সহজেই নিষ্কাশন হয়। বিল এলাকার জমি আবাদের আওতায় আসে। একই সঙ্গে সেচ পাম্প বসিয়ে খালের পানি ব্যবহার করা হয়। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। সেদিন উলশীকে স্বেচ্ছাশ্রম ও গণজাগরণের এক অভূতপূর্ব প্রতীক হিসাবে দেখিয়ে দেশের প্রতিটি থানায় উলশী অনুসরণে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতর থেকে প্রকাশিত 'উলশী' পুস্তিকায় বলা হয়: 'উলশী-যদুনাথপুর বেতনা নদী সংযোগ প্রকল্প স্বনির্ভরতার সারাদেশের ক্ষেত্রে মধ্যে স্বেচ্ছাশ্রমের প্রথম প্রয়াস। সর্বস্তরের জনগণ যেভাবে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে এই মহান কর্মযজ্ঞে সেদিন উলশীকে স্বেচ্ছাশ্রম ও গণজাগরণের এক অভূতপূর্ব প্রতীক হিসাবে দেখিয়ে দেশের প্রতিটি থানায় উলশী অনুসরণে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতর থেকে প্রকাশিত 'উলশী' পুস্তিকায় বলা হয়: 'উলশী-যদুনাথপুর বেতনা নদী সংযোগ প্রকল্প স্বনির্ভরতার সারাদেশের ক্ষেত্রে মধ্যে স্বেচ্ছাশ্রমের প্রথম প্রয়াস। সর্বস্তরের জনগণ যেভাবে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে এই মহান কর্মযজ্ঞে মৃত্যুর পর এ ধরনের এসব প্রকল্প বাস্তবায়ণে শিথিলতা আসে এবং পরবর্তী সরকার জিয়া প্রবর্তিত প্রায় সব কটি কর্মসূচি বাতিল বা স্থগিত করে দেওয়া হয়। খাল কাটায় অংশ নেওয়া উলশী আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা মাওলা বক্স বলেন, উলশীতে খাল খননের পর ওই পাঁচটি বিলের প্রায় ২২ হাজার একর জমিতে নিয়মিত চাষাবাদ শুরু হয়। এ অঞ্চলে ইরি (বোরো) ধানের চাষের প্রচলন ঘটে। খাল খনন কর্মসূচি সফল হওয়ায় এলাকাটি ধীরে ধীরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পথ ধরে তার ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উলশীতে আসছেন সেই খাল আবার কাটতে। পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেন, উলশী খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খাল খনন কমসূচির উদ্বোধন করবেন। আশা করছি মৃতপ্রায় খালটি প্রাণ ফিরে পাবে। খাল পুনঃখনন উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, দীর্ঘ ৫০ বছরে উলশী-যদুনাথপুর খাল সংস্কার না করায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। সেই খাল পুনঃখনন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ৫০ বছর আগে জিয়াউর রহমানের নিজে হাতে কোদাল নিয়ে খনন করা সেই খালটি পুনঃখনন কাজের উদ্বোধনে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আমরা সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এস আলমের প্রভাবমুক্ত ইসলামী ব্যাংকের দাবিতে রাজশাহীতে মানববন্ধন

কেশবপুরে ভূমি সহকারীর বাড়িতে অজ্ঞান পার্টির হানা

একনেক সভায় ১০ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন

জামায়াতের ৮.৩৯ লাখ কোটি টাকার ছায়া বাজেট প্রস্তাব

পুরুষ বন্ধুদের কাছ থেকে উপহার পেতে আনুশকার অস্বস্তি!

মণিরামপুরে নাতনীকে উত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা, আটক-১

তথ্য উপদেষ্টা / স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয়, থাকবে না দলীয় প্রতীক

যশোরসহ ২০ অঞ্চলে ঝড়ের সম্ভাবনা

উত্তাল বঙ্গোপসাগর, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

ঘুসের টাকা গুনে নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল, বাগমারা থানার পুলিশ পরিদর্শক প্রত্যাহার

মহম্মদপুরে মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশকে নতুন সিল

রামিসা হত্যা: সোহেল ও স্বপ্না ‘কনডেম সেলে’

কেশবপুরে শরীকানা পুকুরের মাছ লুটের অভিযোগ

রাজশাহীতে বিভাগীয় পর্যায়ে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

পাবনায় হত্যা মামলার আসামিদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, নিহত ৩

রাজশাহীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ মিছিল

বিশ্ববাজারে আবারও বাড়লো স্বর্ণের দাম

ফের বাড়ল তেলের দাম

বিশ্বকাপ ইতিহাসে পেনাল্টি গোলের রেকর্ডে লিওনেল মেসি

দেশে ফিরলেন ৪৫১৫৮ হাজি, মৃত্যু ৪৯

X