
নাটক, উত্তেজনা, শারীরিক ফুটবল আর শেষ মুহূর্তের ম্যাজিক। সব মিলিয়ে এক মহাকাব্যিক সেমিফাইনালের সাক্ষী হলো আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম। ইংলিশদের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিয়ে ২-১ ব্যবধানের নাটকীয় জয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে টিকিট কেটে নিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। শুরুতে পিছিয়ে পড়েও লিওনেল মেসির অসাধারণ দুটি অ্যাসিস্ট এবং এনজো ও লাউতারোর লক্ষ্যভেদে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ট্রফি ঘরে রাখার মঞ্চে পা রাখল লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। আগামী রোববারের মহাযুদ্ধে ফাইনালের ট্রফির জন্য আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে প্রথম সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে হারানো স্পেন।
ম্যাচের গোল বিবরণী: কে, কখন, কীভাবে কাঁপালেন জাল?
ম্যাচের তিনটি গোলই এসেছে প্রথমার্ধের চরম উত্তেজনাকর গোলশূন্য ড্রয়ের পর, দ্বিতীয়ার্ধের আক্রমণাত্মক ফুটবলের হাত ধরে।
০-১ (ইংল্যান্ড - ৫৬ মিনিট): দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দেয় ইংল্যান্ড। ডেক্লান রাইস ডানপ্রান্তে থাকা মরগান রজার্সকে বল বাড়িয়ে বক্সে ঢোকেন। রজার্সের পাস থেকে বামপ্রান্ত দিয়ে চিতার গতিতে আর্জেন্টিনার ডিফেন্সের পেছনে রান নেন অ্যান্থনি গর্ডন এবং নিখুঁত শটে এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে নেন।
১-১ (আর্জেন্টিনা - ৬৮ মিনিট): পিছিয়ে পড়ার পর মরিয়া আর্জেন্টিনা সমতায় ফেরে এক চতুর শর্ট কর্নার থেকে। কর্নার থেকে দ্রুত পাস পেয়ে বক্সের ঠিক বাইরে সম্পূর্ণ আনমার্কড অবস্থায় বল পান এনজো ফার্নান্দেজ। শট নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় পেয়ে এক জাদুকরী ও নিখুঁত বাঁকানো শটে জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করে দলকে সমতায় ফেরান তিনি। (অ্যাসিস্ট: লিওনেল মেসি)।
২-১ (আর্জেন্টিনা - ৮১ মিনিট): ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই বিশ্বকে নিজের জাদুকরী রূপ দেখান মহাতারকা লিওনেল মেসি। মাঝমাঠের ঠিক ওপরে ইংলিশ ডিফেন্ডারদের থেকে অবিশ্বাস্যভাবে বল কেড়ে নেন (recover) তিনি। এরপর বক্সে মাপা এক ক্রস বাড়ালে বদলি খেলোয়াড় লাউতারো মার্টিনেজ খুব কাছ থেকে দর্শনীয় এক হেডে বল জালে জড়িয়ে আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত করেন। (অ্যাসিস্ট: লিওনেল মেসি)।
বারুদের ম্যাচ: ফাউল ও হলুদ কার্ডের খণ্ডচিত্র
বিশ্বকাপের এই দ্বিতীয় সেমিফাইনালটি প্রথম থেকেই ফুটবল মাঠের চেয়ে যেন এক রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছিল। বিশেষ করে প্রথমার্ধে দুই দলের খেলোয়াড়দের হাতাহাতি ও ফাউলের মহড়ায় ম্যাচ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
ফাউলের সংখ্যা: পুরো ম্যাচে দুই দল মিলিয়ে মোট ২৬টি ফাউল হয়েছে (আর্জেন্টিনা ১২টি, ইংল্যান্ড ১৪টি)। মাঝমাঠে বুকায়ো সাকা ও জুড বেলিংহামদের গতি থামাতে বেশ কয়েকবার শারীরিক ফুটবল বা ট্যাকটিক্যাল ফাউলের আশ্রয় নেয় আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডাররা।
হলুদ কার্ডের ছড়াছড়ি: ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রেফারিকে বেশ কঠোর হতে হয়েছে। ম্যাচে মোট ৫টি হলুদ কার্ড দেখানো হয়। আর্জেন্টিনার পক্ষে নিকোলাস ওটামেন্ডি ও রদ্রিগো ডি পল হলুদ কার্ড দেখেন ফাউল ও রেফারির সাথে তর্কে জড়ানোর জন্য। অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের জন স্টোনস, কাইল ওয়াকার এবং ডেক্লান রাইসকে বিপজ্জনক ট্যাকেলের জন্য হলুদ কার্ডের শাস্তি পেতে হয়।
খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব ও ব্যর্থতার বিশ্লেষণ
লিওনেল মেসির মহাকাব্যিক কৃতিত্ব: গোল না করেও এই ম্যাচে রাজত্ব করেছেন মেসি। আর্জেন্টিনার দুটি গোলের পেছনেই ছিল তার জাদুকরী ড্রিবলিং ও নিখুঁত ভিশন। বিশেষ করে ৮১ মিনিটে বল রিকভার করে লাউতারোকে দেওয়া পিন-পয়েন্ট ক্রসটিই ম্যাচের আসল পার্থক্য গড়ে দেয়।
লাউতারো ও এনজোর ফিনিশিং দক্ষতা: সুযোগ হাতছাড়া করার খোলস ভেঙে এনজো ও সুপার-সাব লাউতারোর নিখুঁত ফিনিশিং আলবিসেলেস্তেদের ফাইনালের স্বপ্ন টিকিয়ে রেখেছে।
ইংল্যান্ডের রক্ষণাত্মক ব্যর্থতা: ১-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর গ্যারেথ সাউথগেটের দলের অতি-রক্ষণাত্মক মনোভাবই তাদের কাল হয়েছে। বক্সের বাইরে এনজোকে শট নেওয়ার জায়গা দেওয়া এবং বক্সে লাউতারো মার্টিনেজকে আনমার্কড রাখা ইংলিশ ডিফেন্সের অমার্জনীয় ব্যর্থতা।
মন্তব্য করুন