
প্রথমার্ধ ছিল গোলশূন্য ও কিছুটা প্রাণহীন। তবে দ্বিতীয়ার্ধে যা ঘটল, তাকে কেবল 'মহানাটকীয়' বললেই কম বলা হবে। অফসাইডের কারণে বাতিল হলো একের পর এক গোল, যোগ করা সময় ১০ মিনিট থেকে গড়িয়ে গেল ১৯ মিনিটে! ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার আগমুহূর্তেও ছড়ালো চরম উত্তেজনা। তবে শেষ পর্যন্ত ক্রোয়েশিয়ার হৃদয় ভেঙে ২-১ গোলের রুদ্ধশ্বাস জয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে পর্তুগাল।
টরন্টো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত শেষ বত্রিশের এই ঐতিহাসিক ম্যাচে পর্তুগালের হয়ে গোল করেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও গনসালো রামোস। ক্রোয়েশিয়ার একমাত্র গোলটি ইভান পেরিসিচের। নকআউট পর্বের এই মহারণে বিদায় নিতে হলো ক্রোয়েশিয়ান কিংবদন্তি লুকা মদ্রিচকে। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে পর্তুগালের প্রতিপক্ষ এবার স্পেন।
ম্যাচের শুরু থেকেই বল দখলে রেখে আক্রমণে আধিপত্য দেখায় পর্তুগাল। ম্যাচের চতুর্থ মিনিটেই এগিয়ে যেতে পারত তারা, তবে রাফায়েল লেয়াওয়ের কাটব্যাক থেকে ব্রুনো ফের্নান্দসের শট চমৎকারভাবে রুখে দেন ক্রোয়াট গোলরক্ষক দমিনিক লিভাকোভিচ। এরপর দশম মিনিটে পেদ্রো নেতোর ক্রস এবং ষোড়শ মিনিটে রেনাতো ভাইগার হেড জালের ঠিকানা পায়নি। ৩০তম মিনিটে জুয়াও কান্সেলোর দারুণ ক্রসে পা ছোঁয়াতে ব্যর্থ হন রোনালদো ও ফের্নান্দস।
প্রথমার্ধে প্রায় ৭০ শতাংশ বল দখলে রেখে পর্তুগাল ৯টি শট নিলেও মাত্র ১টি ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে ক্রোয়েশিয়ার ৩টি শটের কোনোটিই গোলমুখে ছিল না।
ম্যাচটি ছিল দুই কিংবদন্তি—৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং ৪০ বছর বয়সী লুকা মদ্রিচের অনন্য এক লড়াই। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবার ৪০ বা তার বেশি বয়সী দুজন আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে মুখোমুখি হয়ে ইতিহাস গড়েন এই দুই সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ সতীর্থ। এর মধ্যে রোনালদো বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ খেলা সবচেয়ে বয়সী আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের কীর্তি নিজের করে নেন।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই খোলস ছেড়ে বের হয় ক্রোয়েশিয়া। ৫৩তম মিনিটে স্তানিসিচের ক্রস প্রতিপক্ষের মাথায় লেগে পাওয়ার পর জোরাল শটে গোলরক্ষকের দুই পায়ের মাঝ দিয়ে বল জালে পাঠান ৩৭ বছর বয়সী উইঙ্গার ইভান পেরিসিচ। ১-০ গোলে এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া।
পিছিয়ে পড়ে মরিয়া হয়ে ওঠে পর্তুগাল। ম্যাচের ৫৭ মিনিটে লেয়াওয়ের শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ৬১ মিনিটে কান্সেলোর পাসে রোনালদো বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে তা বাতিল হয়। তবে ম্যাচের ৬৮ মিনিটে খেনাতো ভাইগাকে বক্সে টেনে ফেলে দেন ক্রোয়েশিয়ার নিকোলা ভ্লাসিচ। ভিএআর দেখে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। সফল স্পট কিকে পর্তুগালকে ১-১ সমতায় ফেরান রোনালদো। এটি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ৩১তম শটে রোনালদোর প্রথম গোল।
পুরো ম্যাচে অফসাইডের কারণে পর্তুগালের ১টি এবং ক্রোয়েশিয়ার ৩টি গোল বাতিল হয়। ৫৬ মিনিটে এবং ৮০ মিনিটে পেতার সুচির গোল অফসাইডের খাঁড়ায় কাটা পড়ে।
৮১ মিনিটে রোনালদোকে তুলে গনসালো রামোসকে মাঠে নামান কোচ রবের্তো মার্তিনেস। কোচের সেই সিদ্ধান্ত মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে প্রমাণিত হয় যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে (৯৪ মিনিটে)। লেয়াওয়ের চমৎকার ক্রসে লাফিয়ে উঠে দর্শনীয় হেডে পর্তুগালকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন বদলি নামা রামোস।
ম্যাচের জন্য ১০ মিনিট যোগ করা হলেও নাটকীয়তা তখনও বাকি ছিল। ম্যাচের ত্রয়োদশ মিনিটে (১০৩ মিনিটে) ইভান পেরিসিচের ক্রসে ইগর মাতানোভিচের হেড হয়ে বল পান মারিও পাশালিচ। তার পাস থেকে বল পর্তুগালের জালে জড়িয়ে বুনো উল্লাসে মাতে ক্রোয়েশিয়া।
তবে সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি। দীর্ঘক্ষণ ভিএআর রিভিউ দেখার পর রেফারি মনিটরে চেক করে রায় দেন—পাশালিচ অফসাইডে ছিলেন। গোল বাতিলের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ক্রোয়াট সমর্থকরা গ্যালারি থেকে মাঠে বোতল ছুড়তে থাকে। এই টানটান উত্তেজনার মাঝে ম্যাচ গড়ায় ১০৯ মিনিট পর্যন্ত। শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই বিদায় নিশ্চিত হয় ক্রোয়েশিয়ার, আর কান্নায় ভেঙে পড়েন সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে ফেলা লুকা মদ্রিচ। অন্যদিকে, মাঠ ছাড়ে উল্লাসরত পর্তুগাল।
মন্তব্য করুন