
এখন শুধু শহর কিংবা শহরতলী নয়, হাত বাড়ালেই শহরে ব্যস্ত মোড়ে, পাড়া মহল্লা হাটে মাঠে ঘাটে মিলছে ইয়াবা ও ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট। পুরুষেরা জামা পান্টের পকেটে, শার্টের তল পকেটে আর মহিলারা তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে বহন করছে ‘বাবা’ নামের ইয়াবা।
যশোরাঞ্চলের বিভিন্ন চিহ্নিত এলাকায় অবাধে কেনাবেচা চলছে। বহনে সহজ আবার লাভ বেশি হওয়ায় হাত বদলের ব্যবসায় ঝুঁকে পড়েছে অসাধু জনগোষ্ঠির একটি অংশ। এক সময় ফেনসিডিল গাঁজা ও চোলাই মদের ব্যাপক বিকিকিনি আর স্পট বিশেষে এর ব্যাপকতা থাকলেও এখন সেই মাদকের বাজার দখল নিয়েছে মরন নেশা এই ইয়াবা ও ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট। অনেক এলাকায় কারবারের স্পট একই আছে, সিন্ডিকেটে মুখ বদল হয়েছে, যুক্ত হয়েছে অনেক নতুন নতুন কারবারি। মোবাইল চৌকি বসিয়ে অনেক চিহ্নিত কারবারি আটক এড়িয়ে চলছে।
# স্পট একই, সিন্ডিকেটে আসছে নতুন মুখ # ভোল পাল্টে আটক এড়িয়ে কারবারিরা # মোলাকাতের মাধ্যমে হাত বদল হচ্ছে # জোরালো অভিযান দাবি অভিভাবকদের
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানে শিথিলতার কারণে বিভিন্ন স্পটে অপ্রতিরোধ্য স্টাইলে কারবার চালিয়ে যাচ্ছে মরণ নেশার কারবার। মাদক প্রতিরোধে ও বর্তমানের পরিস্থিতি উত্তরণে স্পট শনাক্ত ও পুলিশ অভিযান বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকেরা।
যশোরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে তথ্য মিলেছে, দফায় দফায় মাদক বিরোধী অভিযান, মাদক নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সকল ইউনিটের অভিযান চললেও ইয়াবা কারবার কমছে না। ফেনসিডিল ও গাঁজা ব্যবসায়ীরা চিহ্নিত হওয়ায় তারা থাকছে পুলিশের টার্গেটে। আর ইয়াবা বব্যসায় শ’ শ’ নতুন মুখ এবং তাদের নানামুখি কৌশলের কারণে সরকারি বেসরকারি নানা উদ্যোগ ভেস্তে যাচ্ছে। থামাতে পারছে না ইয়াবা কারবার, বরং এটি ভাইরাসে মত ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন স্পটে ও এলাকা বিশেষে। প্রায়ই ইয়াবার চালান সহ বিপুল পরিমান মাদক উদ্ধারসহ আটক, জেল-জরিমানা হচ্ছে। এর পরও যশোরে নতুন নতুন ইয়াবা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট গড়ে উঠছে। গ্রুপ করেও চলছে এই কারবার। যে কারণে মাদক প্রতিরোধ চেষ্টা চললেও ইয়াবা ব্যবসার বিস্তার হয়েই চলেছে।
একদিকে প্রতিরোধ হচ্ছে, কারবারি আটক হচ্ছে। জামিন পাচ্ছে। আবার ফিরছে একই ব্যবসায়। যোগ হচ্ছে উঠতি নতুন নতুন মুখ। নানা স্টাইলে নানা ঢঙে এখন যশোরাঞ্চলে চলছে মরন নেশা ইয়াবা ব্যবসা। দিনের পর দিন এর নেটওয়ার্ক আরো বিস্তৃত হচ্ছে। যশোরের চাঁচড়া রায়পাড়া, ডালমিল এলাকা, বাবলাতলা, শেখহাটি, বিরামপুর, উপশহর, মন্ডলগাতি, খোলাডাঙ্গা, ধর্মতলা, পালবাড়ি, পুরাতন কসবা, লোনঅফিস পাড়া, ষষ্টিতলা, রেলস্টেশন, শংকরপুর, রেলগেট, মুজিবসড়ক, জেসটাওয়ার পাড়া, বারান্দীপাড়া, নীলগঞ্জ, ঝুমঝুমপুর, ঘোপ জেল রোড, বেজপাড়া তালতলা, আনছার ক্যাম্প এলাকা, আরএন রোড, খড়কী, কারবালা এলাকাসহ শহরে অর্ধশত স্পটে এর ব্যাপক বিসস্তার লাভ করেছে।
আবার গত কয়েক বছর যশোরের মাদকের বাজারের একটি অংশ দখল করেছে ভরতীয় ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট। সরকার নিষিদ্ধ ব্যথানাশক ট্যাবলেট ট্যাপেন্টাডলে যশোরের বিভিন্ন স্পটের বিকিকিনি ডেরায় আইনশৃংখলা বাহিনীর কমবেশি অভিযান লক্ষ্য করা গেলেও খোদ শহরের চিত্রা মোড়ের চিহ্নিত সিন্ডিকেটের সদস্যরা রয়েছে বহাল। ওই সিন্ডিকেটের কেউ আটক না হওয়ায় পুলিশ ভুমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
বহনে সহজ ও দাম কম হওয়ায় হেরোইন ও ফেনসিডিলের জায়গা দখল করা এই ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট বিক্রির জন্য খোদ যশোর শহরের চিত্রা মোড়ে রয়েছে ৪/৭ জনের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তারা চিত্রা মোড় ছাড়াও যশোর শহরের কয়েক ডজন স্পটে অনেকটা বিনা বাধায় বিক্রি করছে এই ট্যাবলেট। যশোরের অনেকগুলো বিতর্কিত ফার্মেসিতেও গোপনে সরবরাহ করছে। ট্যাপেন্টাডল রোধে অভিযান চললেও জব্দ ও আটকের তুলনায় অনেক বেশি বিক্রি ও ব্যবহার হচ্ছে বলে সূত্রের দাবি।
বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্র থেকে তথ্য মিলেছে, যশোর শহরে সম্প্রতি ডজনখানেক ট্যাপেন্টাডল সিন্ডিকেট মাথাচাড়া দিয়েছে। যশোরের কাজীপাড়া, ঘোপ এলাকা, রেলগেট, ঘোপ বউ বাজার, উপশহর, ধর্মতলা বেজপাড়া চোপদারপাড়া, ডালমিল এলাকা, টিবি ক্লিনিক এলাকাতেও চলছে এই কারবার।
খোদ যশোর শহরের চিত্রা মোড়ে কয়েকটি ডেরায় ব্যবসা করছে। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এই এলাকায় ওই সিন্ডিকেট সদস্যরা ট্যাপেন্টাডল বিক্রি করছে। পরিচিত বন্ধুবান্ধব আত্মীয় সজনের সাথে দেখা হলে যেমন হাত মেলায়, তেমনি হাত মিলিয়ে কুলাকুলি স্টাইলে ট্যাপ্টোডল ও টাকা হাতবদল করছে। চিত্রা মোড় গাড়িখানা, গোহাটা রোড, জামে মসজিদ লেইনে এই বিকিকিনি চলছে অনেকটা অবাধে।
চক্রটি সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ট্যাপেন্টাডল পাইকেরী এনে চিত্রা মোড় ছাড়াও যশোর শহরে ও শহরতলীতে আরো লোক লাগিয়ে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ। ৩শ’ টাকা পাতা কিনে বিক্রি করছে ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকা পাতা। বহনে সহজ, আবার দেশি ওষুধের পাতার মত ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটের পাতা হওয়ায় আটক হওয়ার ঝুঁকি কম মনে করে এই ব্যবসা চলছে অবাধে।
ইয়াবা ও ট্যাপেন্টাডল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট এখন যশোর শহরাঞ্চল বিভিন্ন শহরতলী এমনকি গ্রামাঞ্চলেও পৌঁছে দিচ্ছে ইয়াবা। ব্যাপারটি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যেনো হাটে মাঠে ঘাটেও এটা পাওয়া যাচ্ছে হাত বদলের মাধমে। এ অঞ্চলে কয়েকশ’ চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এরা শহরের শতাধিক স্থানে ইয়াবা সিন্ডিকেট ভ্রাম্যমানভাবে পরিচালনা করে যাচ্ছে।
অনেকগুলো সিন্ডিকেট চলছে সরাসরি রাজনৈতিক সেল্টারে। ইয়াবা এক’শ থেকে দেড়’শ টাকায় কিনে বিক্রি করছে সাড়ে তিন’শ ধেকে ৫’শ টাকায়। এর মধ্যে ইয়াবা রয়েছে কয়েক প্রকার। লাল, খয়েরী, সবুজ, রঙের এবং নানা আকৃতি রয়েছে ইয়াবার। ইয়াকবা কর্যকরি ক্ষমতার উপর দাম নির্ধারিত হয়ে থাকে। কোন কোন ইয়াবা বিক্রি হয় ৭শ’ টাকা থেকে হাজার টাকা আবার কিছু বিক্রি দু’শো থেকে ৫শ’ টাকা। বিশেষ করে পকেটে ভরে ভ্রাম্যমানভাবে, পথ চলতে চলতে হান্ডসেক করার মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা।
এদিকে মেয়েরা ইয়াবা সীমান্ত এলাকা থেকে বহন করে আনছে। এরা অনেক সময় ভয়ানক স্টাইলে গোনাঙ্গের মধ্যে পলিথিনে ভরে এগুলো বহন করছে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে এরা এই স্টাইলবের করেছে। তাদের চাতুরতার কাছে হার মানছে র্যাব সিআইডিসহ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অনেক সদস্যও।
এ ব্যাপারে যশোর কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ মাসুম খান ও জেলা গোয়েন্দা শাখার অফিসার ইনচার্জ (ভারপ্রাপ্ত) সুমন মন্ডল জানিয়েছেন, ইয়াবা ও ট্যাপেন্টাডল বিস্তার সংক্রান্ত তথ্য তাদের কাছেও আসছে। তবে কারবারিরা অনেকে কৌশলী হয়ে চলছে। এরপরও অভিযান চালিয়ে অনেক চালান উদ্ধার ও কারবারি আটক করা হয়েছে। অনেকগুলো মামলাও হয়েছে আটককৃত ও পলাতকদের বিরুদ্ধে। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ জিরো টলারেন্স ভূমিকায় রয়েছে। উর্ধŸতন অফিসারদের দিকনির্দেশনায় অভিযান চলমান রয়েছে।
এরপরও মাদক ব্যবসায়ী চক্রের অনেকে মোবাইল চৌকি বসিয়ে পুলিশ আসার খবর জেনে যাচ্ছে। যে কারণে অনেক অভিযান সফল হচ্ছে না। পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছে। নতুন নতুন কারবারিদের ব্যাপারে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। তাদের তালিকাও করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন