দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
শিরোনাম: যশোরে গাঁজাসহ নারী আটক       মোরেলগঞ্জে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটে ১০ দোকান পুড়ে ছাই       অনুপ্রবেশকালে হাসাদাহ থেকে আটক ৮        মানবপাচারকারী চক্রের হোতা সাইফুল র‌্যাবের হাতে আটক       কেশবপুর পৌরসভার উদ্যোগে ১৩ হাজার মাস্ক বিতরণ        উপকূলের উন্নয়নে জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখার দাবি       যশোরের নতুন জেলা শিক্ষা অফিসারকে শুভেচ্ছা স্বাশিপের       মণিরামপুরের প্রতিবন্ধী কবির হত্যা মামলায় চার্জশিট       আগামীকাল আলমগীর সিদ্দিকীর ৪৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী        এশিয়ান কাপের বাছাই পর্বে খেলবে বাংলাদেশ      
কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে এক সময়ের গ্রামীণ সমাজের সন্ধ্যাবাতি হারিকেন
এরশাদ আলী, মনিরামপুর (খেদাপাড়া) প্রতিনিধি:
Published : Monday, 1 March, 2021 at 5:46 PM, Count : 163
কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে এক সময়ের গ্রামীণ সমাজের সন্ধ্যাবাতি হারিকেন‘লাল নিল বাতি দেইখা পরান জুড়ায়ছে, ঢাকা শহর আইসা আমার  আশা পুরাইছে’। এ গানের অর্থ বুঝা যায় আজ থেকে ৫০ বছর আগে যখন গ্রাম গঞ্জে বিদ্যুৎ ছিল না। গ্রামের মানুষ শহরে বেড়াতে গেলে বৈদ্যুতিক আলো দেখে অবাক হয়ে যেত।
প্রথম হারিকেনের বর্ণনা পাওয়া যায় আল রাযী-র বই ‘কিতাব আল আছা’য় যেখানে তিনি একে ‘নাফতা’ বলে উল্লেখ করেন। হারিকেন টিনের তৈরি কাচের চিমনি বিশিষ্ট প্রদীপ। আনারসের মতো গোলাকার কাচের চিমনির নিচের অংশে টিনের তৈরি তেলের ট্যাংক থাকত, যার ভেতরে ঢালা হতো কেরোসিন তেল। পেঁচানো রশি দিয়ে বানানো হতো রেশা, এর এক চতুর্থাংশ তেলের ট্যাংকটিতে চুবানো হতো আর বাকি অংশ থাকত কাচের ওপরে। দিয়াশলাই দিয়ে এই অংশটিতে আগুন জ্বালালেই আলো ছড়াত হারিকেন। হারিকেনের পাশে থাকা রেগুলেটর দিয়ে আলো কমানো-বাড়ানো হতো। ওপরে টিন অথবা স্টিলের তার দিয়ে বহনযোগ্য করে তোলা হতো হারিকেন বাতি। হারিকেনের কেরোসিন তেল রাখার জন্য গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছিল বিশেষ ধরনের কাচের ও প্লাস্টিকের বোতল। বোতলের গলায় রশি লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হতো বাঁশের খুঁটিতে। সন্ধ্যাবেলা হারিকেনের কাচের চিমনি খুলে, ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে কেরোসিন তেল ঢেলে রেশার মধ্যে দিয়াশলাই দিয়ে আগুন জ্বালানো হতো।
এখনো গ্রামের দু-একটি বাড়িতে হারিকেন পাওয়া যেতে পারে, সেগুলো হয়তো ময়লা ও মরিচা পড়ে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ঘরে ঘরে, রাস্তা-ঘাটে, হাট-বাজারে এখন বৈদ্যুতিক আলোর ঝলকানি। প্রযুক্তির উৎকর্ষে হারিকেনের পরিবর্তে স্থান করে নিয়েছে পল্লীবিদ্যুৎ, সোলারপ্লান্ট এবং চার্জারলাইট। তাপ বিদ্যুৎ, জল বিদ্যুৎ সৌর বিদ্যুৎসহ জ্বালানিখাতে ব্যাপক উন্নয়নে হারিকেন বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্ম হয়তো জানবেও না হারিকেন কী আর হারিকেন নিয়ে মানুষের স্মৃতিকাতরতার তাৎপর্য।
একটা সময় ছিল যখন গ্রামাঞ্চলের প্রতিটি বাড়িতে হারিকেন দেখা যেত। তখন হারিকেন মেরামত করতে বিভিন্ন হাট বাজারে মিস্ত্রী বসতো। গ্রামের প্রতিটি বাজারে ছিল হারিকেন মেরামত করার অস্থায়ী দোকান। তারা বিভিন্ন হাট বাজার ঘুরে ঘুরে হারিকেন মেরামতের কাজ করতেন। এছাড়া অনেকে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গিয়েও হারিকেন মেরামত করতেন। কিন্তু এখন আর হারিকেনের ব্যবহার তেমন একটা না থাকার ফলে হারিকেন মিস্ত্রীদেরও আর দেখা যায় না।
একসময় ছিলো যখন গ্রামের দোকানে কেরোসিন বিক্রির লাইন পরতো মাগরিবের নামাজের আগে, কেননা মহিলারা সন্ধ্যার আগেই হারিকেন প্রস্তুত করতো। রাত জেগে ধান ভানতো, ঢেঁকি চালাতো এই হারিকেনের আলোয়। তেল যখন  কমে আসতো তখন দেখা যেত আলোও কমে আসছে। তেলের উপর নির্ভর করতো আলোর পরিমাণ। কিন্তু আজ অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হ্নদয় নিয়ে বলতে হয় এক সময়ের আঁধারে আলোর সাথী হারিকেন বিদ্যুতের দাপটে হারিয়ে গেছে।এখন আর  হারিকেন দেখা যায় না। ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ। রাস্তা-ঘাট, হাঁট-বাজারে এখন বিদ্যুতের দাপট। বিজ্ঞানের এই আবিষ্কার নিঃসন্দেহে জাতির কল্যাণ বয়ে এনেছে। তবে হারিয়ে গেছে আমাদের ঐতিহ্য ও ইতিহাস।
গ্রামের পর গ্রাম এখন বিদ্যুতের আলোতে আলোকিত হয়ে গেছে। বিদ্যুতের ঝলকানিতে অজ পাড়া গ্রাম গুলো এখন পল্লী শহরে রুপান্তরিত হয়েছে। কাজেই সেকালের ঐতিহ্যবাহী হারিকেনের আলোর প্রয়োজন আর প্রয়োজন হচ্ছে না।বর্তমানে বৈদ্যুতিক বাতির ব্যাপক প্রসারে কমে গেছে হারিকেনের চল। এরই ধারাবাহিকতায় সারাদেশের মতো টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে হারিকেন। বিদ্যুতের প্রসার, বিদ্যুৎ চলে গেলে বিভিন্ন ধরনের চার্জার বাতির ব্যবহারে হারিকেনের তেমন একটা প্রয়োজন হয় না। তাই হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী হারিকেন।
এক সময় দেখা যেতো হারিকেন হাতে নিয়ে ডাকপিয়ন ছুটে চলেছেন গ্রামের পর গ্রামে। বৃদ্ধ থেকে শুরু করে সবাই রাতের বেলাই হারিকেন হাতে নিয়ে বের হতেন। হারিকেনের আলো গৃহস্থালির পাশাপাশি ব্যবহার হতো বিভিন্ন যানবাহনে। কিন্তু আধুনিকায়নে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক বাতিতে বাজার ভরপুর। যার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে রাত্রিকালীন আলোর একমাত্র উৎস ঐতিহ্যবাহী হারিকেন।
ওই সময় গ্রাম বাংলার মানুষ বিভিন্ন পদ্ধতিতে আলো জ¦ালাতো তার ভিতর হারিকেন ছিল সব থেকে বেশি প্রচলিত তার পাশাপাশি ,হ্যাসাক লাইট, কুপি (লম্প) লন্ঠন এ গুলো আলোর জন্য ব্যবহার করত বর্তমান বিজ্ঞানের যুগে এসে বিলুপ্ত হয়ে গেছে কালের সাক্ষী হারিকেন যা এখন আর চোখে পড়ে না, যদিও দেখা যায় সেটা ময়লা আবর্জনায়, গোয়াল ঘরে, নয়তো গাছের ডালে অনাদরে ঝুলছে যা এক সময় প্রতিদিন সন্ধ্যায় ঘরে ঘরে আলো  জ¦ালানোর জন্য ব্যবহার করা হত, জ¦ালানোর আগে যতœ সহকারে কাপড় দিয়ে  মুছে পরিষ্কার করে আলো জ¦ালানো হত। অনেক আগে থেকে মানুষ লন্ঠন কুপি আলো জ¦ালানোর কাজে ব্যবহার করত। তারপর হারিকেন আবিষ্কার হলে অনান্য আলোর কদর কমে হারিকেনের কদর বেড়ে গেল ওই সময় বিভিন্ন কোম্পানির হারিকেন তৈরি হলেও সব থেকে বায়োজিদ হারিকেনের বেশী কদর ছিল দামও ছিল বেশি পাড়ার কেহ হারিকেন কিনলে মানুষ দেখতে যেত, তারপর তৎকালিন প্রযুক্তিতে হ্যাছাক লাইট তৈরি হলে সেটার মূল্য বেশী হওয়ায় সবাই কিনতে পারতো না। তা ছাড়া  সেটা শুধু মাত্র বিয়ের বাড়ি গান বাজনা সহ বিভিন্ন বড় বড় অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা হত কিন্তু হারিকেন সর্বকাজে আলোর প্রয়োজনে ব্যবহার করত, তা ছাড়া ডাকপিয়নরা চিঠির বস্তা পিঠে নিয়ে রাতে দিনে ছুটে বেড়াতো কিন্তু হারিকেন থাকতো সাথে রাতের আধারে পথ চলার জন্য।
লেখাপড়ার জন্য হারিকেনের আলো ছিল উত্তম কারন হারিকেনের আলো চোখে লাগতো না তাতে চোখের কোন রকম ক্ষতি হত না। হারিকেন জ¦ালানোর জন্য কেরোসিন ব্যবহার করত। ওই হারিকেনে কাঁচের চিবনি ছিল যে কারনে প্রবল ঝড় বাদলে বাতাস ঢুকে হারিকেন নিভে যেতো না। শুধু গ্রামগঞ্জে নয় শহরেও বিদ্যুৎ আসার আগে হারিকেন ব্যবহার করা হত তাছাড়া আশির দশকের দিকেও জেলখানার পাহারা দেয়ার জন্য জেল পুলিশরা হাতে হারিকেন নিয়ে প্রবেশ করত সারারাত হারিকেন হাতে নিয়ে পাহারা দিত।
৫-৬ ইঞ্চি লম্বা ও কিছুটা ছড়াকারের মত এক ধরনের কাপড় ফিতা বা রেশা হিসেবে ব্যবহার করা হতো। আলো কমানো ও বাড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট একটি গিয়ার ছিল। হাতের সাহায্যে তা ঘুরিয়ে আলোর গতিবেগ কমানো ও বাড়ানো যেতো। রাতে ঘুমানোর সময় আলো কমিয়ে সারারাত হারিকেন জ্বালিয়ে রাখা হতো। তখন কুপি ছিল কয়েক প্রকার। একনলা, দুইনলা, একতাক, দুই তাকের, পিতল ও সিলভারের।
তবে সিলভার, টিন এবং মাটির তৈরি বাতির ব্যবহার ছিল খুব বেশি। বাতির নলে আগুন জ্বালানোর জন্য ফিতা বা রেশা হিসেবে ব্যবহার করা হতো ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো কিংবা পাটের সুতলি। চিকন আর লম্বা করে ৫-৬ ইঞ্চির দৈর্ঘ্যরে ওই ফিতা বা রেশা বাতির নল দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিতো। প্রতিদিন এর কিছু অংশ জ্বলে পুড়ে যেত। ফের পরের দিন আবার একটু উপরের দিকে তুলে দিতো।
এই বাতি দিয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা করতো। এছাড়াও রাতের সকল কাজ, যেমন রান্না-বাড়া, কুটির শিল্প, হস্তশিল্প, ধান মাড়ানোসহ সকল চাহিদা মেটানো হতো এই আলো দিয়ে। এখন আর চোখে পড়ে না হারিকেন ও বাতির কথা।
যারা শহর এলাকায় বাস করছেন বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম তো এখনো চোখে দেখেনি হারিকেন ও বাতির কথা। অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন কালের আবর্তে ডিজিটাল যুগে এই হারিকেন নামীয় বস্তুটি কোন এক সময়ে স্মৃতি যাদুঘরে দেখা দেখা যাচ্ছে অতিত স্মৃতি হয়ে।
বর্তমান যুগের ছেলে মেয়েদের কাছে হারিকেনের কথা বললে তারা অবাক হয়ে যায় এমন ছেলে মেয়েরা আছে তারা হারিকেন চোখে দেখা তো দুরের কথা নামও শোনে নি হারিকেন এখন মানুষের কাছে শুধুই স্মৃতি এর পর হারিকেনের স্থান হবে যাদুঘরে।
মনিরামপুর উপজেলার ঝাঁপা ইউনিয়নের হানুয়ার গ্রামের মৃত হাজারীলাল রায়ের বাড়ির জিয়েল গাছে একটি হারিকেন ঝুলতে দেখা গেছে। ওই পরিবারের কাছ থেকে জানা গেছে হারিকেনটা ব্যবহার করত হাজারী লাল নিজে গত ৩০/৩৫ বছর পূর্বে কিনে ছিল, স্থানীয় রাজগঞ্জ বাজারে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে রাতে আসা যাওয়া জন্য ব্যবহার গত তিন বছর পূর্বে তিনি মারা গেলে ওইটা আর কেহ ব্যবহার করার মত  না থাকায়  অনাদরে বাড়ির পাশে জিয়াল গাছে ঝুলিয়ে রেখেছে। তাদের কাছ থেকে জানা গেছে হারিকেনটা অনেক ভাংড়ী ব্যবসায়ীরা কেনার চেষ্টা করলে তারা বিক্রয় করতে চায়নি। কারন জানতে চাইলে তার সন্তানরা বলেন তাদের বাবার স্মৃতি হিসাবে রেখে দিয়েছে।    





« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft