মঙ্গলবার
৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩

অক্ষয় তৃতীয়ার ধর্মীয় গুরুত্ব ও ইতিহাস

অরুন শীল
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫০ এএম
অক্ষয় তৃতীয়ার ধর্মীয় গুরুত্ব ও ইতিহাস

আজ রোববার সনাতন ধর্মের পবিত্র শুভ অক্ষয় তৃতীয়া। অক্ষয়’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ যার ‘ক্ষয় বা বিকার নেই’। কিন্তু অক্ষয় তৃতীয়া ব্যাপারটি কী? তৃতীয়া যা কিনা অক্ষয়। প্রতি বছরের বৈশাখ মাসে শুক্ল পক্ষের তৃতীয়া তিথিটিকে বলা হয় অক্ষয় তৃতীয়া। এই তিথিকে অক্ষয়তীজ্ বা পরশুরাম জয়ন্তীও বলা হয়। এটি একটি বছরের মাহাত্ম্যপূর্ণ দিন।

আবার ঐদিন যদি হয় সোমবার আর রোহিণী নক্ষত্র সমাসীন, তবে তো কথাই নেই। দিনটি হয়ে উঠে আরো গুরুত্বপূর্ণ। বৈশাখ মাসের এই বিশেষ দিনে দেখা গেছে নানাবিধ মহতী কর্মের সূচনার পরম্পরা। আমাদের অতীত ইতিহাস অবলোকন করলে এমন সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই দিনে ঘটতে দেখা যায় যার পরিণাম স্বরূপ আজও ক্ষয়হীন হয়ে সময়ের স্রোতের সঙ্গে নিরবধি বয়ে চলেছে। তাই, আবহমান কাল থেকে এই দিনে অনুষ্ঠিত যেকোনো শুভ কার্যানুষ্ঠানের পূণ্যফল অক্ষয় বলে ধার্য হয়।

‘অক্ষয়, তৃতীয়া’ আখ্যা তাই সার্থক। এ তিথি যে বাস্তবিকই অক্ষয়, তার প্রমাণস্বরূপ অতীতে, পুরাণে যে সমস্ত ঘটনাবলী ঘটছে তার বিররণী নিম্নে বর্ণিত হল: ১) এই তিথিতে সত্যযুগের সূচনা হয়।

২) এই তিথিতে পুণ্যতোয়া, পুণ্যসলিলা ভগবতীদেবী গঙ্গা মর্ত্যে অবতরণ করেন। তারপর থেকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে অক্ষয় জলসম্ভার সমেত মর্ত্যবাসীর জীবন দায়িনী তথা পাপনাশিনী নদী রূপে প্রবাহমানা।

৩) ভগবানের দশ অবতারের অন্যতম ষষ্ঠ অবতার ‘পরশুরামদেব’ এই তিথিতেই আবির্ভূত হন অবনীমাঝে। তিনি তো চিরঞ্জীবী। অমর, অক্ষয় আয়ু নিয়ে আজও মর্ত্তচারী। তাই এ তিথির আরেক নাম ‘পরশুরাম জয়ন্তী’।

৪) এই তিথিতেই ব্যাসদেব মহাভারত রচনা শুরু করেন। মহাভারতে মধ্যে ২৫ থেকে ৪২ পর্যন্ত আঠারো অধ্যায় ‘গীতা’য়, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাণী রয়েছে, যা অনন্তকাল হতে আমাদের ভবসাগর উত্তলনের অক্ষয় পথপ্রদর্শক।

৫) দেবী পার্বতীর অপর এক রূপ ‘মা অন্নপূর্ণা’ এই তিথিতেই আবির্ভূতা হয়ে মহাদেবকে অন্নভিক্ষা দেন। তারপর থেকে অন্নের অক্ষয় উৎসস্বরূপা দেবী পূজিতা হন।

৬) এই তিথিতেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পরম সখা সুদামা বিপ্র দ্বারকাতে তাঁর প্রাসাদে আসেন, নিজের দারিদ্রাবস্থার কথা জানিয়ে কিছু অর্থ সাহায্য লব্ধ হতে। কিন্তু ‘অতিথি দেবঃ ভবঃ’ এবং ‘ব্রাহ্মণ নিত্য পূজ্য’-এই জ্ঞানে শ্রীকৃষ্ণ বিপ্র সুদামাকে যে আতিথেয়তা করেন, তাতে মুগ্ধ হয়ে সুদামা আর নিজের দৈন্যাবস্থার কথা মুখ ফুটে বলতে পারেননি। এমনকি কৃষ্ণের প্রাসাদে সম্পদের বৈভব দেখে, তাঁর জন্য আনা কাপড়ে বাঁধা সামান্য চালভাজাটুকুও লজ্জায় আর দিতে পারেননি সুদামা।

কিন্তু ভক্তবৎসল ভগবান বাসুদের যে ভাবগ্রাহী। তিনি ভাবটুকু গ্রহণ করেন, কেবল ভেট নয়। তাই নিজেই সেই চালভাজা খেয়ে পরম তৃপ্ত হন। আর সুদামা বিপ্র নিজমুখে কিছু না চাইলেও, বাড়িতে ফিরে দেখেন যে তার ক্ষুদ্র কুঠিরের পরিবর্তে বৃহৎ অট্টালিকা অবস্থান করছে সেখানে। শ্রী ভগবান অযাচিত করুণাভরে সবকিছু সাজিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন তাঁর একান্ত প্রিয় সখা তথা ভক্তপ্রবর সুদামাকে। এই লীলার দ্বারা এটাই প্রমাণ হয় যে, ভক্তের চাওয়ার অপেক্ষা করেন না ভগবান। অহৈতুকী অযাচিত কৃপা অক্ষয়রূপে তিনি নিজে থেকেই করেন তাঁর নিষ্কাম ভক্তের প্রতি। সত্যি, তাঁর মতো সুহৃদ, তাঁর মতো পরম বান্ধব আর কে আছেন?

৭) দুর্যোধনের নির্দেশে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করে দুঃশাসন এই তিথিতেই। কিন্তু দ্রৌপদী যখন পূর্ণ বিশ্বাসসহ শরণাগতি স্বীকার করে আত্মনিবেদন করলেন মনে মনে শ্রীকৃষ্ণের চরণে, তখন ভগবান অনন্ত বস্ত্রের যোগান দিয়ে তাঁর সম্মান রক্ষা করলেন। পূর্ণরূপে ভগবানের চরণকমলে আত্মনিবেদিত হতে পারলে যে ভগবানই রক্ষাকর্তা হয়ে অক্ষয় কৃপা করেন। এ লীলা তারই নিদর্শন।

৮) কথিত আছে যে, অক্ষয় তৃতীয়ার দিনই সূর্যদেব পাণ্ডবদের বনবাসের সময় অক্ষয় পাত্র দান করেন। একথালা অন্ন দ্রৌপদীর আহার গ্রহণের আগে পর্যন্ত যতজন উপস্থিত থাকতো তাদেরকে খাওয়ানো যেত।

৯) দীর্ঘকাল তপস্যার পর মহাদেবকে প্রসন্ন করে যক্ষরাজ কুবের স্বর্গের সমস্ত ধনসম্পত্তির অধিকারী দেবতা হন এই তিথিতেই।

১০) এই তিথিতেই প্রতিবছর পুরীতে শ্রীজগন্নাথদেবের রথের নির্মাণকার্যের শুভ সূচনা হয়। ভক্তবৎসল জগন্নাথদেব ভক্ত দর্শনের জন্য রথযাত্রা করেন, আর ভক্তদের প্রতিও তাঁর অক্ষয় কৃপা এই যে, স্বয়ং ভগবান মন্দির থেকে পথে আসেন তাঁদের দর্শনসুখ দিতে।

১১) প্রবাদ আছে-এই তিথিতেই ভিক্ষা করতে গিয়ে আদি শঙ্করাচার্য এক নিঃসম্বল দম্পতির থেকে, তাদের কুঠিরের একমাত্র খাদ্যবস্তু একটি টেপারি ফল প্রাপ্ত হলেন। নিদারুণ দৈন্যাবস্থা সত্ত্বেও ক্ষুধায় কাতর দম্পতি ভিক্ষাদানে এমন আগ্রহ দেখে শঙ্করাচার্য ‘কলকাধার’ নামক বিখ্যাত শ্লোকটি রচনা করেন, যা তার এক অক্ষয় কীর্তি।

১২) ‘গোয়া’ ও ‘কেরল’ এই তিথিতেই পরশুরাম ক্ষেত্র নামে চিহ্নিত হয়।

অতএব, আমরা উপলব্ধি করতে পারছি যে, অক্ষয় তৃতীয়া তিথি পরম মহিমাময়। এই তিথিতে যা শুভকর্ম করা হয়, তার ফল অক্ষয় পূণ্যদায়িনী। যা জ্ঞান আহরণ করা হয়, এই তিথিতে-তাও অক্ষয় প্রভাব ফেলে বুদ্ধিতে, চিত্তে। দানের ফলও অক্ষয় হয়। স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, তাহলে এই তিথিতে যদি ইচ্ছা-অনিচ্ছায় বা অজ্ঞাতে যদি কোন পাপকর্ম করে ফেলি, তবে সেটাও অক্ষয় পাপ হয়ে কর্মফলের খাতায় লেখা থাকে।

তাই সর্তক থাকাটাই শ্রেয়। অজান্তেও কোন পাপ বা বৈষ্ণব অপরাধ, সেবাপরাধ নামাপরাধ, না করে ফেলি বা কোন কুভাবনা না ভাবি-সে বিষয়ে সজাগ থাকাটাই সমীচীন। তাই এই মহাত্ম্যপূর্ণ তিথিকে ভাগবত শ্রবণ, শ্রীগুরুসেবা, সাধুসঙ্গ, মালা জপ-বেশী করে মনকে গৌর-গোবিন্দের শ্রীচরণেসেবায় ব্যস্ত রাখব।

‘যার থাকবে গৌরপ্রেমে রতি, কলি তার করবে কোন্ ক্ষতি? অক্ষয় তৃতীয়ায় ক্ষয়হীন কৃপা এভাবেই একমাত্র লব্ধ করা সম্ভব।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১১ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস নাটক, জাপানকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় ব্রাজিল

কাসেমিরোর গোলে স্বস্তি, জাপানের বিপক্ষে সমতায় ফিরল ব্রাজিল

সেলেসাওদের স্তব্ধ করে জাপানের গোল, শুরুতেই পিছিয়ে পড়ল ব্রাজিল

যশোরে জাতীয় পার্টির নবগঠিত কমিটির পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত 

শার্শার বসতপুরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে বেকারি খাদ্য

ইনুর মামলার রায় কাল, সরাসরি দেখবে দেশবাসী

ডুমুরিয়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু

নেইমারকে ছাড়াই জাপানের বিপক্ষে নামছে ব্রাজিল

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে জামায়াত আমিরের শোক

অর্থ বিল পাস, যেসব পরিবর্তন এলো 

এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হলেন আহসান হাবিব

যশোরে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত

যশোরে পাট পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি বিষয়ক মতবিনিময় সভা

যশোরে আদ-দ্বীন হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা শীর্ষক সেমিনার  

যশোরে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস পালিত

মহেশপুরে গাজীরননেছা বালিকা বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভা

মোরেলগঞ্জে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে নারিকেল চারা ও কৃষি প্রণোদনা বিতরণ

শৈলকুপায় পাঁচ দিনের ব্যবধানে দুই কিশোরের মৃত্যু

সুনামগঞ্জ পৌরসভায় ৫৪ কোটি ১৫ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা

মণিরামপুরে সেতুর কাজ থমকে, দুর্ভোগে ২০ গ্রাম

X