শিরোনাম |
যশোরের সিঙ্গিয়া রেলওয়ে স্টেশন এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও নানা সমস্যায় হাবুডুবু খাচ্ছে। সকালের ট্রেনে যশোরের মানুষের ঢাকায় যাতায়াতের জন্য স্টেশনটিতে এখন প্রচুর যাত্রীর চাপ। দিনিদিন এ চাপ আরও বাড়ছে। কিন্তু যাত্রীসেবা নিশ্চিতে ন্যূনতম ভ্রুক্ষেপ নেই এখানকার কর্মকর্তাদের ।
ওয়েটিং রুম থাকলেও তা না থাকার মতো। শৌচাগারে বেসিন আছে, কমোড আছে কিন্তু নেই স্প্রে বা পানির ব্যবস্থা। স্টেশনে নেই কোনো নিরাপত্তাকর্মী। সন্ধ্যা হলেই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে বসে মাদকের আখড়া। চোর ও ছিনতাইকারীদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে সিঙ্গিয়া রেল স্টেশনটি। শুক্রবার সরেজমিনে স্টেশন ঘুরে এসব চিত্র উঠে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও নজরদারির অভাব বলে দাবি করছেন যাত্রীসহ স্থানীয়রা। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছেন সবাই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকায় রেলে যাওয়ার জন্য সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে খুলনা থেকে জাহানাবাদ এক্সপ্রেসটি ছেড়ে এসে বসুন্দিয়া স্টেশনে থামে। ফেরার পথেও রাতে স্টেশনে থামে ট্রেনটি। মূলত ওই ট্রেনটি যশোর শহর ও বিভিন্ন উপজেলার, লোকজনের জন্য সকালে ঢাকায় গিয়ে কাজ সেরে রাতে ফেরার সুবিধাজনক বাহন। এছাড়াও এ স্টেশনে খুলনা–বেনাপোল রুটের বেতনা, মোংলা কমিউটার ও খুলনা–চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী মহানন্দা ট্রেনের স্টপেজ রয়েছে। ফলে প্রতিদিনই হাজারো যাত্রীর আনাগোনা রয়েছে সেখানে।ফলে স্টেশনটি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেখানে সেবার মান খুবই নগণ্য বলে দাবি করছেন যাত্রীরা।
গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, সিঙ্গিয়া স্টেশনে যাওয়ার জন্য বাইপাস সড়কের হাল বেহাল। বৃষ্টির কারণে অনেকটা চলাচল অযোগ্য হয়ে উঠেছে। এছাড়া স্টেশনের সামনের মেইন রাস্তায় নেই কোনো ফুটওভার ব্রিজ। ফলে বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে বসুন্দিয়া মোড় ঘুরে। স্টেশনটি দেখতে চাকচিক্য করা হয়েছে, এমনকি সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কাউকেই দেখা যায়নি। একটি বিশ্রামাগারে দেখা যায় দরজা আছে, কিন্তু তালা নেই। ভিতরে ঢুকতেই দেখা যায় ফ্যান আছে, কিন্তু রেগুলেটর ও সুইচ নেই। অন্যদিকে, প্রথম শ্রেণির শৌচাগারে দেখা যায় বেসিন রয়েছে, কিন্তু তার কল ও পাইপ নেই। পাশেই রয়েছে কমোড, অথচ নেই কোনো পানির ব্যবস্থা। সবকিছুই চুরি হয়ে গেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া সুন্দর এই স্টেশনে দেখা যায়, যেখানে-সেখানে ময়লা আবর্জনার স্তুপ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিঙ্গিয়া রেলওয়ে স্টেশনে নেই কোনো নিরাপত্তাকর্মী। লাখ লাখ টাকার সম্পদ নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। এছাড়া পুরো স্টেশনে রাজেন্দ্র নামের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছেন। তিনি চারদিন বসুন্দিয়ায় ডিউটি করেন আর বাকি তিনদিন নড়াইল স্টেশনে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করেন। স্টেশনে পয়েন্টম্যান ছয়জনের পরিবর্তে রয়েছেন তিনজন। পোর্টার ও গেটম্যানসহ অন্য পদের কর্মীও প্রয়োজনের তুলনায় রয়েছে অর্ধেকেরও কম।
কেউ কেউ বলেন, অনেক মাঝে মধ্যে দীর্ঘ সময় যাত্রীদের অপেক্ষা করতে হয় স্টেশনে। টয়লেট থাকলেও যাওয়ার উপায় নেই। ফলে টয়লেটের জন্যও ট্রেনের আশায় অপেক্ষায় থাকতে হয়, যা যন্ত্রণাদায়ক। বিষয়টি নিয়ে চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন যাত্রীরা। তারা বলেন, ঢাকা থেকে রাতে তাদের ওই স্টেশনে নামতে হয়। কিন্তু সে সময় তাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে না, যা বড়ই হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেন কেউ কেউ।
স্থানীয়রা জানান, সরকারি স্টেশন হওয়ায় সকলেই সরকারি হিসেবেই ব্যবহার শুরু করে। বিশ্রামাগার হয় ওঠে প্রতিবেশীদের আড্ডাখানা। আশপাশের লোকজন বাড়ি রেখে স্টেশনের টয়লেটও ব্যবহার করেন। বিশেষ করে সন্ধ্যা হলেই পরিস্থিতি হয় ওঠে আরও ভয়াবহ। স্টেশন চত্বরে বসে মাদকের আড্ডা। চোর ছিনতাইকারীদের দখলে চলে যায় পুরো এলাকা। তারা সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার দাবি জানান।
তারা বলেন, স্টেশনের পেছনে সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করলেও তার রক্ষণাবেক্ষণে কার্যত ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এতে করে সরকারি সম্পদ নষ্ট হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই।
এ বিষয়ে সিঙ্গিয়া রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার রিয়াদ খান বলেন, স্টেশনে সমস্যার শেষ নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা কর্মী সংকট। নিরাপত্তাকর্মী একজনও নেই। এছাড়া চোরের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন তারা। এসব বিষয় নিয়ে যাত্রী ও স্থানীয়দের সাথে তাদের গোলযোগ লেগেই থাকে। তিনি আরও বলেন, তিনি নিজের টাকা দিয়ে বাধ্য হয়ে কল ও বদনা কিনে দেন, তারপরও থাকে না। এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে, কিন্তু প্রতিকার পাননি। এছাড়া স্থানীয় প্রভাবও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ বিষয়ে সিঙ্গিয়া রেলওয়ে স্টেশনের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ রেলওয়ে যশোরের সিনিয়র সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার তৌহিদ সুমন হোসেন বলেন, কর্মী সংকটের কারণে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বারবার বিভিন্ন ফিটিংস লাগানো হলেও তা রাখা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ট্রেন আসার আগমুহূর্তে টয়লেট খোলা রাখা হলে স্থানীয়রা চাপ প্রয়োগ করে রাতদিন খোলা রাখতে বাধ্য করছে।বিষয়টি নিয়ে তারা নিজেরাও বিরক্ত। এছাড়া বাইপাস রাস্তার বিষয়ে তিনি বলেন, ওটা নির্দিষ্ট কোনো সড়ক না। এছাড়া এই মুহূর্তে ফুটওভার ব্রিজ সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। শেষমেষ তিনি স্থানীয় রেল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরও কিছুটা উদাসীনতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তবে, জনবল দিলে এসব সমস্যা আর থাকবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।