
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা মহোৎসব আজ বৃহস্পতিবার (আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথি) অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রাজধানীর ইসকন স্বামীবাগ আশ্রম থেকে বিকেল ৩টায় শুরু হবে কেন্দ্রীয় রথযাত্রা, যা ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে গিয়ে শেষ হবে। এছাড়া বাংলাদেশ পুজা উদযাপন পরিষদ, পূজা ফ্রন্টের আয়োজনে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পৃর্থক শোভাযাত্রা বের করা হবে।
রথযাত্রা সনাতন ধর্মের অন্যতম প্রাচীন, বৃহৎ এবং বর্ণাঢ্য একটি মহোৎসব, যা মূলত ভগবান জগন্নাথ, তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলভদ্র এবং ভগ্নী সুভদ্রার সম্মানে অত্যন্ত ভক্তিভরে পালিত হয়। ভারতের ওড়িশা রাজ্যের পুরীতে অনুষ্ঠিত এই রথযাত্রা বিশ্ববিখ্যাত হলেও, বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে এটি অত্যন্ত শ্রদ্ধা, উদ্দীপনা ও আনন্দমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়।
সনাতন পঞ্জিকা অনুসারে, প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে এই পুণ্যলগ্ন উপস্থিত হয় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে এটি এক মহামিলনমেলার রূপ নেয়। এই পবিত্র দিনে বিশাল আকৃতির এবং অত্যন্ত নিপুণ কারুকাজে সজ্জিত তিনটি পৃথক কাঠের রথে করে ভগবান জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে শ্রীমন্দির থেকে বের করে আনা হয়। লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগমে চারপাশের রাজপথ মুখরিত হয়ে ওঠে।
ভক্তদের মাঝে এক প্রবল বিশ্বাস কাজ করে যে, পরম করুণাময় ভগবান এদিন সাধারণ মানুষের কাছাকাছি আসার জন্য এবং সকলের দুঃখ-কষ্ট দূর করার উদ্দেশ্যে নিজ গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে আসেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের মানুষ এই রথ টানার দুর্লভ সুযোগ পান, যা সমাজে এক অনন্য সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের গভীর বার্তা বহন করে। পৌরাণিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর এবং সনাতনীদের কাছে এটি পরম পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন।
এই মহোৎসবের মূল আকর্ষণ হলো ভগবান জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রা দেবীর শ্রীমন্দির থেকে তাঁদের মাসির বাড়ি বা গুণ্ডিচা মন্দিরে যাত্রা। শাস্ত্রীয় এবং প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ভগবান সেখানে পূর্ণ নয় দিন অবস্থান করেন এবং তারপর 'উল্টো রথ' বা বহুড়া যাত্রার মাধ্যমে অত্যন্ত সসম্মানে ও জাঁকজমকের সাথে নিজ মন্দিরে প্রত্যাবর্তন করেন। এই রথযাত্রার সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্য হলো ভক্ত ও ভগবানের মধ্যকার সরাসরি এবং বাধাহীন সংযোগ স্থাপন।
মন্দিরের প্রথাগত কঠোর নিয়ম ভেঙে ভগবান যখন রাজপথে নেমে আসেন, তখন ধনী-দরিদ্রের সমস্ত ভেদাভেদ মুহূর্তের মধ্যে মুছে যায়। সনাতন ধর্মে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, রথের রশি একবার ভক্তিভরে স্পর্শ করতে পারলে বা টানতে পারলে মানুষের জন্ম-জন্মান্তরের সমস্ত পাপ খণ্ডন হয় এবং সে পরম মোক্ষ বা চিরস্থায়ী মুক্তি লাভ করে।
আধ্যাত্মিক দর্শনের দিক থেকে গভীরভাবে বিবেচনা করলে, এই রথ হলো নশ্বর মানবদেহের প্রতীক এবং এর ভেতরে উপবিষ্ট ভগবান হলেন আমাদের শাশ্বত পরমাত্মা। এই মহান উৎসব আমাদের আত্মোপলব্ধি এবং ভক্তিপথের পরম গন্তব্যের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়।
মন্তব্য করুন