gramerkagoj
রবিবার ● ৩১ আগস্ট ২০২৫ ১৬ ভাদ্র ১৪৩২
gramerkagoj
ঘুরে আসুন রাণী ভবানীর নাটোর রাজবাড়ী
প্রকাশ : রবিবার, ২০ জুলাই , ২০২৫, ০৪:৪৪:০০ পিএম
অরুন শীল:
GK_2025-07-20_687cc8abd50a9.jpg


বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের এক ঐতিহাসিক শহর নাটোর। এই শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে রাজকীয় স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন নাটোর রাজবাড়ী। ৪৯.১৯২৫ একর জমির ওপর নির্মিত এই রাজবাড়ী শুধু স্থাপত্যই নয়, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অমূল্য ধন।

নাটোর রাজবংশের পত্তন হয় ১৭০৬ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ১৭১০ সালে), যখন পরগণা বানগাছির জমিদার গণেশ রায় ও ভবানীচরণ চৌধুরী রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থ হয়ে বরখাস্ত হন। তাঁদের জমিদারি হস্তান্তরিত হয় দেওয়ান রঘুনন্দনের ভাই রামজীবনের নামে। তিনি-ই হয়ে ওঠেন নাটোর রাজবংশের প্রথম রাজা। তাঁর শাসনকাল চলে ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।

রামজীবনের মৃত্যুর পর, তাঁর দত্তক পুত্র রামকান্ত ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে নাটোরের রাজা হন। কেউ কেউ মনে করেন, ১৭৩০ থেকে ১৭৩৪ সাল পর্যন্ত দেওয়ান দয়ারাম রাজ্যের ভার সামলাতেন। রামকান্ত ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন।

নাটোর শহর গড়ে ওঠে একটি বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে। জনশ্রুতি আছে, রাজা রামজীবন এক বর্ষাকালে পণ্ডিত ও সহচরদের সঙ্গে নৌকাভ্রমণে বের হয়ে ভাতঝাড়া বিল এলাকায় উপস্থিত হন। সেখানে তারা একটি সাপকে ব্যাঙ গিলতে দেখেন—এই "দুর্লভ" দৃশ্য দেখে পণ্ডিতরা একে শুভলক্ষণ বলে মনে করেন। এখানেই রাজবাড়ী নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়, যা অল্প সময়েই পরিণত হয় এক জনবহুল শহরে—বর্তমান নাটোর।

রাজা রামকান্তের স্ত্রী রানী ভবানী হয়ে ওঠেন বাংলার অন্যতম প্রতাপশালী নারী জমিদার। তাঁর পিতার নাম আত্মারাম চৌধুরী এবং মাতার নাম জয়দুর্গা। জন্ম ১৭২৩ সালে, বর্তমান বগুড়ার ছাতিয়ানগ্রামে।

স্বামী রামকান্তের মৃত্যুর পর নবাব আলীবর্দী খাঁ তাঁর ওপর নাটোরের বিশাল জমিদারির দায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনি একাই দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেন রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, যশোর, রংপুরসহ পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও মালদহ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বিশাল এলাকা। এজন্য তাঁকে বলা হতো "অর্ধবঙ্গেশ্বরী"।

রানী ভবানী ছিলেন একাধারে ধর্মপ্রাণ, দানশীলা ও দূরদর্শী প্রশাসক। তিনি শত শত মন্দির, অতিথিশালা ও রাস্তা নির্মাণ করেন। হাওড়া থেকে বেনারস পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করেন, যা পরে "রানী ভবানী রোড" নামে খ্যাত হয়। কাশীতে তিনি ভবানীশ্বর শিবমন্দির, দুর্গাবাড়ী, দুর্গাকুণ্ড ও কুরুক্ষেত্রতলা নামক জলাশয় নির্মাণ করেন।

পানীয় জলের কষ্ট লাঘবে তিনি অসংখ্য পুকুর খনন করেন। শিক্ষা বিস্তারেও তাঁর দানসাহায্য ছিল বিস্ময়কর। বাংলার বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাঁর অবদানে গড়ে ওঠে।

তারাপীঠ মন্দিরের উন্নয়ন, কালীসাধক বামাক্ষ্যাপাকে পুরোহিত হিসেবে নিয়োগ ও বগুড়ার ভবানীপুর পীঠস্থান মন্দিরসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ—সবই রানী ভবানীর অসামান্য ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক।

তিনি শেষ জীবনে মুর্শিদাবাদের বড়নগরে কন্যাসহ বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি ১০০টি শিবমন্দির নির্মাণ করেন। আজও সেখানে কিছু মন্দির টিকে আছে এবং দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে টেরাকোটার শৈলীতে।

দত্তক পুত্র রামকৃষ্ণকে জমিদারি দায়িত্ব দিয়ে রানী ভবানী মুর্শিদাবাদ চলে যান। পরবর্তী সময়ে ইংরেজ শাসক ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁর রংপুরের জমিদারি জোরপূর্বক কেড়ে নেয়। রানী ভবানী ১৮০২ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর ৭৯ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।

বর্তমানে নাটোর রাজবাড়ী বাংলাদেশের জাতীয় সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৮৬ সাল থেকে এটি রানী ভবানী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও যুবপার্ক হিসেবে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। এটি নাটোর শহরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

আরও খবর

🔝