শিরোনাম: মণিরামপুরে ফের ৭ জনের করোনা শনাক্ত       দেশে একদিনে সর্বোচ্চ সুস্থ ৪৩৩২ জন       ত্রিপুরায় নতুন রাজনৈতিক দল আসছে        চৌগাছা ঘূর্ণিঝড়ে সব হারানো আলামীন পেলেন বাসগৃহ       চট্টগ্রামে একদিনে রেকর্ড ৬ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ছাড়ালো ৯ হাজারে       অভয়নগরে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানসহ ৬জন করোনায় আক্রান্ত       খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল করলে কোনো ছাড় নেই : তাপস       চেম্বার কোর্ট চলবে ২৮ জুলাই পর্যন্ত       জয়পুরহাটে গর্ভবর্তী মায়েদের বিনামুল্যে চিকিৎসা দিলো সেনাবাহিনী       করোনায় মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা সংকটাপন্ন : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা      
করোনাভাইরাস এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য গবেষণা
ড. মো. গোলাম ছারোয়ার
Published : Wednesday, 27 May, 2020 at 10:59 AM
করোনাভাইরাস এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য গবেষণাঢাকা মেডিকেল কলেজের একজন নেতৃস্থানীয় অধ্যাপক আমার সঙ্গে একমত হলেন আমাদের স্বাস্থ্যখাতের একটি বড় ও প্রচলিত দুর্বলতা হলো এর তাৎক্ষণিক তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থাপনা এখনও রক্ষণশীল যুগের। তথ্যপ্রযুক্তি বা ডিজিটাল প্রযুক্তি যতই এগিয়েছে এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের স্বাস্থ্যতথ্য, রোগশোকের বিবরণ, ওষুধ প্রয়োগের তথ্য, নিরাময়ের তথ্য, স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তিগত খরচ ও রাষ্ট্রের খরচ, হাসপাতাল এবং পরিচর্যায় ব্যয়, শিক্ষা ও গবেষণা তথ্য এবং সর্বোপরি মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থেকে উৎপাদনশীলতায় তার সংযোগ, অবদান কোনো তথ্যই হালনাগাদ পাওয়ার উপায় নেই। স্বাস্থ্য জগতের বিশেষ করে মহামারিবিদ্যায় পারদর্শী বিশেষজ্ঞরা কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সব হিসাব জমিয়ে রেখে দুই-এক বছর পর সেগুলো নিয়ে হিসাব করতে বসেন ফলে আমাদের স্বাস্থ্য উন্নয়নের গবেষণা বিবেচনা কিছুটা প্রলম্বিত ও সেকেলে। তাদেরও যুক্তি আছে- রোগশোক মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে সেটা ভালো করে না বুঝে সিদ্ধান্তে আসা সমীচীন নয়।
আবার উন্নত দেশের বিশেষজ্ঞরা বলেন, তুলনায় তোমাদের পরিসংখ্যান বিদ্যার চর্চা বেশ দুর্বল, ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে একে আর এখন আগের মতো ভাবলে হবে না। অধ্যাপক মহোদয় অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে শেয়ার করলেন, পরিসংখ্যানের বিশ্লেষণ-উত্তর সিদ্ধান্তের যুক্তি বিশেষজ্ঞদের হাতে যতই থাকুক দেশগুলো যখন ইবোলা বা করোনাভাইরাসের সংকটে পড়ে তখন মানুষ বাঁচাতে দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয় আর হালনাগাদ তথ্য হাতের নাগালে না থাকলে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।
স্বাস্থ্য যোগাযোগে আমার পেশাগত কাজের অভিজ্ঞতা থেকে এই প্রথম দেখলাম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ তথ্য বা একটি মহামারি প্রাদুর্ভাবের তথ্য সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সেই তথ্য নিয়ে যদি কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলাপের ইচ্ছা প্রকাশ করি তো তিনি মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন! এর কারণ কী? যুক্তরাষ্ট্রের যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমি গত প্রায় এক যুগ স্বাস্থ্য গবেষণা কাজে যুক্ত সেখানে তো এমন দেখি না!
আমার যার সঙ্গে সংযুক্তি, প্রফেসর স্ট্যানলি লেমেশো, যিনি একজন খ্যাতিমান জৈব-পরিসংখ্যানবিদ, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ডিনও বটে, তার সঙ্গে আলাপ করলে তিনি জানালেন, ‘এ রকম পরিস্থিতিতে তোমাকে ভাইরাসটির বহুমাত্রিক রিয়েল টাইম ডেটা নিয়েই কাজ করতে হবে কারণ এই ভাইরাসের গন্তব্য জানার চেয়ে বিচরণ অভ্যাস জানা আমাদের এখন জরুরি। আমাদের আরও জানতে হবে সে যে দেশে বিচরণ করছে সেসব দেশে সে একইরকম আচরণ করছে কি না। যদি তার প্রকৃতি পাল্টায় আমাদের তখন চিকিৎসার জন্য তার চেয়েও কৌশলী হতে সক্ষম হতে হবে। আর তার জন্য আমাদের প্রচুর তাৎক্ষণিক ডেটা দরকার।’
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে করোনাভাইরাস আক্রান্তের সেই রিয়েল টাইম ডেটা আমরা একসঙ্গে পাচ্ছি মাইক্রোসফটের ‘বিং’ আর জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সোর্স থেকে। এতেও আমাদের দেশের বিজ্ঞজনদের টনক নড়ছে না যে আমার দেশের ডেটাগুলো যেগুলো আইইডিসিআর ও স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রতিদিন দিচ্ছে, আমি কেমন করে বিন্যাস করে রাখতে পারি ও সারাক্ষণ বিশ্লেষণ করে আমাদের সরকারকে সহযোগিতা করতে পারি। যে দুটো নামি-দামি সোর্স উল্লেখ করেছি সেগুলো প্রতি মুহূর্তের বা রিয়েল টাইম ডেটা উপস্থাপনা করছে যদিও ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ হাজির করে পরেরদিন। তাতেও চলে, যদি সবগুলো সোর্সের ডেটা বিশ্লেষণ করে আমরা এই ভাইরাসের গতি-প্রকৃতি নিয়ে ভাবতে বসি। তাহলে যে কটি কাজ আমরা করতে পারি-
১. নিজের দেশের ও প্রতিবেশী দেশের প্রাপ্ত ডেটা নিয়ে ‘প্রোজেকশন’ বা ‘অভিক্ষেপ’ তৈরি করতে একটা হিসাব কষতে পারি এই করোনাভাইরাস আমার দেশের সম্ভাব্য কত মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। সে অনুযায়ী আমার সরকার যদি প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয় তা হলে সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাবের হার কতখানি কমে আসবে। মানুষের আচারগত অভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনের কী কী ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনলে এর প্রাদুর্ভাব আরও একটু কমে আসবে। এভাবে সরকারি আদেশ, গৃহীত ব্যবস্থা ও উদ্যোগের সঙ্গে জনগণের একটি সমন্বয় গড়ে উঠত;
২. আমরা যদি আমাদের দেশের সম্ভাব্য সংক্রমণের হিসাব বা প্রজেকশন পেতাম তাহলে চিকিৎসাব্যবস্থায় যতগুলো উদ্যোগ নেয়া দরকার সেগুলো যথাসময়ে নিয়ে নিতাম আর তাতে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ওঠার সুযোগ থাকত না। ভালো যা হতো, সংক্রমণের গতি-প্রকৃতি বুঝে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আমাদের অভয় দিয়ে সঠিক নির্দেশনা ও স্বাস্থ্য পরামর্শ দিতে পারতেন। এতেও সম্ভাব্য সংক্রমণের হিসাবের হার থেকে সংক্রমণ সংখ্যা কমে আসত;
৩. এই ভাইরাস বেঁচে থাকার লড়াইয়ে আমাদের দেশের মানুষকে এক কঠিন বিপদে ফেলে দিয়েছে। হাতের কাছে সম্ভাব্য সংক্রমণের অঙ্ক থাকলে সরকারের সুবিধা হতো সারাদেশে কেমন করে টাকা-পয়সা-খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছানোর প্রশাসনিক পরিকল্পনা নেয়া যায়। আর তাতে জনগণ যখন স্বস্তিতে ঘরেই থাকত তাতে সম্ভাব্য সংক্রমণের হারও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আমরা থাকতাম না বরং এ হার কমে আসত;
৪. সর্বোপরি, আমাদের দেশের সবচেয়ে দুর্বল যে স্বাস্থ্য গবেষণার জগৎ যেখানে আমাদের প্রায় কোনোই বিনিয়োগ নেই সে কাজটি সঠিক উপায়ে করার জন্য আমাদের হাতে থাকত একটি বিশাল স্বাস্থ্য তথ্যভাণ্ডার যা দিয়ে প্রতিবছর আমরা অন্তত ডজনখানেক বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য উন্নয়নে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে পারতাম। আর তাতে লাভবান হতো আমাদের দেশই। আমাদের দেশের চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষকদের জন্য জরুরি যে গবেষণা ল্যাব তার খুব সামান্যই আমরা স্থাপন করতে পেরেছি। একটু বেশি মানের ল্যাব (যেমন বায়োসেফটি ল্যাব) গড়ে তুলে আমরা নিশ্চয়ই আমাদের মেডিকেল গবেষণার মানও বাড়াতে পারি। অথচ এই দেশেই আমাদের জনমানুষের ডেটা নিয়ে গবেষণা করতে একটা আন্তর্জাতিক সংস্থাকে আমরা জমি-জিরাত দিয়ে রেখেছি, টাকা-পয়সাও দেই কিন্তু তাদের ল্যাবে বা গবেষণা কাজে আমাদের কোনো অধিকার নেই!
এখনও সময় আছে। আমাদের দরকার সব তথ্য হাতে নিয়ে সাহসের সঙ্গে বিশ্লেষণ করে সরকারকে তাৎক্ষণিক উপায় বলে দেয়ার মানুষগুলো খুঁজে বের করা। যারা বিভিন্ন সরকারি দফতরে আছেন তাদের মধ্যেও কেউ কেউ এসব কাজ বোঝার কথা। যারা বোঝেননি তারা এতদিনে তার প্রমাণ দিয়েই ফেলেছেন, তাদের বাদ দিয়ে অবশ্যই তাদের চাকরি রক্ষার কথা চাতুর্যে না ভুলে সরকারের উচিত হবে একটি স্বাস্থ্য তথ্যভাণ্ডারের কাজ হাতে নেয়া। এই ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে অনেক সহজ উপায় আছে এই কাজের। নানা ছলচাতুরিতে সদাশয় সরকার অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে ফেলেছে কিন্তু কাজের কাজ কী হয়েছে এখন তো তা আমরা দেখতেই পাচ্ছি।
পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হস্তক্ষেপ এখানে এখন জরুরি। আমাদের দেশে মেডিকেল চিকিৎসার মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার প্রবল সম্ভাবনা দেখা যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ)। এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও এখানে সরকারের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ব্যাপক মনোযোগ দরকার। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সাইন্স অনুষদের বিভিন্ন বিভাগে উন্নত গবেষণাগার ও বিজ্ঞ অভিজ্ঞ অধ্যাপক মণ্ডলীদের দ্বারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণামানের ঐতিহাসিক মূল্য বিবেচনা করে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংসহ জৈব রসায়ন, ফার্মেসি, জীববিদ্যা ইত্যাদি যেসব বিষয়ের গবেষণার ফলাফলে চিকিৎসাবিদ্যায় অবদানের সুযোগ আছে সেগুলোয় সরকারের মনোযোগ দেয়া দরকার যাতে দেশজুড়ে চিকিৎসাসেবা গবেষণার একটি সমন্বয় থাকে। অপরদিকে বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল, যারা স্বাস্থ্য গবেষণার অনুমোদন দেয় তাদেরও সক্ষমতার পরিধি ও আর্থিক ক্ষমতা বাড়ানো দরকার। বায়ো-মেডিকেল গবেষণার সক্ষমতা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে যত ঘনিষ্ঠ হবে আমাদের ভবিষ্যৎ দুর্গতির দুর্ভাবনা ততই কমে আসবে। অন্তত এই বিবেচনায়ও ডিজিটাল বাংলাদেশের কর্মপন্থায় ‘স্বাস্থ্য গবেষণা’ ও সেবায় ‘উদ্ভাবন’ প্রক্রিয়া চালু রাখা দরকার।
২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর প্রকাশিত সর্বশেষ সরকারি জাতীয় স্বাস্থ্য হিসাবের তথ্য অনুযায়ী, আমাদের দেশের মানুষের স্বাস্থ্যের পেছনে যত খরচ হয় তার ৬৭ শতাংশই মানুষ নিজের পকেট থেকে খরচ করে। আমরা জানি আমাদের কাছে স্বাস্থ্যখরচ একটি বড় বোঝা। স্বাস্থ্যসেবার খরচের বিষয়টি আমরা ঠিকমতো উল্লেখ করতে চাই না বলে আমাদের অর্জন বিপরীতমুখী নিষ্কাশনে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে দারিদ্র্যবিমোচন প্রক্রিয়াও ব্যাহত হচ্ছে। করোনাভাইরাসের মতো মহামারি যখন আমাদের আক্রান্ত করছে তার সরকারি ও ব্যক্তিগত চিকিৎসাব্যয় মিলে যে বিরাট দুর্গতির মধ্যে আমাদের ফেলবে তার থেকে পরিত্রাণের জন্য হলেও সেই স্বাস্থ্য অর্থনীতির গবেষণা এখনই আমাদের শুরু করা দরকার।
লেখক : শিক্ষক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়




« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft