শিরোনাম |
❒ উত্তরা গণভবন
নাটোর শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ১২৫ বিঘা জমির ওপর নির্মিত দিঘাপতিয়া রাজপ্রাসাদ আজকের দিনে পরিচিত ‘উত্তরা গণভবন’ নামে। এই প্রাসাদের প্রবেশমুখেই চোখে পড়ে একটি পিরামিড আকৃতির চারতলা প্রবেশদ্বার, যার চূড়ায় বসানো আছে কোক অ্যান্ড টেলভি কোম্পানির তৈরি একটি বিরল ঘণ্টা ঘড়ি। এটি বর্তমানে দেশের অন্যতম প্রাচীন সময়দায়ী ঘড়িগুলোর একটি, যা প্রায় ২০০ বছর ধরে নিরবিচারে সময় জানিয়ে আসছে।
প্রবেশপথের কাছেই রয়েছে একটি বিশাল লোহার দরজা, যার ওপরে স্থাপন করা হয়েছে ঘড়িটি। জানা যায়, এটি আনা হয়েছিল ইতালির ফ্লোরেন্স থেকে। রাজা প্রমদানাথ রায়ের বিদেশি ঘড়ির প্রতি আগ্রহের ফলেই এই ঐতিহাসিক ঘড়িটি স্থান পায় প্রাসাদের গায়ে। এমনকি একসময় এমন একটি জলতরঙ্গ সুরে বাজানো ঘড়িও ছিল, যা প্রতি ১৫ মিনিট পরপর বিশেষ সুরে বেজে উঠত।
উত্তরা গণভবনের মূল প্রাসাদে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে রাজার সিংহাসন, যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত বর্ম এবং প্রাচীন তলোয়ার। চারপাশে সুউচ্চ প্রাচীর এবং পরিখা ঘেরা এই প্রাসাদের সামনে রয়েছে ছোট-বড় বহু কামান। ভিতরে সাজানো রয়েছে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজি।
এই রাজবংশের সূচনা হয় তিলি সম্প্রদায়ের দয়ারাম রায়ের হাত ধরে। তিনি ছিলেন রানী ভবানীর বিশ্বস্ত দেওয়ান। তাঁর একনিষ্ঠতার পুরস্কার হিসেবে রানী ভবানী তাঁকে দয়ারামপুর এস্টেট ও দিঘাপতিয়া তালুক দান করেন। পরবর্তীতে দয়ারাম রায় নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে সীতারামকে পরাজিত করেন এবং পুরস্কার হিসেবে তালুক লাভ করেন।
১৮১০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর জগন্নাথ রায় রাজা হন এবং তারপর তার পুত্র প্রাণনাথ রায়। নিঃসন্তান প্রাণনাথের মৃত্যুর পর দত্তক পুত্র প্রসন্ন নাথ রায় রাজা হন। ১৮৮৭ সালের ভূমিকম্পে রাজবাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাজা প্রমদানাথ রায় তা নতুনভাবে নির্মাণ করেন। এই রাজবাড়ি সাত প্রজন্ম ধরে রাজাদের হাতে পরিচালিত হয়।
দেশভাগের সময় রাজপরিবার ভারতে চলে গেলে রাজপ্রাসাদ পতনের মুখে পড়ে। ১৯৬০-এর দশকে এই প্রাসাদকে ‘গভর্নর হাউস’ ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এটিকে 'উত্তরা গণভবন' হিসেবে ঘোষণা করেন।
বর্তমানে ঘড়িটি এখনো সচল আছে এবং দিনের পর দিন সময় দিয়ে চলেছে। সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আদেশ আলী বলেন, স্বাধীনতার পরও ভাগনগরকান্দি গ্রাম থেকে রাজপ্রাসাদের এই ঘড়ির ঘণ্টাধ্বনি শোনা যেত। যদিও এখন দূর থেকে সে শব্দ শোনা যায় না, তবে ঘড়িটি আজও বিরতিহীনভাবে সময় দিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের অতীত ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষী।