
মাগুরার মহম্মদপুর ও ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার মেলবন্ধন তৈরি করেছে মধুমতি সেতু। দিনের আলোয় স্থাপত্যশৈলীর সৌন্দর্যে উজ্জ্বল এই সেতুটি নামতেই রূপ নেয় ঘোর অন্ধকারে। মহম্মদপুর উপজেলা সদরের মধুমতি নদীর উপর নির্মিত ৬০১ মিটারের এই দীর্ঘ সেতুটি এখন কেবলই এক অন্ধকার সুড়ঙ্গ, যেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয় হাজারো মানুষকে।
২০২০ সালের ২২ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়ালি এই সেতুটির উদ্বোধন করেন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই সেতুটি মহম্মদপুর তথা মাগুরাবাসীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। বিশেষ করে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয় এই পথ ধরে। বর্তমানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দূরপাল্লার পণ্যবাহী ট্রাক, যাত্রীবাহী বাস এবং ছোট-বড় অসংখ্য যানবাহন এই সেতুর উপর দিয়ে চলাচল করে। কিন্তু উদ্বোধনের চার বছর না পেরোতেই অব্যবস্থাপনার চাদরে ঢাকা পড়েছে এই অর্জন।
মধুমতি নদীর উপর নির্মিত সেতুটির দৈর্ঘ্য ৬০০ দশমিক ৭০ মিটার এবং প্রস্থ ৯ দশমিক ৮০ মিটার। সেতুটিতে ১৫০টি পাইল, ১৪টি পিয়ার, দুইটি অ্যাবাটমেন্ট ও ১৫টি স্প্যান রয়েছে। যার নির্মাণ ব্যয় ৬৩ কোটি ৩১ লাখ ২৮ হাজার টাকা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ‘উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়কে দীর্ঘ সেতু র্নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এই সেতুটি নির্মিত হয়।
মধুমতি নদীর এই সেতুকে ঘিরে ছোটখাটো বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। ঈদ, বিশেষ দিবস এবং ছুটির দিনে স্থানীয় ছাড়াও দূর-দূরান্তের মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন। প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশ এবং মধুমতি সেতু ভ্রমণপিপাসুদের দিয়েছে অনন্য মাত্রা। নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছে রেস্টুরেন্ট। সেতুর উপর বসে ভ্রাম্যমান নানান ধরনের দোকান। যেখানে ফুসকা, চটপটি, বাদাম, ঝালমুড়ি, আইসক্রিমসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হয়। ঈদের সময় দুই পাড়ে মেলা বসে। বসে নাগরদোলা। নদীতে ভ্রমণের জন্য রয়েছে বাহারি নৌকা। এটিকে অনেকে মিনি কক্সবাজারও বলে থাকেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতুটির দুই পাশে বসানো দৃষ্টিনন্দন স্ট্রিট লাইটগুলোর একটিও জ্বলছে না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত বাড়ার সাথে সাথে পুরো এলাকা এক গা ছমছমে পরিবেশে নিমজ্জিত হয়। অন্ধকারে সেতু পাড়ি দিতে গিয়ে পথচারী ও মোটরসাইকেল চালকদের পিলে চমকে ওঠে। স্থানীয়রা জানান, শুরুর দিকে আলো জ্বললেও দীর্ঘ দুই বছর ধরে মেইনটেন্যান্স বা সংস্কার না হওয়ায় এখন এটি পুরোপুরি অন্ধকার।
স্থানীয় মো. ইউনুছ আলী বলেন, ‘দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে সেতুতে আলো জ¦লছে না। ফলে সন্ধ্যার পর ভুতুড়ে পেিবশের সৃষ্টি হয়। রাতে নিরাপত্ত্বাহীনতা বাড়ে।’ মো. ইমামুল ইসলাম নামের এক যুবক বলেন, ‘সেতুর কাছেই আমার শ্বশুর বাড়ি। প্রায়ই ঘুরতে আসি কিন্তু সন্ধ্যার পর অন্ধকার হওয়ায় ঝুকি থাকে। স্ট্রিট লাইটগুলো দ্রুত জ¦ালানোর দাবি জানাচ্ছি।’
সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি কেবল তদারকির অভাবে অন্ধকারে পড়ে থাকবে, তা কাম্য নয়। রাজধানী ঢাকার সাথে সংযোগ রক্ষাকারী এই পয়েন্টে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি দ্রুত এই আঁধার ঘুচিয়ে মধুমতি সেতুকে আবারও নিরাপদ করে তুলবেন, এখন এটাই মহম্মদপুরবাসীর বড় প্রশ্ন।
বিদ্যমান এই সংকট নিয়ে মহম্মদপুর উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. গোলজার হোসেন জানান, বাতিগুলো নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি তার চুরির বিষয়টি তারা অবগত আছেন। তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পেলে পুনরায় লাইটগুলো জ্বালানোর ব্যবস্থা করা হবে।”
অন্যদিকে, দ্রুত সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রী বলেন, “সার্ভিস তার ও লাইট চুরি হয়ে যাওয়ায় এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তবে আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছি। খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করে লাইটগুলো পুনরায় সচল করতে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি।”
মন্তব্য করুন