
রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় গুলিতে নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের মরদেহ যশোরে তার নিজ বাড়িতে পৌঁছেছে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাত ৮টার দিকে শহরের কারবালা এলাকায় মরদেহ পৌঁছালে পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। রাতেই জানাজা শেষে কারবালা কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে ঢাকার নিউ মার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে মোটরসাইকেলে আসা দুই মুখোশধারী দুর্বৃত্ত টিটনকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
এই ঘটনায় নিহতের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন নিউ মার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ৮-৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।
খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন ছিলেন যশোর শহরের কারবালা এলাকার বাসিন্দা। একসময় তিনি একজন প্রতিভাবান ফুটবলার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৮০’র দশকে কোচ ইমদাদুল হক সাচ্চুর অধীনে যশোর জেলা দলের হয়ে খেলেছেন এবং খুলনা, চুয়াডাঙ্গা ও ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তার খেলার সুনাম ছিল।
তবে খেলোয়াড় জীবন থেকে ধীরে ধীরে রাজনীতি এবং পরবর্তীতে অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ১৯৯৮ সালে রাজনৈতিক কোন্দলের জেরে হামলার শিকার হওয়ার পর তার জীবনে বড় পরিবর্তন আসে।
১৯৯৯ সালে যশোরে জোড়া খুনের ঘটনার পর টিটন ঢাকায় চলে যান এবং সেখানকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি একাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং অস্ত্র ও সোনা চোরাচালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
২০০৪ সালে তাকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা মামলায় ২০১৪ সালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। দীর্ঘ কারাভোগের পর ২০২৪ সালের আগস্টে জামিনে মুক্তি পান।
২০০১ সালে তৎকালীন সরকার দেশের ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করলে সেখানে টিটনের নাম ছিল দ্বিতীয় স্থানে। তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে দেশজুড়ে পোস্টারও প্রচার করা হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, বসিলা পশুর হাটের ইজারা সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে। ঘটনার কয়েকদিন আগে টিটন তার ভাইকে এই বিরোধের কথা জানিয়েছিলেন এবং একটি মিটিংয়ে যোগ দেওয়ার কথাও বলেন।
জামিনে মুক্তির পর টিটন আত্মগোপনে ছিলেন বলে জানা গেছে। পরিবারের সঙ্গে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করে অতীতের ভুলের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ইচ্ছার কথাও জানান।
নিউ মার্কেট থানার ওসি মোহাম্মদ আইয়ুব জানিয়েছেন, এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে এবং পুলিশ ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। অন্যদিকে যশোর কোতয়ালী মডেল থানার পুলিশ জানিয়েছে, টিটনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে, তবে বিস্তারিত আপডেট এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
একজন প্রতিভাবান ফুটবলারের জীবন কীভাবে অপরাধ জগতের অন্ধকারে হারিয়ে যায়—খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের জীবন তারই একটি উদাহরণ। দীর্ঘ অপরাধ অধ্যায়ের পর শেষ পর্যন্ত গুলিতেই তার জীবনের সমাপ্তি ঘটল।
মন্তব্য করুন