শুক্রবার
১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩

জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের শাহাদাতবার্ষিকী আজ

কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৬, ১০:৫৪ এএম
জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের শাহাদাতবার্ষিকী আজ

জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ হিসেবে পরিচিত আবু সাঈদের দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকী আজ। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সংঘটিত সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় সৃষ্টি হয়। তার আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ঘিরে আজ জেলা প্রশাসন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের উত্তাল সময়ে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসমুখী মিছিল নিয়ে এগোলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেট এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

আন্দোলনের একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন। পরে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গুরুতর আহত হন। সহপাঠীরা তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তার দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আন্দোলন আরও বেগবান হয় এবং তা দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।

আবু সাঈদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রংপুরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসেন। আন্দোলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে অবস্থান নেন।

এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে অগ্নিকাণ্ড এবং কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। সংঘর্ষে পুলিশ, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পক্ষের শতাধিক ব্যক্তি আহত হলেও প্রথম নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে রংপুরে।

এদিকে, আবু সাঈদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পরলে রংপুরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফুঁসে উঠে এবং রাজপথে নেমে পরে। সবাই ছুটতে থাকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। অন্যদিকে, আবু সাঈদের লাশ নিয়ে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ নিয়ে নগরীর প্রধান সড়ক দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যেতে ধরলে পুলিশ বাধা প্রদান করেন। এক পর্যায়ে পুলিশ আবু সাঈদের লাশ জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে তাদের গন্তেব্যে চলে যায়।

এরপরে আন্দোলনে আরও গতি বাড়ে সারাদেশের মতো রংপুরেও। সন্ধ্যার আগেই পুরো নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস দখলে নেন আন্দোলনকারীরা। এরপরেই ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে যায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা।

ভিসির বাড়িতে আগুন: চলমান আন্দোলনে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের নিহত হওয়ার ঘটনায় পুরো রংপুর নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক দখলে নেন আন্দোলনকারীরা। এরপর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন তারা। পরে ভিসির বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে থাকা সাংবাদিকের কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। সেদিনের সংঘর্ষে পুলিশ, সাংবাদিক, ছাত্রলীগ ও কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীসহ শতাধিক আহত হন।

আবু সাঈদের মরদেহ গুম: সেদিন আবু সাঈদের মরদেহ পুলিশ আড়াই ঘণ্টা গুম করে রেখেছিল। সেই সঙ্গে রাতেই লাশ দাফনের জন্য প্রবল চাপ তৈরি করেছিল পরিবারের ওপর। এই দাবি করেছেন নিহতের বড়ভাই রমজান আলী। তিনি বলেন, ফজরের পূর্বে লাশ বাড়িতে নিয়ের আসার পর ওইদিন রাতেই ইউএনও, ওসি এবং আওয়ামী লীগ নেতারা বাড়িতে গিয়ে লাশ দাফনের জন্য কবর খোড়ার চাপ দিয়েছিল। তখন তারা অসহায় হয়ে পড়েন।

একপর্যায়ে তারা পরের দিন সকাল ৭টার মধ্যেই দাফন এবং মসজিদে জানাজা করার জন্য নির্দেশ দেন। তখন আমরা আরও ভয় পেয়ে যাই। আমি বলি, কবর খনন করতেই তিন ঘণ্টা সময় লাগবে। তখন তারা আমাদের কবর খোঁড়ার বিষয়টি দেখভাল করে। পরে ছাত্র ভাইদের সহযোগিতায় মাদরাসা মাঠে জানাজা করেছি এবং ১১টায় দাফন করেছি। এ সময় ছাত্রদের মাত্র ১৫ মিনিট সময় দিয়েছিল পুলিশ।

আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা: কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালীন সময়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনায় দুটি মামলা হয়। একটি মামলা করেন পুলিশের পক্ষ থেকে অন্যটি করেন তার পরিবারের পক্ষ থেকে।

পুলিশ বাদী: আবু সাঈদ নিহতের ঘটনার ১৭ জুলাই রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তাজহাট থানায় এ ব্যাপারে একটি মামলা হয়। বাদী তাজহাট থানার (বেরোবি) পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই বিভূতি ভূষণ রায়। পেনাল কোডের (১৪৩/১৮/৬/৩৩২/ ৩৩৩/৩৫৩/৩৭৯/৪৩৫/ ৪২৭/৩০২/৩৪) ধারায়। মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে, বেআইনি জনতা সাধারণ/মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি করে গুরুতর জখম, চুরি, ভাঙচুর, ক্ষতিসাধন, অগ্নিসংযোগ ও নিরীহ ছাত্রকে হত্যা করে অপরাধ করা হয়েছে।

আসামি হিসেবে কারও নাম উল্লেখ না থাকলেও এতে বলা হয়, এরা উচ্ছৃঙ্খল ২-৩ হাজার আন্দোলনকারী ছাত্র নামধারী দুর্বৃত্ত। তাদের সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াত-শিবির সমর্থিত নেতাকর্মীও রয়েছে। পুলিশের এই প্রতিবেদনে মামলাকে সাজানো নাটক বলে অভিহিত করেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও আবু সাঈদের পরিবার।

আবু সাঈদের পরিবারের মামলা: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহতের ঘটনায় আওয়ামী সরকারের পতনের পর ১৮ আগস্ট মামলা করেন তার বড় ভাই রমজান আলী। ওই মামলায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ৩০-৩৫ জনকে আসামি করা হয়। আসামিরা হলেন— তৎকালীন পুলিশের আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, রংপুরের ডিআইজি আব্দুল বাতেন, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান, উপপুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন, সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান, সহকারী পুলিশ কমিশনার ইমরান হোসেন, থানার ওসি রবিউল ইসলাম, পুলিশের এএসআই সৈয়দ আমীর আলী ও সুজন চন্দ্র রায়কে। এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সভাপতি পোমেল বড়ুয়া, সাধারণ সম্পাদক শামিম মাহফুজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদ মণ্ডল, গণিত বিভাগের শিক্ষক মশিউর রহমান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসের কর্মকর্তা রাফিউল হাসান রাসেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বিভূতিভূষণ, বেরোবি ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেনকে আসামি করা হয়।

শহীদ আবু সাঈদ এর ২য় শাহাদাতবার্ষিকী: আজ জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ এর ২য় শাহাদাতবার্ষিকী পালনে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি বেসরকারি রাজনৈতিক সংগঠন থেকে নেওয়া হয়েছে দিনব্যাপী কর্মসূচি। আবু সাঈদের ২য় শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে জুলাই শহীদ দিবসের আলোচনা সভা আয়োজন করা হয়েছে। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।

এছাড়াও দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। কর্মসূচির অংশ হিসেবে রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করতে আজকে আসার কথা রয়েছে এনসিপির আহবায়ক ও বিরোধী দলীয় চীপ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি, এনসিপি নেতা নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী, হাসনাত আবদুল্লাহ্ এমপি, আতিক মুজাহিদ এমপির।

শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন সরকারের কাছে মামলার রায় দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমার ছেলে জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ। মামলার রায় হয়েছে। এখন দ্রুত সেই রায় কার্যকর হোক—এটাই আমাদের পরিবারের প্রত্যাশা।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালি খুলবে না ইরান

রানী মুখার্জি পাচ্ছেন সম্মানসূচক ডক্টরেট

জগন্নাথদেবের রথযাত্রা: রহস্যময় ও অলৌকিক ইতিহাস

যশোরের সাংবাদিক ছাকিন হোসেন আর নেই

এক সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা মাহফুজুর রহমান মিন্টু আর নেই

ঝিকরগাছায় জামায়াতের জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে আলোচনা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত

যশোরে অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে দুই যুবক আটক

বরিশালে থানায় হামলা ও ভাঙচুর মামলার আসামি রিফাত যশোর থেকে আটক

যশোরসহ ১৪ অঞ্চলে ঝড়ের পূর্বাভাস

‘সরকারকে বিব্রত করতে কিছু মহল পরিস্থিতি কাজে লাগাতে চায়’

সব স্কুল-কলেজে মনিটরিং জোরদারের নির্দেশ মাউশির

রাজশাহীতে বৃত্তি পরীক্ষার ফল পুনর্মূল্যায়ন ও ৭ দফা দাবিতে স্মারকলিপি ও মানববন্ধন

শনিবার থেকে সারাদেশে বাড়বে বৃষ্টির দাপট

আইজিপি / ভয়ভীতি ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালন করুন

বিশ্বকাপ ফাইনাল মাতাবেন শাকিরা-ম্যাডোনা-বিটিএস

জুলাই শহীদদের প্রতি রাসিক প্রশাসকের শ্রদ্ধা নিবেদন

কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা

যবিপ্রবিতে জুলাই শহীদদের স্মরণে দোয়া ও মোনাজাত

শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক / জুলাই শহিদদের আত্মত্যাগ জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে

চতুর্থ দিনের মতো বাড়লো জ্বালানি তেলের দাম

X