gramerkagoj
রবিবার ● ৩১ আগস্ট ২০২৫ ১৬ ভাদ্র ১৪৩২
gramerkagoj

❒ দিনমজুরের ছেলের কোটি টাকার চাঁদাবাজি সাম্রাজ্য!

প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির রিয়াদের রুদ্ধশ্বাস উত্থান
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই , ২০২৫, ১০:১১:০০ এএম
কাগজ ডেস্ক:
GK_2025-07-31_688aecdecf5d6.jpg

এক সময়ের দিনমজুরের ছেলে, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আব্দুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান ওরফে রিয়াদ এখন কোটি টাকার মালিক। এক বছরের মধ্যেই ঢাকার গুলশান, নাখালপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ভয়ভীতি, মব সৃষ্টির মাধ্যমে চাঁদাবাজির রাজত্ব গড়ে তুলেছেন তিনি। নিজেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ নেতা পরিচয় দিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজি চক্র।

রিয়াদকে গুলশানের সাবেক এমপি শাম্মী আহমেদের বাসা থেকে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের চেষ্টার সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে গুলশান থানা পুলিশ। তার চার সহযোগীসহ আদালতে হাজির করা হলে সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। বর্তমানে মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে রিমান্ডে থাকা চারজনের জিজ্ঞাসাবাদে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য বেরিয়ে আসছে।

পিতার দিনমজুরি আর দানের টাকায় এইচএসসি পাস করে ঢাকায় এসে গুলশানের প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন রিয়াদ। কিন্তু ২০২3 সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই নাটকীয়ভাবে বদলে যায় তার ভাগ্য। রাজনীতিকদের ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে মব তৈরি করে শুরু হয় দখল, নিয়োগ, বদলি, মামলা-মোকদ্দমা ‘ম্যানেজ’-এর নামে চাঁদাবাজি।

রিয়াদের ভয়ে অনেক ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা, এমনকি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না এমন ব্যক্তিরাও চুপ থাকতে বাধ্য হন। তদন্তে উঠে এসেছে, লোক দেখানো আন্দোলনের আড়ালে ভিকটিমদের পুলিশের ভয় দেখিয়ে, মব সৃষ্টির মাধ্যমে, এমনকি ব্যাংক চেকের মাধ্যমেও টাকা আদায় করতেন তিনি।

পুলিশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, রিয়াদের নাখালপাড়ার বাসা থেকে উদ্ধার হয়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার চেক, যেটি ছিল আওয়ামী লীগ নেতা ও রংপুর-৬ এর সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদের নামে। চেকের অর্থ আদায়ের সময় ছিল ২ আগস্ট। একই সঙ্গে পাওয়া গেছে অন্তত ২০ লাখ টাকার ১০টি এফডিআরের স্লিপ এবং একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৬০-৭০ লাখ টাকার লেনদেনের প্রমাণ।

এছাড়াও আরও কয়েকটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোটা অঙ্কের টাকার গমনাগমনের তথ্য হাতে পেয়েছে পুলিশ। একমাত্র ছাত্রনেতা পরিচয়ে কীভাবে এত টাকার উৎস তৈরি হলো, তা খতিয়ে দেখছে সিআইডি ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

তদন্তে জানা গেছে, রিয়াদের পেছনে উচ্চপর্যায় থেকে শেল্টার ছিল, এমনকি আদায়কৃত চাঁদার একটি অংশ উপরের মহলেও পৌঁছাতো। যার কারণে বহুদিন ধরেই রিয়াদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সংগঠন।

তবে বিষয়টি জনসমক্ষে চলে আসার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ থেকে রিয়াদসহ তার চার সহযোগীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার পাঁচজন হলো— আব্দুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান রিয়াদ (প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী), ইব্রাহীম হোসেন মুন্না (ঢাকা মহানগর আহ্বায়ক, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন), মো. সাকাদাউন সিয়াম (সদস্য), সাদমান সাদাব (সদস্য), মো. আমিনুল ইসলাম (কর্মী)।

তাদের মধ্যে আমিনুল ছাড়া বাকি চারজন রিমান্ডে রয়েছে। এখনো পলাতক রয়েছে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক জানে আলম অপু ওরফে কাজী গৌরব অপু।

গুলশানের ৮৩ নম্বর রোডে অবস্থিত সাবেক এমপি শাম্মী আহমেদের বাসায় গিয়ে সমন্বয়ক পরিচয়ে ৫০ লাখ টাকা দাবি করে রিয়াদ ও তার দলবল। সেদিন শাম্মী আহমেদ বিদেশে ছিলেন, বাসায় ছিলেন তার স্বামী সিদ্দিক আবু জাফর। পুলিশ উপস্থিত থাকলেও ভয়ভীতি ও হামলার মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা আদায় করে রিয়াদ গ্যাং। ফের শনিবার সন্ধ্যায় একই বাসায় গিয়ে আরও টাকা নিতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তারা।

ছাত্র রাজনীতির নামে ঢাকার বুকে গড়ে ওঠা এই ভয়ঙ্কর চাঁদাবাজ চক্রটি ছাত্রসমাজ ও রাজনীতিকে যেমন কলঙ্কিত করেছে, তেমনি পুরো দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর প্রশ্ন তুলেছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত কতদূর গড়ায় এবং এই চক্রের পেছনে থাকা রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় আনা যায় কিনা।

আরও খবর

🔝