
স্পেনের বার্সেলোনায় ফুটবল ক্যারিয়ারের উত্থান ঘটলেও বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসির পারিবারিক শিকড় নিয়ে এবার সামনে এসেছে নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য। ইতালি ও স্পেনের পর এবার মেসির সঙ্গে ব্রাজিলেরও বংশগত সম্পর্কের তথ্য পাওয়া গেছে। ইতালীয় ইতিহাসবিদ ও পেশায় ব্যাংকার ফিওরেঞ্জো সান্তিনির দীর্ঘ গবেষণায় উঠে এসেছে এই তথ্য।
মেসির পুরো নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি। তার পারিবারিক পদবি ‘কুচ্চিত্তিনি’র সূত্র ধরেই ব্রাজিলের সঙ্গে আর্জেন্টাইন মহাতারকার পারিবারিক সম্পর্কের সন্ধান পেয়েছেন সান্তিনি।
সান্তিনির গবেষণা অনুযায়ী, মেসির পিতৃসূত্রের প্রপিতামহ অ্যাঞ্জেলো মেসি ইতালির মারকে অঞ্চলের মাচেরাতা প্রদেশের রেকানাতি শহরের বাসিন্দা ছিলেন। ১৮৯৩ সালে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে ইতালি ছেড়ে আর্জেন্টিনার রোজারিওতে চলে যান।
মেসির ইতালীয় শিকড় অনুসন্ধানের পর তার মাতৃসূত্রের বংশপরিচয় নিয়েও গবেষণা শুরু করেন সান্তিনি। সেখানে তিনি জানতে পারেন, মেসির মাতৃসূত্রের প্রপিতামহের বাবা রানিয়েরো কোচেত্তিনি ইতালির সান সেভেরিনো মার্কে শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পরে স্ত্রী রোজা রিক্কেজ্জা ও দুই সন্তান জুলিয়া ও ফ্রাঞ্চেস্কোকে নিয়ে তিনি ব্রাজিলে পাড়ি জমান।
ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ১৮৯৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘ওয়াশিংটন’ নামের একটি জাহাজে করে তারা ব্রাজিলের সান্তোস বন্দরে পৌঁছান। সাও পাওলো রাজ্যের ইমিগ্রেশন মিউজিয়ামে সংরক্ষিত নথিতেও এই অভিবাসনের তথ্য রয়েছে।
ব্রাজিলে পৌঁছানোর পর সরকারি নথিতে রানিয়েরো কোচেত্তিনির নাম পরিবর্তিত হয়ে রামিয়েরো কনচেত্তিনি হয়ে যায়। সে সময় বানান ও উচ্চারণগত জটিলতার কারণে অভিবাসীদের নাম-পরিচয়ে এ ধরনের পরিবর্তন ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। ঐতিহাসিক নথিতে রামিয়েরোকে একজন কৃষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি সাও পাওলোর রিনকাও এলাকায় ড. মার্তিনহো প্রাদো জুনিয়রের একটি খামারে কাজ শুরু করেন, যা রিবেইরাও প্রেতো থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে।
রিবেইরাও প্রেতো অঞ্চলে বসবাসের সময় রামিয়েরো ও রোজার ঘরে আরও দুই সন্তানের জন্ম হয়। সান সেভেরিনো মার্কে পৌরসভার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯০০ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম নেন এরমিনিয়া এবং ১৯০৪ সালের ২৭ জানুয়ারি জন্ম নেন আরদেরিগো। গবেষক ফিওরেঞ্জো সান্তিনির মতে, মেসির ব্যবহৃত কুচ্চিত্তিনি পদবির উৎপত্তি আরদেরিগোর মাধ্যমেই। রিবেইরাও প্রেতোতে জন্মনিবন্ধনের সময় তার নাম পরিবর্তন করে ফেদেরিকো এবং কোচেত্তিনি পদবিও বদলে কুচ্চিত্তিনি হয়ে যায়। সান্তিনি বলেন, ‘ব্রাজিলে আরদেরিগো হয়ে যায় ফেদেরিকো। আর কোচেত্তিনি বদলে হয় কুচ্চিত্তিনি। এই ফেদেরিকোই মেসির প্রপিতামহ।’
ফেদেরিকোর জন্মের এক বছর পর পুরো পরিবার ব্রাজিল ছেড়ে আর্জেন্টিনায় চলে যায়। ১৯০৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তারা সেখানে পৌঁছে রোজারিও অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। সেখানেই পরবর্তীতে জন্ম নেন মেসির নানা আন্তোনিও কুচ্চিত্তিনি, মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি এবং এরপর ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন জন্ম নেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি। অর্থাৎ তার প্রপিতামহের আর্জেন্টিনায় আগমনের ৮২ বছর পর জন্ম হয় মেসির।
বিশ্বকাপজয়ী মেসির সঙ্গে মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনির একটি ছবিও ব্রাজিলের গণমাধ্যম গ্লোবোর প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে। সেলিয়া হচ্ছেন ব্রাজিলে ১৯০৪ সালে জন্ম নেওয়া ফেদেরিকোর নাতনি। সান্তিনি জানান, মূলত কুচ্চিত্তিনি পদবিই তাকে মেসি ও ব্রাজিলের সম্পৃক্ততার সন্ধান দেয়। কারণ ইতালিতে এই পদবির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময় নিয়ে মেসির মাতৃসূত্রের পুরো পারিবারিক বংশতালিকা সাজিয়েছেন।
সান্তিনি বলেন, ‘গবেষণার সময় আমি দেখলাম ইতালিতে কুচ্চিত্তিনি নামে কোনো পদবি নেই। পরে মেসির মায়ের এক চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে নথি পাওয়ার পর বুঝতে পারি, ব্রাজিলে পৌঁছানোর পরই নাম ও পদবির পরিবর্তন করা হয়েছিল।’ সান্তিনির এই গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালে ইতালির সান সেভেরিনো মার্কে শহর মেসিকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করে।
মেসির সঙ্গে ব্রাজিলের এই বংশগত যোগসূত্রের খবর প্রকাশের পর দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে নানা রসিকতা। অনেকে মেসিকে ব্রাজিলের জার্সি পরিয়ে ছবি প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ আবার মজা করে মন্তব্য করেছেন, মেসি যদি ব্রাজিলের হয়ে খেলতেন, তাহলে হয়তো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিশ্বকাপ ফাইনালে না খেলার আক্ষেপ আরও কমে যেত।
বিশ্বকাপজয়ী মেসির ব্রাজিলীয় বংশগত শিকড়ের এই তথ্য নতুন করে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফুটবল দেশ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।
মন্তব্য করুন