মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

আইনের বেড়াজালে আটকে গেছে মুক্তেশ্বরী দখল উচ্ছেদ

মিলন রহমান
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ১০:৫৫ এএম
ভাতুড়িয়ায় এই কালভার্টের দক্ষিণপাশে নদী আছে, উত্তরপাশে নদী নেই। মুক্তেশ্বরী ভরাট করে এখানে প্লট বিক্রির সাইনবোর্ড টানিয়ে দেয়া হয়েছে।

# জেলা প্রশাসনের তদন্তে দখলের সত্যতা মিললেও আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা # রাষ্ট্রপক্ষের আইন কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া # নদী ভরাটি প্লট উচ্ছেদ না হলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ৪ হাজার বিঘায় জলাবদ্ধতার শঙ্কা

আইনি দীর্ঘসূত্রতায় আটকে গেছে যশোরের ভাতুড়িয়ায় মুক্তেশ্বরী নদী দখল উচ্ছেদ প্রক্রিয়া। নদী দখলকারীরা আদালতের দ্বারস্থ হওয়ায় উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের কৌশলী যথাযথ ভূমিকা রাখেননি। জেলা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তাও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। আর উচ্ছেদ প্রক্রিয়া আইনি বেড়াজালে আটকে যাওয়ায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে বিল হরিণায় ফের জলাবদ্ধতার পদধ্বনি শুনছেন এলাকাবাসী। একইসাথে চাষাবাদের আওতার বাইরেই থেকে যাবে প্রায় চার হাজার বিঘা জমি। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরে দখল প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একটি প্রভাবশালী চক্র যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া ও ভাতুড়িয়া পূর্বপাড়ার মাঝের মুক্তেশ্বরী নদীর সম্পূর্ণ অংশ ভরাট করে নেয়। এরপর গতবছর (২০২৫ সাল) জুলাই মাসে জমিতে প্লট তৈরি করে বিক্রির জন্য নোটিশ টাঙানো হয়। এ নিয়ে আগস্ট (২০২৫) মাসে সংবাদ প্রকাশ হলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এই দখল উচ্ছেদে স্থানীয়রা একাট্টা হলে জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভায় বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কমলেশ মজুমদারের নেতৃত্বে চার সদস্যের এই কমিটি মুক্তেশ^রী দখলের তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করে। এই প্রতিবেদনে মুক্তেশ্বরী নদী দখলের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। মুক্তেশ্বরী নদীর ভাতুড়িয়া মৌজা অংশের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায় সিএস রেকর্ডে মুক্তেশ^রী নদীর ভাতুড়িয়া অংশে চাঁচড়া জমিদার রাজা বরদাকান্ত রায়ের নামে সিএস ১৯৭৮ ও ১৯৮০ নং দাগের ৩৮১ শতক খাল শ্রেণি হিসেবে রেকর্ড হয়ে মুক্তেশ্বরী নদীর অংশ হিসেবে সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত ছিল। এসএ রেকর্ডেও রাজা বরাদাকান্ত রায়ের ওয়ারেশগণের নামে ওই জমি খাল শ্রেণি হিসেবে নদীর অংশ এবং উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু এরপর আরএস মাঠ জরিপে সরকারের পক্ষে কালেক্টর, যশোরের নামে ৩৪০ শতক খাল ও ধানী হিসেবে রেকর্ড হয়। এরপর আরএস জরিপ রেকর্ডে সেই জমি (৩৮১ শতক) মোস্তফা কামাল উদ্দিন, মোস্তফা জালাল উদ্দিন ও মোস্তফা আওয়াল উদ্দীনের নামে পুকুর ও ধানী জমি হিসেবে রেকর্ড হয়ে যায়।’ অর্থাৎ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্তেশ^রীর এই অংশ সরকারি হলেও অনিয়মের মাধ্যমে তা ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হয়েছে। এই প্রতিবেদন আমলে নিয়ে ২৯ অক্টোবর’২৫ নদী রক্ষা কমিটির সভায় জেলা প্রশাসক মো. আজাহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে সিদ্ধান্ত হয়, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুততার সাথে উক্ত ভরাটকৃত অংশ পুনঃখননের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং প্রয়োজনী ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ সহায়তা প্রদান করবেন।’

ভাতুড়িয়ায় এই কালভার্টের দক্ষিণপাশে নদী আছে, উত্তরপাশে নদী নেই। মুক্তেশ্বরী ভরাট করে এখানে প্লট বিক্রির সাইনবোর্ড টানিয়ে দেয়া হয়েছে। এদিকে, নদী রক্ষা কমিটির এই সিদ্ধান্তের পর পদক্ষেপ গ্রহণের বিলম্বের সুযোগে গত ১ ডিসেম্বর যশোর সদর সিভিল জজ আদালতের দ্বারস্থ হন জমির রেকর্ডধারী মোস্তফা জামাল উদ্দিন। এই মামলার রায়ে গত ১০ মে আদালত নদীর দখল উচ্ছেদে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌশলী নদী দখলচিত্রের কাগজপত্র এবং জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন যথাযথভাবে উপস্থাপন করেননি। কারণ জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনে নদী দখল ও ভরাট করার চিত্র পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তাও বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনসহ অনেক কাগজপত্রই আদালতে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। তারপরও সংশ্লিষ্ট তহশিলদার বিষয়বস্তু আদালতে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। তারপরও আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সংশ্লিষ্ট আদালতের জিপি অ্যাড. মোহাইমেন দাবি করেন, তিনি আদালতে যথাযথ ভূমিকা রেখেছেন। মামলার যারা বাদী তারা ক্রয়সূত্র মালিকানা পেয়েছেন। ওই জমি নিয়ে ৮৩ সালে মামলা হয়। সেই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ হেরে যায় এবং জমি ব্যক্তি মালিকানায় চলে যায়। পরবর্তীতে আপিল হলেও তা খারিজ হয়ে যায়। আদালত ওই রায়কে গুরুত্ব দিয়ে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। এদিকে, আদালতের এই আদেশের কারণে বিল হরিণা অঞ্চলের হাজারো কৃষকের ভাগ্য আবারো সেই অন্ধকারেই থেকে গেলো। গত সপ্তাহের বৃষ্টিতে ওই এলাকায় জলাবদ্ধতার পরিধি আরও বেড়েছে। নদীর দখল উচ্ছেদ না হলেও আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ওই এলাকার প্রায় চার হাজার বিঘা জমি জলাবদ্ধ হয়ে থাকবে। ফলে এই জমির ফসল বঞ্চনার পাশাপাশি ওই এলাকার বাড়িঘরেও পানি ঢুকে পড়ার দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। ভাতুড়িয়া এলাকার বাসিন্দা মাসুদুর রহমান জানান, হরিণার বিলপাড়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মুক্তেশ্বরীর এই প্লট অপসারণের জন্য আন্দোলন করে আসছেন। প্রশাসনের তদন্তে জালিয়াতি করে জমির রেকর্ড ও দখলের সত্যতা উঠে আসায় এবং দখল উচ্ছেদের সিদ্ধান্তে তারা আশাবাদী হয়েছিলেন। তাদের আশা ছিল, দ্রুত নদী খনন করা হলে বিলের পানি নেমে যাবে। কিন্তু আইনি ম্যারপ্যাঁচে দিনে দিনে অবস্থা আরও জটিল হয়ে যাচ্ছে। একই এলাকার বাসিন্দা তৌহিদুর রহমান জানান, জমি জালিয়াত চক্রটিকে আদালতের মাধ্যমে সময় ক্ষেপনের চেষ্টা করছেন। এর মাধ্যমে তারা দখল বজায় রাখতে চান। এতে সাধারণ মানুষের ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে এবং তারা হতাশ হয়ে পড়ছেন। বিল হরিণা বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক শেখ রাকিবুল ইসলাম নয়ন বলেন, আদালতের এই নিষেধাজ্ঞায় গ্রামবাসী হতাশ হয়ে পড়েছেন। জলাবদ্ধতার কারণে একসময়ের তিন ফসলি হাজার হাজার বিঘা জমি এখন বছরে মাত্র একটি ফসল দিচ্ছে। নদী দখল উচ্ছেদ করা গেলে আবারও কৃষকের মুখে হাসি ফুটতো। কিন্তু এখন তা দীর্ঘসূত্রতার জালে আটকে গেছে। মুক্তেশ^রী দখলের প্রতিবেদন এবং আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নিশ্চিত করে যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কমলেশ মজুমদার জানান, মুক্তেশ্বরীর অবৈধ দখল উচ্ছেদে তারা দ্রুতই ওই রায়ের ব্যাপারে জেলা জজ আদালতে আপিল করবেন।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জাইমা রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট, যুবক কারাগারে

হাম উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত হাজারের বেশি

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও তারুণ্য ধরে রাখবে কাঁকরোল

মণিরামপুরে ইমামুল হত্যাকাণ্ডে আটক হুসাইনের স্বীকারোক্তি

ঋণের প্রলোভনে টাকা আত্মসাত, মাহমুদাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা

পাওনা টাকা চাওয়ায় ভাতিজার মারধরে বৃদ্ধ নিহত

সেবা নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা সাধারণ মানুষের

মণিরামপুর পৌরসভার উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণা

এস আলমের প্রভাবমুক্ত ইসলামী ব্যাংকের দাবিতে রাজশাহীতে মানববন্ধন

কেশবপুরে ভূমি সহকারীর বাড়িতে অজ্ঞান পার্টির হানা

একনেক সভায় ১০ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন

জামায়াতের ৮.৩৯ লাখ কোটি টাকার ছায়া বাজেট প্রস্তাব

পুরুষ বন্ধুদের কাছ থেকে উপহার পেতে আনুশকার অস্বস্তি!

মণিরামপুরে নাতনীকে উত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা, আটক-১

তথ্য উপদেষ্টা / স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয়, থাকবে না দলীয় প্রতীক

যশোরসহ ২০ অঞ্চলে ঝড়ের সম্ভাবনা

উত্তাল বঙ্গোপসাগর, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

ঘুসের টাকা গুনে নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল, বাগমারা থানার পুলিশ পরিদর্শক প্রত্যাহার

মহম্মদপুরে মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশকে নতুন সিল

রামিসা হত্যা: সোহেল ও স্বপ্না ‘কনডেম সেলে’

X