
মানুষ সাধারণত অর্থ-সম্পদহীন ব্যক্তিকেই গরিব বা নিঃস্ব মনে করে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত দেউলিয়া বা নিঃস্ব ব্যক্তি সম্পদের অভাবে নয়; বরং সেই ব্যক্তি, যে ইবাদত-বন্দেগিতে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও মানুষের অধিকার নষ্ট করার কারণে কিয়ামতের দিন তার সব নেক আমল হারিয়ে ফেলবে।
হাদিসে যা এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করেন, "তোমরা কি জানো, প্রকৃত নিঃস্ব বা দেউলিয়া কে?"
সাহাবিরা উত্তরে বলেন, আমাদের কাছে নিঃস্ব হলো সেই ব্যক্তি, যার কোনো অর্থ-সম্পদ নেই।
তখন মহানবী (সা.) বলেন, আমার উম্মতের প্রকৃত দেউলিয়া হলো সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাতসহ বহু নেক আমল নিয়ে উপস্থিত হবে। কিন্তু সে পৃথিবীতে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়েছে, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কাউকে হত্যা করেছে কিংবা অন্যায়ভাবে প্রহার করেছে।
এরপর কিয়ামতের ময়দানে তার নেক আমল একে একে মাজলুমদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। যদি নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তবে অত্যাচারিতদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
সূত্র: সহিহ মুসলিম (হাদিস: ৬৫৭৯), মুসনাদে আহমাদ (হাদিস: ৮০২৯)
হাদিস থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ১. মানুষ সাধারণত অর্থ-সম্পদহীন ব্যক্তিকে গরিব বা নিঃস্ব মনে করে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত নিঃস্ব হলো সেই ব্যক্তি, যে অনেক নেক আমল নিয়ে কিয়ামতের ময়দানে উপস্থিত হবে, কিন্তু মানুষের অধিকার নষ্ট করার কারণে সব সাওয়াব হারিয়ে ফেলবে। ২. নামাজ, রোজা, জাকাত ইত্যাদি মহান ইবাদত হলেও মানুষের প্রতি জুলুম করলে এসব আমল বিপদের কারণ হতে পারে। তাই ইবাদতের পাশাপাশি চরিত্র ও আচরণও শুদ্ধ হওয়া জরুরি। ৩. আল্লাহ তাআলা নিজের হক ক্ষমা করতে পারেন; কিন্তু বান্দার হক আদায় না করে ক্ষমা পাওয়া কঠিন। এ জন্য মানুষের অধিকার নষ্ট করা থেকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। ৪. কারো সম্মানহানি করা, গালি দেওয়া, অপবাদ দেওয়া বা কুৎসা রটানো কিয়ামতের দিন কঠিন ক্ষতির কারণ হবে। ৫. অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা কবিরা গুনাহ। প্রতারণা, ঘুষ, সুদ, জবরদখল, আত্মসাৎ বা অন্যের হক নষ্ট করা আখিরাতে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।
এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, শুধু বেশি বেশি নামাজ, রোজা বা নফল ইবাদত করাই যথেষ্ট নয়। একজন মুমিনের জন্য মানুষের অধিকার সংরক্ষণ, অন্যায়-অত্যাচার থেকে বিরত থাকা এবং উত্তম চরিত্র গঠনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
যে ব্যক্তি আল্লাহর হক আদায়ের পাশাপাশি বান্দার হকও যথাযথভাবে আদায় করবে, সেই প্রকৃত সফলকাম হবে। আর যে মানুষের ওপর জুলুম করে, সে যত বড় ইবাদতকারীই হোক না কেন, কিয়ামতের দিন প্রকৃত দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কায় থাকবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মানুষের অধিকার আদায়কারী, জুলুম থেকে বিরত থাকা এবং আখিরাতে সফল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।
মন্তব্য করুন