শিরোনাম: মোরেলগঞ্জে ভিজিএফ’র চাল পাচ্ছেন ৪৩৫৮ জেলে পরিবার       যুবমৈত্রী নেতা রাসেলের মৃত্যুবার্ষিকী পালন       সেনাবাহিনী বিশ্বাসের প্রতীক: প্রধানমন্ত্রী       ‘ভারতে পর্যটন ভিসা চালু শিগগির’       করোনায় মারা গেলেন মধুখালী উপজেলা চেয়ারম্যান বাচ্চু       বিষাক্ত মদপানে কুষ্টিয়ায় তিনজনের মৃত্যু       হায়দরাবাদের দুর্দান্ত জয়       পদত্যাগ করলেন বার্সা সভাপতি       ফিফা প্রেসিডেন্ট করোনায় আক্রান্ত       পরাজয় এড়ালো রিয়াল মাদ্রিদ      
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ২০০ বছরের মানুষটি
অশোক কুমার রায়
Published : Friday, 25 September, 2020 at 11:52 PM

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
২০০ বছরের মানুষটিছোটবেলায় বাংলা অক্ষরজ্ঞানের জন্য যে বইগুলি সে সময় আমাদের হাতে এসেছিল তাদের মধ্যে ‘বাল্যশিক্ষা’, ‘আদর্শলিপি’ ও ‘বর্ণপরিচয়’ (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ) এর কথা আজও অনেকের মনে আছে। ‘বাল্যশিক্ষা’ ও ‘আদর্শলিপি’  বই দু’খানি রচনা করেছিলেন যথাক্রমে রামসুন্দর বসাক ও সীতানাথ বসাক। দু’ভাগে প্রকাশিত ‘বর্ণপরিচয়’ এর প্রণেতা ছিলেন উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
আজ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, সেই মহান পুরুষের ২০০ তম জন্মবার্ষিকী। ১৮২০ সালের এই দিনে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মেছিলেনে তিনি। তাঁর বাবার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মা ভগবতী দেবী। গ্রামে টোল খুলে শিশুদের সংস্কৃত পড়ানোই ছিল তাঁর পিতৃপুরুষের কাজ। বাবা ঠাকুরদাস সে কাজে গ্রামে আটকে না থেকে তার বাবা রামজয় তর্কভূষণের আগ্রহে কলকাতায় গিয়ে সামান্য ইংরেজি শিখেছিলেন উন্নত রোজগারের আশায়। ব্যর্থ হয়ে অবশেষে এক ধনী পরিবারে আশ্রয়লাভ করে সামান্য বেতনে তাদের খাতাপত্র লেখার কাজ করতেন। নিজে যথেষ্ট কষ্ট স্বীকার করে বেতনের বেশীটুকু বাঁচিয়ে গ্রামে পাঠাতেন সংসার প্রতিপালনের জন্য।
ঈশ্বরচন্দ্রের প্রকৃত নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। বিদ্যাসাগর ছিল তাঁর উপাধি। যা তিনি ছাত্রজীবনে কলকাতায় তাঁর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি সংস্কৃত কলেজ কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে বাৎসরিক পরীক্ষাগুলিতে কৃতিত্বপূর্ণ ফল লাভের জন্য পেয়েছিলেন। তবে তাঁর প্রণীত বইপত্রে তিনি ‘শ্রী ঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা’ নামে স্বাক্ষর করতেন।
বাল্যকালে গ্রামের পাঠশালায় লেখাপড়ার পর্ব শেষ হলে বাবা ঠাকুরদাস ছেলেকে উচ্চ শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে কলকতায় নিজ আশ্রয়ে নিয়ে যান। বীরসিংহ গ্রাম থেকে কলকাতা ছিল ২৬ ক্রোশ অর্থাৎ ৫২ মাইলের পথ। সম্পূর্ণ পায়ে হেঁটে মাঝে তিনরাত বিভিন্ন আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে চারদিনের মাথায় বাবার সাথে কলকাতায় পৌঁছে ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র। এই দীর্ঘ পথ হাঁটতে মাঝে মাঝে বাবার কাঁধে উঠতে হয়েছিল তাঁকে।
১৮২৯ সালে বিদ্যাসগরকে কলকাতার সরকারি সংস্কৃত কলেজের স্কুল বিভাগে ভর্তি করা হয়। ঐ কলেজ তখন ছিল কিছু ইংরেজিসহ সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার সর্বোচ্চ শিক্ষালয়। বাবার দারিদ্রপূর্ণ আশ্রয়ে থেকে বিদ্যাসাগরকে অত্যন্ত কৃচ্ছতার মধ্য দিয়ে লেখাপড়া শিখতে হয়েছিল। ১৮২৯ থেকে ১৮৪১ পর্যন্ত তিনি সংস্কৃত কলেজের সকল শ্রেণিগুলি অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এর মধ্যে ১৮৩৯ সালে হিন্দু-ল কমিটির পরীক্ষায় পাশ করে হিন্দু আইনের উপর প্রাথমিক স্তরের আদালতে বিচার করার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু বিচারকের চাকরী গ্রহণ করেননি ঈশ্বরচন্দ্র।
১৮৪১ সালে বিদ্যাসাগর কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগের সেরেস্তাদার পদে চাকরীতে যোগ দেন। ঐ কলেজে তখন বিলেত থেকে আগত নবীন ইংরেজ আই সি এস দের আগামী কর্মজীবনে প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার জন্য এদেশীয় ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, আইন ইত্যাদি সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া হত। ১৮৪৬ সালে সরকারের শিক্ষা পর্ষদ বিদ্যাসাগরকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে ছাড়িয়ে সংস্কৃত কলেজের এ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারির দায়িত্বে নিয়োজিত করে। ১৮৪৭ সালে কলেজের সেক্রেটারি রসময় দত্ত এর সাথে ছাত্রদের শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে মতভেদ হলে বিদ্যাসাগর সে চাকরী থেকে পদত্যাগ করেন।
সে সময় বাংলা ভাষায় পাঠ্য পুস্তকের খুবই অভাব ছিল। চাকরী ছেড়ে বিদ্যাসাগর ইংরেজ শিক্ষা কর্মকর্তাদের পরামর্শে বাংলা পাঠ্য পুস্তক রচনায় লেগে যান। শুধু তাই নয়, সে সময় তিনি সংস্কৃত কলেজে তার সহকর্মী ও বন্ধু মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সাথে মিলে ‘সংস্কৃত যন্ত্র’ নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করে মুদ্রণ ব্যবসায়ে নেমে পড়েন। ১৮৪৭ সালে তিনি ঐ প্রেস থেকে হিন্দি কাহিনীর অনুবাদ করে বাংলায় ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ নামে একটি বই বের করে সকল মহলে সাড়া ফেলে দেন। তারপর থেকে বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষায় পাঠ্যপুস্তক এর প্রয়োজনে একে একে ‘জীবন চরিত’ (১৮৪৯), বোধোদয় (১৮৫১),ঋজুপাঠ (১৮৫১), শকুন্তলা (১৮৫৪), কথামালা (১৮৫৬), চরিতাবলী (১৮৫৭), ভ্রান্তি বিলাস (১৮৬৯), সংস্কৃত ব্যাকরণ কৌমুদী (১৮৫৩), সহ অনেক বই প্রকাশ এবং বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এক নবযুগের সুচনা করেন। ১৮৫৫ সালে তাঁর প্রণীত বর্ণপরিচয় (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ) এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শিশুদের বাংলা বর্ণ, শব্দ, বানান ও উচ্চারণের আদর্শ বই হিসেবে লাখো লাখো বাঙালীর ঘরে সমাদৃত হয়েছে।
এর মধ্যে ১৮৪৯ সালে সরকারি শিক্ষা কর্তৃপক্ষের অনুরোধে বিদ্যাসাগর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের হেড রাইটার পদে যোগ দেন। ১৮৫০ সালে তাঁকে ঐ কলেজ থেকে নিয়ে এসে পুনরায় সংস্কৃত কলেজে সাহিত্য শ্রেণির অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। আবার ১৮৫১ সালে তাঁকে সংস্কৃত কলেজের অস্থায়ী সেক্রেটারি এবং কিছু দিন পর পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষের পদে বসান হয়। অধ্যক্ষ হয়ে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের রীতিনীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করেন। ১৮২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে সে পর্যন্ত কলেজটিতে কেবলমাত্র ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য সম্প্রদায়ের ছাত্রদের পড়ার অনুমতি ছিল। অধ্যক্ষ হয়ে বিদ্যাসাগর সেই সাম্প্রদায়িক নিয়ম ভেঙ্গে শূদ্রসহ সকল হিন্দু ছাত্রদের লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি করেন। ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি প্রথম পরিচালনা পরিষদের অন্যতম সদস্য তথা ফেলো নির্বাচিত হন। ১৮৫০ সালে জন ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন নামে এক ব্রিটিশ শিক্ষা কর্মকর্তা তাঁর নিজস্ব উদ্যোগে কলকাতায় ভারতবর্ষের প্রথম নারী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর তিনি মারা গেলে বিদ্যাসগারকে ঐ বিদ্যালয়ের অনারারি সেক্রেটারি নির্বাচিত করা হয়। সেই গালর্স স্কুলটিকে বিদ্যাসাগর কয়েক বছরের মধ্যে বিখ্যাত মহিলা কলেজে পরিণত করেন। সেটি আজও বেথুন কলেজ নামে কলকাতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনের আট বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৮৫৮ সালে সরকারি শিক্ষা বিভাগের এক উর্দ্ধতন কর্মকর্তার সাথে ছাত্রদের পাঠ্যসূচি ও শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে মতান্তর হলে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। কর্মজীবনে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজ থেকে দুইবার পদত্যাগ করেন। অথচ দুইবারই কর্তৃপক্ষ তাঁকে তাঁর পদত্যাগ পত্র ফিরিয়ে নেবার অনুরোধ করলে তিনি তাদের সে অনুরোধ ফিরিয়ে দেন।
সরকারি শিক্ষা দপ্তর ১৮৫৫ সালে বাংলায় ‘আধুনিক বঙ্গ বিদ্যালয়’ নামে এক প্রকার মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। গ্রামে গ্রামে ঘুরে উপযোগী স্থান নির্বাচন করতে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে ঈশ্বরচন্দ্রের নাম উঠে আসে। সে সময়ে তিনি সরকারি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ।এক ব্যক্তিকে দুটি চাকরীতে নিয়োগ নিয়ে কর্তৃপক্ষের মধ্যে মতভেদের পরও তাঁকে স্পেশাল এ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি হিসেবে পৃথক বেতনসহ নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি বাংলার চারটি জেলায় পায়ে হেঁটে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে মোট ২০টি আদর্শ বঙ্গ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সে স্কুলগুলিতে ছেলেরা সনাতন পদ্ধতির লেখাপড়া ছেড়ে আধুনিক ইউরোপীয় পদ্ধতির শিক্ষালাভের সুযোগ পায়। নারী শিক্ষার জন্য বিদ্যাসাগর ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। ১৮৫৭ সালে বাংলার বিভিন্ন জেলায় বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য বিদ্যাসাগর শিক্ষা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক উপরোক্ত একই জাতীয় দায়িত্ব পেয়েছিলেন। সে সময়ে ১৮৫৭ থেকে ১৮৫৮ সালের মধ্যে হুগলী, মেদিনীপুর, নদীয়া ও বর্ধমান জেলা ঘুরে তিনি ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় গড়ে তোলেন।
চাকরী ছাড়ার পর ১৮৬৪ সালে একটি ট্রেনিং স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে বিদ্যাসাগর তাকে কলকাতা মেট্রোপলিটন কলেজ নাম দিয়ে একটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন । পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক নাম পরিবর্তন করে বর্তমানে সেটিকে ‘বিদ্যাসাগর কলেজ’ করা হয়েছে। এছাড়া তিনি নিজ গ্রামে একটি বালক বিদ্যালয় ও তাঁর মায়ের নামে নিজ খরচে একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
উনিশ শতকে বাংলার রেনেসাঁর অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বাংলায় শিক্ষার আধুনিকায়ন ও বিস্তার, এবং নারী শিক্ষার প্রবক্তাই শুধু তিনি ছিলেন না, সেই সাথে তিনি ছিলেন এক মহান সমাজ সংস্কারক। ইতিপূর্বে রাজা রামমোহনের বহুমুখী চেষ্টায় হিন্দু সমাজের মধ্যে প্রচলিত নারীর প্রতি সবচেয়ে অমানবিক বিধান ‘সতীদাহ প্রথা’ ১৮২৯ সালে সরকারি আইনবলে নিষিদ্ধ হয়। এছাড়া আরো কিছু কুসংস্কার সে সমাজে প্রচলিত ছিল।   
সে যুগে হিন্দু সমাজব্যবস্থায় বিধবা নারীদের পুনরায় বিবাহের কোন প্রচলন ছিল না। বিধবা সে যে বয়সেরই হোক না কেন এই কুপ্রথা তাকে সারাজীবন বিধবা থাকার গ্লানি ভোগ করতে বাধ্য করত। হিন্দু আইনে একেতো নারীর পিতা বা স্বামীর সম্পত্তিতে কোন অধিকার নেই। তার ওপর বিধবা হলেতো কথাই নেই। তখন বাল্য বয়সে বিয়ের প্রচলন থাকায় স্বামীর মৃত্যুর কারণে হাজার হাজার নারীকে তরুণী বা যুবতী অবস্থায় অকাল বৈধব্যের শিকার হয়ে স্বামী অথবা পিতার বাড়ীতে লাঞ্ছনাময় জীবনকে বেছে নিতে হত। কিন্তু তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ- সে পুত্রবধূ হোক, আর কন্যাই হোক আপন নারীর এই অবমাননায় মোটেই বিচলিত ছিল না। সমাজপতিদের প্রচারণায় সাধারণ মানুষ এই অমানবিক বিধানকে অলঙ্ঘনীয় ধর্মীয় বিধান হিসেবে মনে করত। অসহায় বিধবাকুলের চাঁপা আর্তনাদে বিদ্যাসাগরের দয়াদ্র মন কেঁদে ওঠে। তিনি সরকারি আইনের মাধ্যমে বিধবাবিবাহ প্রচলন করার সংগ্রামে নেমে পড়েন। প্রথমে হিন্দুশাস্ত্র ঘেঁটে দেখেন এই কুপ্রথার অলঙ্ঘনীয়তা সম্পর্কে। পেয়ে যান বিধবাবিবাহের সপক্ষে বিধান। শুরু হয় রক্ষণশীল শাস্ত্রীয় পন্ডিতদের সাথে তাঁর তর্কযুদ্ধ। এ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রবন্ধ লিখে চলেন একের পর এক। বিধবাবিবাহের সপক্ষে পরপর দুটি বই লিখে তা হাজার হাজার কপি প্রকাশ করে অসচেতন সমাজকে নাড়িয়ে দেন। পরে শুরু করেন রাজদরবারে দেন দরবার। বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধে ক্ষেপে ওঠে রক্ষণশীল কুলীন সমাজ। পত্র পত্রিকায় অজস্র গাল-মন্দসহ লেখালেখি শুরু হয় তাঁর বিরুদ্ধে। বিদ্যাসাগরকে ব্যঙ্গ করে গান রচিত হয়। তবুও তিনি নিজ সংকল্পে অবিচল থেকে আন্দোলন চালিয়ে যান। একসময় ৯৮৬ জন ব্যক্তির স্বাক্ষরসহ এক আবেদনপত্রে সরকারের নিকট বিধবাবিবাহের সপক্ষে আইন পাশের দাবী জানান। বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধবাদীরা ছিল সংখ্যায় অধিক। তারা ৩৩ হাজার লোকের স্বাক্ষর সম্বলিত স্মারকলিপিতে বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। শুরু হয় সরকারের উচ্চ মহলে এর পক্ষে বিপক্ষে বিবিধ আলোচনা। শেষ পর্যন্ত বিদ্যাসাগরের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালের জুলাই মাসে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক হিন্দু বিধবাবিবাহ আইন পাশ হয়। সে সময়ে নারী নিপীড়ক আরেকটি কুপ্রথা ছিল হিন্দু পুরুষের বহুবিবাহ প্রথা।
প্রাচীন রীতি অনুযায়ী হিন্দু সমাজ সব সময় একই বর্ণের পাত্র-পাত্রীর মধ্যে বিবাহকে সমর্থন করে। বিদ্যাসাগরের যুগে অসবর্ণ অর্থাৎ ভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিবাহকে পাপাচার বলে গণ্য করা হত। এই নিয়মের ব্যত্যয় হলে রক্ষণশীল সমাজপতিরা তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিত। তখন ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় কুলীন-অকুলীন দুইভাগে বিভক্ত ছিল। সমাজে কুলীন ব্রাহ্মণদের মধ্যে বিবাহোপযুক্ত পাত্রের সংখ্যা কম থাকায় ঐ সমাজের বিবাহযোগ্যা কন্যাদের উপযুক্ত পাত্রের সাথে বিবাহ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ওদিকে বিধানমতে ঘরে অনূঢ় কন্যা থাকাকে এক মহাপাপ বলে গণ্য করা হত। অনেক সময় বয়স্কা অবিবাহিতা মেয়ের বাবাকে একঘরে হয়ে নিজগ্রাম ত্যাগ করতে হত। সেকালে কন্যার বিয়ের জন্য পাত্রসংকট এমন পর্যায়ে পৌঁচ্ছেছিল যে অভিশপ্ত হওয়ার বিপদ থেকে পরিত্রাণের আশায় যোগ্য-অযোগ্য, বিবাহিত-অবিবাহিত, যুবক-বৃদ্ধ ইত্যাদি না বিচার করেই কুলীন ব্রাহ্মণ পিতারা তাদের ঘরের অনূঢ় কন্যাদের কুলীন ব্রাহ্মণ পাত্র পেলেই যৌতুকসহ বিয়ে দিয়ে দিতে থাকেন। এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর মানবতাহীন কুলীনেরা নির্বিচারে ঘরে স্ত্রী সন্তান থাকা সত্ত্বেও যৌতুকের লোভে বহুবিবাহে নেমে পড়ে। মুখে থাকে তাদের কন্যাদায়গস্ত পিতাদের মহাপাপ থেকে উদ্ধারের কপট শ্লোগান।  
একাজে ৬০ থেকে ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধরাও বসে থাকে না। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, ঘরে দুই তিনটা স্ত্রী ও তাদের ছেলেমেয়েদের অভূক্ত রেখে এক শ্রেণির কুলীন ব্রাহ্মণ বৃদ্ধরা নৌকা ভাড়া করে বেরিয়ে পড়ে গ্রামে গ্রামে অনূঢ় কুলীন মেয়েদের বিয়ে করে তাদের তথাকথিত পাপ থেকে মুক্তি দিতে। এক এক যাত্রায় একটার পর একটা বিয়ে করে সেই নববধূদের সাথে দু’চারদিন কাটিয়ে তাদেরকে যার যার বাপের বাড়ীতে রেখে শুধুমাত্র পণের টাকা ও যৌতুক নিয়ে একসময় বাড়ি ফিরে আসতো। পরের বছর আবার বেরিয়ে কিছু নতুন নতুন মেয়ে বিয়ে করে একই কায়দায় যৌতুক শিকার করতো, সেই সাথে পূর্বেকার শ্বশুর বাড়ীগুলি ঘুুরে বাৎসরিক খাওয়াপরার খরচ বা ধানচাল নিয়ে নৌকায় উঠতো। রক্ষণশীল সমাজপতিদের সমর্থনে কুপ্রথাটি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে দেখা যায় বিবাহযোগ্যা মেয়েদের জন্য বর না পেয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুপথযাত্রী কুলীনদের সাথে মেয়ে বিয়ে দিয়ে মেয়ের পিতা মাতা নীরব অশ্রুপাতের মধ্য দিয়ে নির্দয় সেই সামাজিক বিধান রক্ষা করছেন।
নারী নিষ্পেষণের এই জঘন্য বিধানের প্রতি বিদ্যাসাগর এত বিক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে সে সময় তিনি বাংলার কয়েকটি অঞ্চল ঘুরে সেখানকার কতিপয় নির্লজ্জ ব্রাহ্মণ সমাজপতির ব্যক্তিগত বহুবিবাহের তালিকা প্রস্তত করে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। সে তালিকায় একটি গ্রামের সাতজন কুলীন ব্রাহ্মণের তথ্যে দেখা যায় তাদের বয়স ৫০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে। তারা এক একজন সর্বোচ্চ ৭০ থেকে ৪০ জন করে অনূঢ় কন্যাকে বিয়ে করে তাদের নরকের দ্বার থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। বিদ্যাসাগর তাঁর যুক্তি ও লেখনির মাধ্যমে এই ঘৃণিত প্রথা নিষিদ্ধ করার আন্দোলনে এগিয়ে আসেন। এবারও শাস্ত্র থেকে বিধান সংগ্রহ করে তা পুস্তকাকারে প্রকাশ করেন। রক্ষণশীলরা যথারীতি বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধে নামে। শুরু হয় সরকারি মহলে দেনদরবার। কিন্তু  সময়টা বিদ্যাসাগরের অনুকূলে ছিলনা। সেটা ছিল ১৮৫৭ সাল। সিপাহী বিদ্রোহের বছর। মহাবিদ্রোহের প্রবল আঘাতে তখন ইংরেজ শাসকরা ভীত সন্ত্রস্ত। তারা স্পর্শকাতর এই বিষয়ে হাত দিতে ভয় পেয়ে যায়। ফলে বিদ্যাসাগরের বহুবিবাহ প্রথা বিরোধী দাবী আইনগত স্বীকৃতি পেতে ব্যর্থ হয়। তবে পরবর্তীকালে যতদিন তিনি কর্মক্ষম ছিলেন সে আন্দোলন চালিয়ে যেতে পিছুপা হননি।
অভাবগ্রস্ত ও আর্তজনের প্রতি দয়া ছিল বিদ্যাসাগরের আর একটি মহৎ গুণ। সেকারণে তাঁকে অনেকে দয়ারসাগর বলে অভিহিত করেছেন। ১৮৬৫ সালে মারাত্মক খরার কারণে দেশে দুর্ভিক্ষ হলে বিদ্যাসাগর তাঁর নিজ গ্রামে অন্নছত্র খুলে স্বীয়গ্রামসহ আশেপাশের অনেক গ্রামের অনাহারী নরনারীকে কয়েক মাস ধরে আহার যুগিয়েছিলেন। ১৮৬৯ সালে বর্ধমান জেলায় ম্যালেরিয়ার প্রকোপে মাহামারী হয়। বিদ্যাসাগর সেখানে উপস্থিত থেকে নিজ খরচে  তাঁর ভাড়া করা বাসায় ডাক্তার বসিয়ে মানুষ বাঁচাবার ব্যবস্থা করেছিলেন। বিশেষ করে এক মুসলমান পাড়ায় অবস্থার অবনতি ঘটলে তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে রোগী বের করে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। সারাজীবনে বিদ্যাসাগর তাঁর অনেক পরিচিতজন, সহকর্মী  ও বন্ধুবান্ধবদের অসুখ বিসুখ ও অভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে গেছেন।
বিশেষ করে বাংলার মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়ে অর্থাভাবে ফ্রান্সে যেয়ে স্ত্রী সন্তানসহ চরম বিপদে পড়েছিলেন। সংসারের সব কিছু বিক্রি করেও অভাব না মেটায় ভয়ঙ্কর ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কবির জেলে যাবার উপক্রম হয়। সে বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য মাইকেল বিদ্যাসাগরকে পরপর কয়েকটি চিঠি লেখেন। বিদ্যাসাগর প্রথমে নিজ থেকে দেড় হাজার, পরে ধার করে আট হাজার এবং সবশেষে আরো বারো হাজার টাকা পাঠিয়ে তাঁকে উদ্ধার করেছিলেন। সেই টাকা পেয়ে মধুসূদন ফ্রান্স থেকে লন্ডনে ফিরে গিয়ে ব্যারিস্টারি পড়ে দেশে ফিরে আসেন। ভালবেসে এতগুলি টাকা দিয়ে অন্যের উপকারের এমন দৃষ্টান্ত তখনকার সমাজে ছিল বিরল ঘটনা। যদিও মধুসূদন দেশে ফিরে এসে তাঁর পৈত্রিক জমির পত্তনিদারের কাছ থেকে জমি উদ্ধার করে তা বিক্রি করে বিদ্যাসাগরের সে ঋণ পরিশোধ করেছিলেন। বিদ্যাসাগর পরিচিত অনেক অভাগ্রস্ত লোককে মাসে মাসে মাসোহারাও দিতেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমগ্র কর্মকাণ্ডের মধ্যে বাংলা ভাষায় ছাত্রোপযোগী পাঠ্যপুস্তক রচনা, বাংলা বর্ণের (অক্ষর) পুনর্বিন্যাস সাধন ও ছাপাখানায় তার প্রয়োগ এবং বাংলা ভাষায় আধুনিক গদ্য সাহিত্যের বিনির্মাণ ছিল সুবিশাল মহৎ কীর্তি।
বিদ্যাসাগরের পূর্বে বাংলা বর্ণমালায় ১৬ স্বর ৩৪ ব্যঞ্জন মিলে মোট ৫০টি অক্ষর ছিল। সংস্কৃত বর্ণমালার ন্যায় সে সময় বাংলা বর্ণমালায় দীর্ঘ-ঋ কার (ঋৃ) এবং দীর্ঘ ৯ কার (৯৯) ছিল। বিদ্যাসাগর অপ্রয়োজনীয় ঐ অক্ষর দুটিকে বাংলা বর্ণমালা থেকে বাদ দেন। তখন অনুস্বার (ং) ও বিস্বর্গ (ঃ) স্বরবর্ণের অন্তর্গত ছিল। তিনি এ দুটি অক্ষরকে ব্যাঞ্জন বর্ণের অন্তর্ভূক্ত  করেন। সেই সাথে চন্দ্রবিন্দু ( ঁ) কে আলাদা একটি ব্যাঞ্জনবর্ণ বলে নিরূপণ করেন।  
তখন সংস্কৃত বা হিন্দি বর্ণমালার ন্যায় বাংলা বর্ণমালায় ‘য়’ ‘ড়’ ও ‘ঢ়’ এর উপস্থিতি ছিলনা। শব্দের উচ্চারণে এদের আলাদা অস্তিত্ব থাকলেও তখন য দিয়ে য ও য়, ড দিয়ে ড ও ড় এবং ঢ দিয়ে ঢ ও ঢ় এর উচ্চারণ করা হত (সংস্কৃত ও হিন্দি ভাষায় তা এখনও হয়)। বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষায় এই উচ্চারণগুলি পৃথক বর্ণের মাধ্যমে সহজ করার জন্য এক বৈপ্লবিক কাজ করেন। তিনি য, ড এবং ঢ এই তিনটি বর্ণের নীচে একটি করে ফোঁটা (.) দিয়ে পৃথক তিনটি বর্ণ তৈরি করে বাংলা বর্ণমালায় সংযুক্ত করে বাংলা উচ্চারণের ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করেন। তাঁর এই বৈপ্লবিক বিনির্মাণকে আজও আমরা সমগ্র বাঙালীরা ধারণ করে চলেছি। সেই থেকে বাংলা বর্ণমালা স্বরবর্ণ ১২ এবং ব্যঞ্জনবর্ণ ৪০, মোট ৫২ অক্ষরে পরিণতি লাভ করে। তবে বেশ কিছুকাল আগেই বিদ্যাসাগরের ১২টি স্বরবর্ণ থেকে ‘৯’ বর্ণটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যাসাগর ছিলেন আধুনিক বাংলা গদ্যের প্রথম নির্মাতা। পণ্ডিতদের গবেষণায় দেখা গেছে উনিশ শতকের একেবারে প্রথমভাগ ছিল বাংলা গদ্যের উদ্ভবকাল। তার আগে বাংলা গদ্যের যে সকল নমুনা পাওয়া যায়, সেগুলি ছিল মানুষের দৈনিন্দন কাজে লেখা চিঠিপত্র এবং বিভিন্ন প্রকার দলিল দস্তাবেজ, উইল, চুক্তিপত্র ইত্যাদি। আধুনিক বাংলা গদ্যের সাথে ছিল তার প্রচুর অমিল। ইংরেজরা এদেশে শাসনকাজ পরিচালনার প্রয়োজনে বাংলাসহ এদেশীয় ভাষাগুলি শিখতে বাধ্য হয়। একাজে তারা এদেশীয় মুনশীদের সাহায্য নেয়।
শাসকবর্গের বিভিন্ন বক্তব্য প্রচার এবং লেখার মাধ্যমে এদেশীয় জনগণের সাথে ভাববিনিময় ইত্যাদি কাজে বাংলা গদ্যের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এসময় হ্যালহেড, ফারস্টার, ডানকান প্রভৃতি বাংলা জানা ইংরেজ পণ্ডিতগণের হাত দিয়ে লিখিত বাংলা গদ্যের যাত্রা শুরু হয়। এক্ষেত্রে ইংরেজ ব্যাপিস্ট মিশনারী উইলিয়াম কেরী ও তার মুনশী রামরাম বসুর প্রচেষ্টার কাহিনী ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
অপরদিকে বাংলাভাষীদের মধ্যে রাজা রামমোহন রায়, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয় কুমার দত্ত, প্যারিচাঁদ মিত্র, মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কার, প্রসন্ন কুমার সিংহ, মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রভৃতি ব্যক্তিগণ পত্রিকা প্রকাশ, পুস্তক রচনাসহ অন্যান্য প্রয়োজনে বাংলা গদ্য রচনায় এগিয়ে আসেন।
এছাড়া ১৮০০ সালে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার পর এর ছাত্রদের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে বাংলায় বই লেখার প্রয়োজনে বাংলা গদ্যের প্রকৃত যাত্রা শুরু হয়। ঐ কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে মান সম্পন্ন পাঠ্যপুস্তক রচনার নিমিত্তে ঈশ্বরচন্দ্র বাংলাগদ্য রচনায় প্রবৃত্ত হন। বিদ্যাসাগরের আগে এ  পর্যন্ত যে বাংলাগদ্য প্রচলিত ছিল সেগুলি ছিল, এব্ড়ো থেব্ড়ো, খটখটে অর্থাৎ সে গদ্যে বিন্যস্ত পদ বা শব্দগুলির মধ্যে নিয়মতান্ত্রিকতা ছিলনা এবং তা ছিল যান্ত্রিকতা দোষে দুষ্ট। ঈশ্বরচন্দ্রই বাংলা গদ্যকে প্রথম সাঁজিয়ে তাকে রূপ-রস দান তথা ছন্দময় করে গড়ে তোলেন। সে সময়ে তাঁর-‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ ‘সীতার বনবাস’ ‘জীবন চরিত’ ‘শকুন্তলা’ ‘কথামালা’ এমনকি ‘বর্ণপরিচয়’ বই দু’টির শেষভাগের শিশু উপদেশমূলক ছোট ছোট কথিকায় যে সুললিত বাক্য বিন্যাসের পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল- ইতিপূর্বে তা আর কারো লেখায় ফুটে ওঠেনি এবং যা আজকের দিনেও তুলনাহীন। তাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকেই প্রামাণ্য গদ্য সাহিত্যের রূপকার বলা হয়। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- “তাঁহার প্রধান কীর্তি বঙ্গভাষা। ........বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন। তৎপূর্বে বাংলায় গদ্য সাহিত্যের সূচনা হয়েছিল, কিন্তু তিনিই সর্বপ্রথম বাংলা গদ্যে কলানৈপূণ্যের অবতারণা করেন। ......গদ্যের পদগুলির মধ্যে একটা ধ্বনি সামঞ্জস্য স্থাপন করিয়া, তাহার গতির মধ্যে একটি অনতিলক্ষ্য ছন্দঃশ্রোত রক্ষা করিয়া, সৌম্য এবং সরল শব্দগুলি নির্বাচন করিয়া, বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যেকে সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতা দান করিয়াছেন।”
বাংলা ভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচনা এবং তা পরম মমতায় সম্পাদনা ও ছাপার ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের যে কি অনুরাগ ছিল তার পরিচয় পাওয়া যায় চর্যাপদের (বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন) আবিষ্কর্তা এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আরেক পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের একটি বর্ণনা থেকে [১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ৬৭ বছর বয়সে কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের সর্বপ্রথম অধ্যক্ষের পদে প্রায় চার বছর (১৯২১-২৪) চাকরী করেছিলেন]।
সময়টা ছিল ১৮৭৮। জীবনের শেষদিকে এক সময় বিদ্যাসাগর কলকাতার নাগরিক সমাজ ও গ্রামের বাড়ীর সংস্রব ছেড়ে কর্মাটারে হতদরিদ্র সাঁওতালদের সাথে দিন কাটাচ্ছেন। তখন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মাহশয় তাঁর এক সঙ্গীকে নিয়ে লক্ষেèৗ যাওয়ার পথে এক রাত বিদ্যাসাগরের আতিথ্য গ্রহণ করেন। রাত শেষে সকালে উঠে শাস্ত্রী মাহশয় যা দেখলেন তা এভাবে বর্ণনা করেছেন।
...................বিদ্যাসাগর মহাশয় বারান্দায় পায়চারি করিতেছেন এবং মাঝে মাঝে টেবিলে বসিয়া কথামালার কি বোধোদয়ের প্রুফ দেখিতেছিলেন। প্রুফে বিস্তর কাটাকুটি করিতেছেন। যেভাবে প্রুফগুলি পড়িয়া আছে, বোধ হইল, রাত্রেও তিনি প্রুফ দেখিয়াছেন। আমি বলিলাম কথামালার প্রুফ আপনি দেখেন কেন, আর রাত জেগেই বা দেখেন কেন? তিনি বলিলেন ভাষাটা এমন একটা জিনিষ, কিছুতেই মন স্পষ্ট হয় না; যেন আর একটা শব্দ পাইলে ভাল হইত; তাই সর্বদা কাটাকুটি করি। ভাবিলাম বাপরে বাপ, এই বুড়া বয়সেও ইঁহার বাংলার ইডিয়মের ওপর এত নজর.........।”
কঠোর নৈতিকতার অধিকারী ছিলেন বিদ্যাসাগর। বিধবাবিবাহের সংকল্পে অটল থেকে পরিবারের সদস্যদের বিরোধিতা সত্ত্বেও নিজের একমাত্র ছেলে নারায়ণ চন্দ্রকে এক বিধবা যুবতীর সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এছাড়া নানা বিষয়ে মতানৈক্যের ফলে এক সময় অনেক বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের সাথে তাঁর সম্পর্কছেদ হয়। জীবনের শেষদিকে এসে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এক সময় একমাত্র ছেলে নারায়ণ চন্দ্র তাঁর অবাধ্য হলে বিদ্যাসাগর তাঁর  নিজ সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে উইলের মাধ্যমে নারায়ণ চন্দ্রকে বঞ্চিত করেন। জীবনের শেষদিকে শহর ছেড়ে মাঝে মাঝে নিভৃত অঞ্চলে যেয়ে বাস করতে থাকেন। কয়েকটি জটিল অসুখ তাঁর দেহে বাসা বাঁধে। অবশেষে সব চিকিৎসা প্রচেষ্টা বিফল করে ১৮৯১ সালে কলকাতায় নিজ বাড়ীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
তবে এতগুলি মহৎ গুণের নায়ক যিনি, সেই বিদ্যাসাগরও ত্রুটির উর্ধ্বে ছিলেন না। সে সময়ে বাংলা তথা সমগ্র ভারতবাসীর দুঃখময় জীবনের জন্য দায়ী ছিল যে ইংরেজ শাসন, তার বিরুদ্ধে বিদ্যাসাগর কোথাও কিছু বলেননি। বরং ইংরেজ শাসনকে ভারতবাসীর জন্য মঙ্গলকর মনে করেছেন তিনি। ইংরেজের কুখ্যাত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সপক্ষে ছিল তাঁর অভিমত। ১৮৫৭ সালে ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহের কালে তিনি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এক জায়গায় তিনি লেখেন “কিন্তু হতভাগ্য এই দেশে দুর্ভাগ্যক্রমে সেই সময় রাজ বিদ্রোহ উপস্থিত হইল। রাজ পুরুষেরা বিদ্রোহের নিবারণ বিষয়ে ব্যাপৃত রহিলেন। বহু বিবাহের নিবারণ বিষয়ে আর তাহাদের মনযোগ দিবার অবকাশ রহিল না।” ১৮৮৫ সালে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর এর প্রথম সভাপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপধ্যায় কংগ্রেসে যোগ দিতে তাকে অনুরোধ করেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর সে অনুরোধ ফিরিয়ে দেন।
উনিশ শতকের প্রথম ভাগের সেই সংস্কারাচ্ছন্ন যুগে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে যার জন্ম, তার ওপর সংস্কৃতের ন্যায় এক ধ্রুপদী ভাষার এত বড় পণ্ডিত হয়ে গতানুগতিক জীবনকে বেছে নেওয়া যার পক্ষে সমীচিন ছিল, কিন্তু অসামান্য মনীষা ও প্রগতিশীল উদারতাকে আশ্রয় করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়ন, আধুনিক শিক্ষার বিস্তার, সর্বোপরি সমাজ সংস্কারের অগ্নিমশাল হাতে নিয়ে দৃপ্তপদভরে যে মানুষটি ছুটে বেড়িয়েছেন  শহর থেকে গ্রামে - গ্রাম থেকে শহরে, সেই মহাপুরুষকে তাঁর জন্মের ২০০ বছরের এই আলোকময় দিনে অন্তরনিঃসৃত শ্রদ্ধার্ঘ্য ছাড়া আর কি দিয়ে অভিষিক্ত করব তা আমাদের জানা নেই।
লেখকঃ রাজনীতিক ও সংস্কৃতিসেবী





« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft