শুক্রবার
০৩ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩

মার্কিন ঘাঁটি নিরাপত্তা বাড়ায়, নাকি মিত্রদের ঝুঁকিতে ফেলে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৫ পিএম
মার্কিন ঘাঁটি নিরাপত্তা বাড়ায়, নাকি মিত্রদের ঝুঁকিতে ফেলে?

মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে নিজেদের নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে। তবে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বিদেশি সামরিক ঘাঁটি কি সত্যিই নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, নাকি সেই দেশগুলোকে বড় শক্তির সংঘাতের সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে নিয়ে আসে?

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর বাহরাইন ও কুয়েতকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও জোরালোভাবে সামনে এসেছে। বিভিন্ন পক্ষ হামলার ক্ষয়ক্ষতি ও সামরিক কার্যকারিতা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি করলেও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—দুই দেশের সংঘাত প্রায়ই তাদের সীমান্তের বাইরে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকেও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা, সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ এবং রাজনৈতিক সমর্থনের সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এর অংশ হিসেবে বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর এবং কুয়েতে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

শান্তিকালে এসব ঘাঁটিকে নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে দেখা হলেও সংঘাতের সময় এগুলো সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন ধরনের ঝুঁকিও সৃষ্টি হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি সামরিক ঘাঁটি কোনো দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তবে একই সঙ্গে সেই দেশকে বড় শক্তির প্রতিপক্ষের নজরেও নিয়ে আসে। অর্থাৎ একটি রাষ্ট্র নিজে সংঘাতে অংশগ্রহণ না করলেও তার ভূখণ্ড আন্তর্জাতিক সামরিক উত্তেজনার অংশ হয়ে যেতে পারে।

এ কারণে বাহরাইন, কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সাধারণ মানুষও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন। বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, সামরিক স্থাপনার আশপাশে বসবাসকারী মানুষ এবং প্রবাসী শ্রমিকরা যুদ্ধের সিদ্ধান্তে অংশ না নিয়েও সম্ভাব্য প্রভাবের মুখোমুখি হন।

উপসাগরীয় অঞ্চলে বিদ্যমান নিরাপত্তা কাঠামোকে অনেক সময় স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে সমালোচকদের মতে, যদি এই ব্যবস্থাও আঞ্চলিক সংঘাতের সময় পাল্টা হামলার ঝুঁকি কমাতে না পারে, তাহলে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন দেখা দেয়—এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা মূলত আঞ্চলিক জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, নাকি বড় শক্তির কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

বাহরাইন ও কুয়েত কেবল সামরিক মানচিত্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নয়; সেখানে লাখো মানুষের বসবাস। সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরের আশপাশে আবাসিক এলাকা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হয়।

এ কথা বলা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধিতা নয়, বরং বাস্তবতা স্বীকার করা। একটি বিদেশি সামরিক ঘাঁটি কখনোই পুরোপুরি ঢাল হতে পারে না, যদি সেটি সেই দেশকে হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য বানিয়ে দেয়। বিদেশি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি কিছু হুমকি কমাতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে সেই শক্তির শত্রুদেরও নিজের দেশে টেনে আনে। বাহরাইন ও কুয়েত এখন এই বাস্তবতার মুখোমুখি। তাদের আকাশ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষ এখন ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করছে।

প্রায়ই বলা হয়, এই অঞ্চলে একটি ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো’ তৈরি হয়েছে। কথাটি শুনতে সুন্দর মনে হলেও বাস্তবে এর অর্থ ভিন্ন হতে পারে। এতে ছোট দেশগুলো বড় শক্তির সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বহন করে। যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছে এবং এটিকে স্থিতিশীলতার ব্যবস্থা বলে তুলে ধরে। কিন্তু যদি এই ব্যবস্থাই ইরানের পাল্টা হামলা ঠেকাতে না পারে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—আসলে কার নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে? সাধারণ মানুষের, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবের?

এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাহরাইন ও কুয়েত শুধু সামরিক মানচিত্রের কয়েকটি বিন্দু নয়। সেখানে লাখো মানুষ বসবাস করে। বিমানবন্দর, বন্দর ও সামরিক ঘাঁটির আশপাশে বহু পরিবার থাকে। সংকটের সময় সাধারণ সড়কও সামরিক চলাচলের পথে পরিণত হয়। স্থানীয় মানুষ, প্রবাসী শ্রমিক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন না, কিন্তু তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। সম্প্রতি কুয়েতে কর্মরত অনেক বেসামরিক ঠিকাদারও ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ায় নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এই ভয়কে অবহেলা করা উচিত নয়।

অনেকে বলবেন, উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেরাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সম্পর্ক গড়েছে। এতে কিছুটা সত্য রয়েছে। এসব দেশের সরকার বহু বছর ধরে মার্কিন নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু সরকারের সম্মতি মানেই দেশের সব মানুষের জন্য এই ব্যবস্থা নিরাপদ—এমন নয়। কোনো নীতির কারণে সাধারণ মানুষের ঝুঁকি বাড়লে সেটিও বিবেচনা করা দরকার।

সমস্যা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক নয়। মূল সমস্যা হলো, সেই সম্পর্ক কখনো কখনো বাহরাইন ও কুয়েতকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের অংশে পরিণত করে। ইরানের বার্তাও মোটামুটি স্পষ্ট—যদি এই অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে জবাবও এই অঞ্চলের মধ্যেই আসতে পারে। এতে যুদ্ধ সমর্থন করা হয় না, বরং বোঝানো হয় যে, এমন প্রতিক্রিয়া অনুমান করা কঠিন নয়।

এখানে একটি নৈতিক প্রশ্নও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলে, তাদের উপস্থিতি এই অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা কমায়। কিন্তু বাস্তবে ইরানের সঙ্গে তাদের সংঘাত বহুবার উপসাগরীয় দেশগুলোর সীমান্ত, সমুদ্রপথ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন হয়। সেখানে উত্তেজনা বাড়লে বিশ্ববাজারেও প্রভাব পড়ে। সাম্প্রতিক সংঘাতের পর তেলের দাম বেড়েছে এবং জাহাজ চলাচলও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ফলে যেসব যুদ্ধকে নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বলা হয়, সেগুলো অনেক সময় এই দেশগুলোর নিরাপত্তাই কমিয়ে দেয়। এখন বাহরাইন, কুয়েত ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের উচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রাখা কি সত্যিই তাদের নিরাপত্তা বাড়ায়, নাকি শুধু তাদের ওয়াশিংটনের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে তেহরানের জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে? এই প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে সমস্যার সমাধান হবে না। যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খোলামেলা আলোচনায় টিকতে পারে না, সেটি আসলে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নয়, বরং নির্ভরশীলতা।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণেরও ভাবা উচিত, বিদেশে তাদের সামরিক ঘাঁটির কারণে সেই দেশগুলোর সাধারণ মানুষ কী ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। মানচিত্রে একটি সামরিক ঘাঁটি কেবল একটি বিন্দু মনে হলেও বাস্তবে তার চারপাশে মানুষের বসতি, রাস্তা, বন্দর ও কর্মস্থল থাকে। যুদ্ধ শুরু হলে সেই মানুষগুলোর জীবনও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

তাই ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানো শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের স্বার্থ নয়, উপসাগরীয় দেশগুলোরও স্বার্থ। বাহরাইন ও কুয়েতের জনগণকে অন্যের যুদ্ধের প্রথম আঘাত সহ্য করতে বাধ্য করা উচিত নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই তার মিত্রদের মূল্য দেয়, তাহলে তাদের ভূখণ্ড এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়, যাতে পাল্টা হামলার ঝুঁকি আগেই অনুমান করা যায়।

দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরতা যথেষ্ট নয়। উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক সংলাপ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বিদেশি সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি কি সত্যিই তাদের নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে, নাকি আন্তর্জাতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে তাদের আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং আঞ্চলিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই ভবিষ্যতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গাজা সীমান্তে জনবসতি বাড়াতে ইসরায়েলের নতুন পরিকল্পনা

গাজা যুদ্ধের ১০০০ দিন: ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

আশাশুনিতে ১৪ লাখ টাকার অপদ্রব্যযুক্ত বাগদা চিংড়ি জব্দ, দুই ব্যবসায়ীর পলায়ন

বাঘারপাড়ায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাসান আলী ও ছাত্রলীগ নেতা রাব্বী আটক

সুন্দরবনে তিনটি নৌকাসহ ২৪ বোতল কীটনাশক ও শুঁটকি তৈরীর সরঞ্জাম জব্দ

শিক্ষক প্রশিক্ষণে বাংলাদেশকে ৯৯ মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে জিপিই

নড়াইলে চোর সন্দেহে গাছে বেঁধে নির্যাতন, প্রতিবন্ধী যুবকের মৃত্যু

বারান্দীপাড়ার আলোচিত হীরা আটক

মণিরামপুরে অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ

অভয়নগরে প্রথম দিনে পরীক্ষাকেন্দ্রে অনুপস্থিত ৪১ জন

শার্শায় পুলিশের অভিযানে ৭টি চোরাই মোবাইল উদ্ধার, যুবক গ্রেপ্তার

যাদুকাটা, রক্তি ও পাটলাই নদীতে অতিরিক্ত টোল আদায়ের অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের স্মারকলিপি

সুনামগঞ্জে হাওর, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় ‘হাওর উন্নয়ন ভাবনা’ অনুষ্ঠিত

মোংলায় ম্যানগ্রোভ বনায়ন শুরু, রোপণ হবে ৩৫ হাজার চারা

মহেশপুর পৌরসভায় কার্যালয়ে তালা দেওয়ার অভিযোগ

মহেশপুরে ৯৯০ কৃষকের মাঝে কৃষি উপকরণ ও বৃক্ষরোপণ সামগ্রী বিতরণ

পলাশবাড়ীতে নির্মিত রামমূর্তি অপসারণের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন

শার্শার দুই কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ এইচএসসি পরীক্ষা

এলপি গ্যাসের দাম কমলো

বাঘারপাড়ায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা রাব্বী আটক

X