
রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার হাত ধরে বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি আর ২০২৬ সালে লিওনেল মেসির নেতৃত্ব—দুই প্রজন্মের গৌরব যেন এক সুতোয় গাঁথা হলো এই জয়ে। গোল করতে না পারলেও আর্জেন্টিনার দুই জয়সূচক গোলেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন অধিনায়ক মেসি। ম্যাচ শেষে এই ঐতিহাসিক জয় তিনি উৎসর্গ করেন কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনাকে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার প্রতিটি লড়াই ইতিহাসের আবেগে ভরপুর। বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনার অবিস্মরণীয় পারফরম্যান্স আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই ম্যাচে 'হ্যান্ড অব গড' এবং 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি'র মাধ্যমে তিনি শুধু দলকে জয়ই এনে দেননি, ফকল্যান্ডস যুদ্ধের পর আর্জেন্টাইনদের মনেও নতুন আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছিলেন।
তাই ইংল্যান্ডকে নাটকীয়ভাবে হারানোর পর টিওয়াইসি স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেসি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, এই জয় দিয়েগো ম্যারাডোনার জন্য।
খেলা শেষে টিওয়াইসি স্পোর্টসের সাংবাদিক মাতিয়াস পেলিচিওনি ১৯৮৬ সালের ঐতিহাসিক ম্যাচে ম্যারাডোনার পরা জার্সির একটি প্রতিরূপ মেসির হাতে তুলে দেন। মুহূর্তটি ছিল আবেগে ভরা।
মেসি বলেন, নিঃসন্দেহে ওপর থেকে দিয়েগো এই মুহূর্তটি উপভোগ করছে। আজকের দিনটি তার জন্যও বিশেষ। তাকে এই আনন্দ দিতে পেরে আমি খুব খুশি। যেখান থেকেই দেখুক, আশা করি সে এটি উপভোগ করছে। এই জয় তার জন্যও একটি উপহার।
১৯৮৬ সালের ২২ জুন মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে ইতিহাস সৃষ্টি করেন ম্যারাডোনা।
প্রথমে হাতে বল স্পর্শ করে করা বিতর্কিত গোলটি 'হ্যান্ড অব গড' নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। এরপর একের পর এক ইংলিশ ফুটবলারকে কাটিয়ে করা তার দ্বিতীয় গোলটি এখনও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃত।
ফকল্যান্ডস যুদ্ধের ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রজন্মগত ব্যবধানের কারণে বর্তমান আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের কাছে সেই ঘটনার আবেগ আগের মতো নয়। তবে তারা ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনার’ লেখা একটি ব্যানার নিয়ে উদযাপন করেন। আর ইংল্যান্ড ম্যাচটি তাদের কাছে ছিল বিশেষ এক লড়াই। শুধু সেমিফাইনাল হওয়ার কারণেই নয়, প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড হওয়ায় খেলোয়াড়দের মাঝে বাড়তি অনুপ্রেরণাও কাজ করেছে।
মেসি বলেন, ‘জাতীয় সংগীতের সময় বিশেষ কিছু ঘটেছিল। দর্শকদের গুঞ্জন ধীরে ধীরে জোরালো হয়ে ওঠে। তারা অন্যরকম আবেগ নিয়ে গান গাইছিল, আর আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে সেটা অনুভব করছিলাম। জানতাম এটা শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ, কিন্তু কখনও কখনও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়। আমরা সেই অনুভূতি নিয়েই ম্যাচটি খেলেছি।’
এই ম্যাচে আরও কয়েকটি রেকর্ড নিজের নামে লিখিয়েছেন মেসি। আগামী রোববার দিবাগত রাতে নিউজার্সিতে স্পেনের বিপক্ষে তিনি খেলবেন নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল, যা তাকে ব্রাজিল কিংবদন্তি কাফুর রেকর্ডের সমতায় নিয়ে যাবে। একইসঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে কিলিয়ান এমবাপ্পের ওপর নিজের ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ থাকবে তার সামনে। পাশাপাশি লক্ষ্য থাকবে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নিজের অনন্য অর্জনের ভাণ্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করা।
ইংল্যান্ডকে হারানোর পর আর্জেন্টিনা সমর্থকদের কণ্ঠে একটি গানই সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে— "ফকল্যান্ডসের জন্য, দিয়েগোর জন্য, আর লিওর শেষ গোলের জন্য।" আটলান্টায় প্রথম দুই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এখন পুরো ফুটবল বিশ্বের দৃষ্টি রোববারের ফাইনালে, যেখানে স্পেনের বিপক্ষে আরেকটি ইতিহাস রচনার অপেক্ষায় লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনা।
মন্তব্য করুন