
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়ার মোকাম রাজারহাটে এবারও অঘোষিত সিন্ডিকেটের আশঙ্কায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়াও ‘চার সঙ্কট’ নিয়ে চিন্তিত এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে রয়েছে ট্যানারি মালিক ও ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাছে পাওনা বকেয়া; লবণ ও উপকরণের দাম বৃদ্ধি; ব্যাংক ঋণ না পাওয়া এবং শ্রমিক সঙ্কট-মজুরি। এছাড়া চামড়া পাচারের আশঙ্কাও রয়েছে এই ব্যবসায়ীদের মনে। এসব কিছুর পরও পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছেন রাজারহাটের ব্যবসায়ীরা। কোরবানির পশু চামড়া ঘিরে রাজারহাটে এবারও জমজমাট বেচাকেনা হবে বলে আশা করছেন তারা। রাজারহাট দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়ার মোকাম। এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে তিন শতাধিক আড়ৎ রয়েছে। শনি ও মঙ্গলবার দুইদিন বসে হাট। এখানে খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ছাড়াও ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা, নাটোর এবং ঢাকার বড় বড় ব্যবসায়ীরা চামড়া বেচাকেনা করেন। এই হাট ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৫ হাজার ছোট বড় ব্যবসায়ী ব্যবসা করেন। ঈদ পরবর্তী প্রায় শত কোটি টাকার চামড়া হাতবদল হয় এখানে। কিন্তু ট্যানারি মালিক ও মহাজনদের কাছে থাকা বকেয়া আদায় না হওয়ার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণ না পাওয়া, হঠাৎ লবণসহ উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধিতে চামড়ার ব্যবসায়ীরা রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। সূত্র জানিয়েছে, এবার ঈদুল আজহা সামনে রেখে সরকার ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। ঢাকার বাইরে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সহসভাপতি সাঈদ আহমেদ নাসির শেফার্ড বলেন, রাজারহাটে সারা বছর চামড়া বেচাকেনা হলেও কোরবানির ঈদ-পরবর্তী মৌসুমি বাজার ধরতে অপেক্ষায় থাকেন ব্যবসায়ীরা। প্রতিবছর সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও মনিটরিংয়ের অভাবে এর সুফল পান না ক্ষুদ্র, মাঝারি ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। এতে তাদের পথে বসার উপক্রম হয়। রাজারহাট সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার এ বছর ঢাকার বাইরে চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। কিন্তু ঈদ পরবর্তী হাটগুলোতে এই দামে চামড়া বিক্রি নিয়ে সংশয় রয়েছে। ঢাকার পাইকার ও ট্যানারি মালিকদের অঘোষিত সিন্ডিকেটের কারণে হাটে গড়ে ৪০ থেকে ৫০টাকা বর্গফুটেও বিক্রি হয় না। ফলে সরকার নির্ধারিত দাম বিবেচনা করে মাঠ পর্যায় থেকে চামড়া কিনে মাথায় হাত ওঠে ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীদের। গত কয়েক বছর ধরে এ ঘটনার শিকার ব্যবসায়ীরা এবারও একই আশঙ্কায় রয়েছেন। এজন্য তারা প্রশাসনের মনিটরিং দাবি করেছেন। এই অঘোষিত সিন্ডিকেটের পাশাপাশি রাজারহাটের চামড়া মোকামে ‘চার সঙ্কট’ নিয়ে চিন্তিত চামড়া ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা আরও জানান, ঢাকার ট্যানারি মালিক, পাইকার ও বড় ব্যবসায়ীদের কাছে এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের অন্তত ৩০ কোটি টাকার বেশি পাওনা রয়েছে। আর ঈদের সময় চামড়া কেনার জন্য ট্যানারি মালিকসহ বড় ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ পেলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা তা পান না। এর সাথে ঈদের আগেই লবণের প্রতিবস্তার দাম সাড়ে ৭শ’-৮শ’ টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ৫০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের বাড়তি মজুরি ও সঙ্কটও দুশ্চিন্তার কারণ হিসেবে রয়েছে। রাজারহাট মোকামের আড়তদার আবদুল মালেক জানান, ট্যানারি মালিকদের কাছে এখানকার আড়তদারদের অন্তত ৩০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। দীর্ঘদিনেও বিপুল অঙ্কের বকেয়া আদায় না হওয়ায় পুঁজি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। ঈদের আগে এই টাকা আদায় না হলে পুঁজি সংকট বাড়বে। আর তাদের মতো স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ব্যাংকও ঋণ দেয় না।
স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী জানান, ‘ব্যবসার অবস্থা এবারও খারাপ হবে মনে হচ্ছে। গত বছরের ট্যানারি মালিকদের প্রতিনিধিদের কাছে চামড়া দিয়েছিলাম, কিন্তু সব বকেয়া এখনও পাওয়া যায়নি। তারপরও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এবারও প্রস্তুতি নিচ্ছি। সরকার এবার গরুর চামড়ার দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা বর্গ ফুট বেঁধে দিয়েছে। কিন্তু সেই দামে চামড়া কিনলে লসের আশঙ্কা রয়েছে। কারণ একটি কাঁচা চামড়ায় ৩শ’-সাড়ে ৩শ’ টাকার লবণ, শ্রমিক মজুরি ও পরিবহণ খরচ রয়েছে। ফলে ৪শ’-৫শ’ টাকায় চামড়া কিনলে খরচসহ এর দাম ৭শ’ থেকে ৮শ’ টাকা পড়ে যায়। কিন্তু এত দামে যদি ট্যানারি মালিকরা না কেনেন তাহলে লোকসানে পড়তে হবে। ফলে এবার চামড়া খুব হিসাব করে কিনতে হবে।’
রাজারহাটের চামড়া ব্যবসায়ী ও হাটের প্রাক্তন ইজারাদার হাসানুজ্জামান হাসু জানান, প্রতি কুরবানি ঈদের আগে থেকে লবণের দাম বেড়ে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। হঠাৎ করে প্রতি বস্তায় দুশ’ টাকা দাম বেড়েছে। সেই সিন্ডিকেট রয়েই গেছে, সরকার ভাঙ্গতে পারেনি। আমাদের দাবি, ট্যারানি মালিকদের কোটি কোটি টাকা ঋণ দেয় সরকার। কিন্তু এ রকম না দিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী-ফড়িয়াদের যদি অল্প সুদে ঋণ দিতো, তাহলে এই ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারতো।’ একইসঙ্গে বাজার চাঙ্গা করতে ইউরোপের বাজার ধরতে সরকারি উদ্যোগ নেয়ারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, সরকার চামড়ার দাম বেঁধে দিলেও ক্রয়-বিক্রয়ে সেই দামে ব্যবসায়ীদের মধ্যে তেমন সাড়া থাকে না। ফলে স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এ সময়টায় চামড়ার দাম ভারতে একটু বেশি থাকবে। সে জন্য বেশি মুনাফার আশায় চামড়া পাচার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতে চামড়া পাচার রোধে শার্শা ও বেনাপোল সীমান্তে সতর্কতা জারি করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। প্রশাসনও চামড়া পাচার রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল জানান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে এনজিও বা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে পুঁজি জোগাড় করতে হয়। সেই টাকায় চামড়া কিনেও ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। সরকার প্রতিবছর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে ঠিকই, কিন্তু সেই দামে সব চামড়া বেচাকেনা হয় না।
চামড়া প্রতিবেশী দেশে পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, এ দেশের চামড়া চীনে রপ্তানি হয়। কিন্তু চীননির্ভর রপ্তানি থেকে বেরিয়ে ইউরোপের বাজার ধরতে হবে। তাহলে চামড়াশিল্প চাঙ্গা হবে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বাঁচবে। বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার জন্য সরকারি প্রতি দাবি জানান তারা।
চামড়া বাজার ও ব্যবসায়ীদের দাবির বিষয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে লবণের যেনো কোনো সঙ্কট না হয় সে ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চামড়া বাজার মনিটরিংয়ে জেলা প্রশাসন থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাচার রোধেও প্রশাসন তৎপর রয়েছে।
মন্তব্য করুন