
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পারস্য উপসাগরে দীর্ঘ চার মাস অবরুদ্ধ থাকার পর অবশেষে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সফলভাবে পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) বাংলাদেশ সময় ভোররাত তিনটায় জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে। বর্তমানে এটি জ্বালানি সংগ্রহের (বাংকারিং) জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের নিবিড় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং বিএসসির সুনিপুণ নৌ-কৌশলে জাহাজটিতে থাকা ৩১ জন বাংলাদেশি ক্রু নাবিক সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুস্থ অবস্থায় এই চরম সংকট থেকে মুক্ত হলেন।
বিএসসি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে নির্মিত ৩৮ হাজার ৮৯৪ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজটি গত ২ ফেব্রুয়ারি হরমুজ হয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে। কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে ২৭ ফেব্রুয়ারি এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। এর ঠিক পরদিনই (২৮ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক পরাশক্তি আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরণের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ইরানি কর্তৃপক্ষ।
ফলে জাবেল আলীতে পণ্য খালাসের পর জাহাজটির কুয়েতে যাওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তার স্বার্থে বিএসসি জাহাজটিকে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে ৩৭ হাজার টন সার বোঝাই করে জাহাজটি। কিন্তু হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকায় তা রাস আল খায়ের বন্দরেই আটকে পড়ে।
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলে জাহাজটি কেপটাউনের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। কিন্তু হরমুজ পাড়ি দিতে গিয়ে পুনরায় ইরানি কোস্ট গার্ডের বাধার মুখে পড়ে জাহাজটি ওমানের মিনা সাকার বন্দরের বহির্নোঙরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
সর্বশেষ ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তি হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের দীর্ঘ কূটনৈতিক তৎপরতায় জাহাজটি অবমুক্ত হয়।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, "আমাদের নাবিকদের সীমাহীন সাহসিকতা, সুনিপুণ নৌ-কৌশল এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনায় ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ এক চরম সংকটময় পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। এই স্পর্শকাতর যুদ্ধক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় তারা যে অসীম ধৈর্য দেখিয়েছেন, তা বিশ্ব মেরিটাইম খাতে বাংলাদেশের জন্য এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত।"
বিএসসি জানায়, দীর্ঘ চার মাসের এই অবরুদ্ধ সময়ে জাহাজের ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রুর মনোবল সমুন্নত রাখতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। জাহাজে সুপেয় পানি, খাবার, রসদ ও জ্বালানি তেলের মতো লজিস্টিকস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি তাদের জন্য বিশেষ আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা হয়। জাহাজটি বর্তমানে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত এবং সব ক্রু সুস্থ রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে বিএসসি কর্তৃপক্ষ।
মন্তব্য করুন