
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একের পর এক ভূমিকম্পের ঘটনা মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। বিজ্ঞানীরা এসব ভূমিকম্পের পেছনে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়াসহ বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক কারণের ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। তবে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে ভূমিকম্পকে শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে নয়, বরং মানুষের জন্য শিক্ষা, সতর্কবার্তা এবং কিয়ামতের অন্যতম আলামত হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকম্পকে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর শাস্তি বা কিয়ামতের নির্দিষ্ট আলামত বলে ঘোষণা করা যায় না, যদি না কুরআন বা সহিহ হাদিসে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দলিল থাকে।
একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন একটি সময়ের বর্ণনা দিয়েছেন, যখন সমাজে বিভিন্ন ধরনের নৈতিক অবক্ষয় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। মানুষের মধ্যে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন, আমানতের খেয়ানত, জাকাতকে বোঝা মনে করা, দ্বীনি শিক্ষার পরিবর্তে কেবল পার্থিব শিক্ষার প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক, মায়ের তুলনায় স্ত্রীর আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া, পিতার চেয়ে বন্ধুকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া, মসজিদে উচ্চস্বরে কোলাহল, অযোগ্য মানুষের নেতৃত্ব, অসৎ ব্যক্তিদের প্রভাব, মন্দ কাজের জন্য সম্মান লাভ, বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকার বিস্তার, মদপানের প্রসার এবং পূর্বসূরিদের গালমন্দ করার মতো ঘটনা বৃদ্ধি পাবে।
রাসুল (সা.) বলেন, তখন প্রবল ঝড় ও ভয়াবহ ভূমিকম্প সংঘটিত হবে, যা বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। (তিরমিজি, হাদিস: ১৪৪৭)
আরেকটি হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেছেন, এই উম্মতের মধ্যে ভূমিকম্প, মানুষের আকৃতির বিকৃতি এবং পাথরবর্ষণের মতো শাস্তি আসবে। সাহাবিরা এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, যখন সমাজে গায়িকা, বাদ্যযন্ত্র এবং মদপানের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। (তিরমিজি, হাদিস: ২২১২)
এ ছাড়া সহিহ বুখারি-র 'কিতাবুল ফিতান' অধ্যায়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, 'বেশি বেশি ভূমিকম্প না হওয়া পর্যন্ত কিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হবে না।'
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন, তার সময়েও পৃথিবীর পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন দেশে বহু ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছিল। তার মতে, এসব ঘটনা কিয়ামতের আলামতের অংশ হতে পারে। আর যদি তা চূড়ান্ত আলামত না-ও হয়, তাহলে এগুলো সেই মহাদিনের আগমনের পূর্বাভাস বা প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগকে নির্দিষ্টভাবে আল্লাহর শাস্তি বলে ঘোষণা করা সঠিক নয়, যদি না সে বিষয়ে কুরআন বা সহিহ হাদিসে স্পষ্ট প্রমাণ থাকে।
তবে এমন ঘটনা একজন মুসলমানের জন্য আত্মসমালোচনা, তওবা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং সৎকর্মে আরও মনোযোগী হওয়ার সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। পাশাপাশি ইসলাম মানুষকে দুর্যোগে আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সহমর্মিতা প্রদর্শন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার শিক্ষা দেয়।
বিশ্বজুড়ে ভূমিকম্পের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে বিজ্ঞানীরা ভূতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিলেও ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এসব ঘটনা মানুষের জন্য সতর্কবার্তা ও আত্মশুদ্ধির উপলক্ষ হতে পারে। একই সঙ্গে হাদিসে ঘন ঘন ভূমিকম্পকে কিয়ামতের আলামতগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকম্পকে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর শাস্তি বা কিয়ামতের চূড়ান্ত নিদর্শন বলে দাবি না করে, মুসলমানদের উচিত এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা, তওবা করা এবং নেক আমলের প্রতি আরও যত্নবান হওয়া।
মন্তব্য করুন